ঢাকা ০৩:২১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

যুদ্ধবিরতির মধ্যেই লেবাননে আরও ভয়ঙ্কর হামলা চালাবে ইসরায়েল!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০২:২৬:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬
  • / 20

ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি উপেক্ষা করে লেবাননের অভ্যন্তরে আরও গভীরে প্রবেশের জন্য সেনাদের নির্দেশ দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে ইসরায়েলি বাহিনী ইতোমধ্যেই দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ৯০০ বছরের পুরোনো ‘বিউফোর্ট ক্যাসল’ বা দুর্গ এবং সংলগ্ন একটি পাহাড়ি এলাকার দখল নিয়েছে।

গত এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর শনিবার উত্তর ইসরায়েলের দিকে হিজবুল্লাহর সবচেয়ে বড় হামলার পরই নেতানিয়াহু এই নির্দেশ দেন। ওই হামলার কারণে ইসরায়েলে স্কুল বন্ধ করে দেওয়াসহ নানা বিধিনিষেধ আরোপ করতে হয়েছিল। রোববারের এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু জানান, তিনি লেবাননে স্থল অভিযান সম্প্রসারণের নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর মূল লক্ষ্য হলো হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে ইসরায়েলের অবস্থান আরও সম্প্রসারিত ও মজবুত করা। লিটানি নদী পর্যন্ত এলাকা আগে থেকেই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন তারা আরও প্রায় ১০ কিলোমিটার উত্তরে জাহারানি নদীর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর অন্যতম প্রধান ঘাঁটি নাবাতিয়েহর কাছেও ইসরায়েলি বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে।

সর্বশেষ এই অগ্রযাত্রায় বিউফোর্ট রিজ এবং ওয়াদি আল-সালুকি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মাধ্যমে দক্ষিণ লেবানন ও উত্তর ইসরায়েলের বিস্তীর্ণ এলাকার ওপর নজরদারি করার একটি সুবিধাজনক অবস্থান পেয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। ১৮ বছর পর ২০০০ সালের মে মাসে দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর এবারই প্রথম ইসরায়েল এই এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিল। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, এই দুর্গটি দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বলয়ের অংশ হিসেবে রাখা হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুর্গে ইসরায়েলি পতাকা ও সামরিক বাহিনীর গোলানি ব্রিগেডের পতাকার ছবি শেয়ার করে কাটজ বলেন, সংঘাত এখনো শেষ হয়নি এবং হিজবুল্লাহর শক্তি গুঁড়িয়ে দিতে তারা বদ্ধপরিকর। লেবানিজ বিশ্লেষক তালাল আত্রিসির মতে, দুর্গে পতাকা ওড়ানোর এই ছবি দিয়ে মূলত ইসরায়েলি সমাজকে বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে, হিজবুল্লাহর ড্রোনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সামরিক বাহিনী তাদের লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হচ্ছে।

সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সর্বশেষ এই অভিযানে এক ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন। এদিকে জাহারানি নদীর দক্ষিণের বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েল। লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, শনিবার রাতের বিমান হামলায় দক্ষিণাঞ্চলীয় দেইর এল জাহারানি গ্রামে আটজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া রোববারের সারাদিনে দক্ষিণ লেবাননজুড়ে ইসরায়েলি বাহিনী ৪০টিরও বেশি হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ বর্তমানে সস্তা ও সহজে তৈরি করা কামিকাজে ড্রোন ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে, যা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে প্রতিহত করা কঠিন এবং এর আঘাতেই দক্ষিণ লেবাননে বেশ কয়েকজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন।

লেবাননে এই সংঘাত বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সোমবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডেকেছে ফ্রান্স। অথচ গত শুক্রবারই দুই দেশের মধ্যে শান্তি স্থাপন এবং হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি ও লেবানিজ প্রতিরক্ষা প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বৈঠকের আয়োজন করেছিল। এমনকি গত ১৫ মে উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৪৫ দিন বাড়াতেও সম্মত হয়েছিল।

ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে লেবাননেই। মিত্র ইরানের সমর্থনে গত ২ মার্চ থেকে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট ও ড্রোন হামলা শুরু করে। এর জেরে ইসরায়েলি হামলা ও সরে যাওয়ার নির্দেশের কারণে লেবাননের ১২ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। লেবানন সরকারের মতে, এ পর্যন্ত ৩,৩৭০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, একই সময়ে তাদের ২৪ জন সেনা ও চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং হিজবুল্লাহর হামলায় উত্তর ইসরায়েলের হাজার হাজার বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। আসন্ন নির্বাচনে নেতানিয়াহুর অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী নাফতালি বেনেট বৈরুতের শহরতলিতে হামলাসহ লেবাননে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তবে এসব বিষয়ে লেবানন বা হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সূত্র: রয়টার্স

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

যুদ্ধবিরতির মধ্যেই লেবাননে আরও ভয়ঙ্কর হামলা চালাবে ইসরায়েল!

আপডেট সময় : ০২:২৬:৩১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬

ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় আগে ঘোষিত যুদ্ধবিরতি উপেক্ষা করে লেবাননের অভ্যন্তরে আরও গভীরে প্রবেশের জন্য সেনাদের নির্দেশ দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে ইসরায়েলি বাহিনী ইতোমধ্যেই দক্ষিণ লেবাননের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ৯০০ বছরের পুরোনো ‘বিউফোর্ট ক্যাসল’ বা দুর্গ এবং সংলগ্ন একটি পাহাড়ি এলাকার দখল নিয়েছে।

গত এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর শনিবার উত্তর ইসরায়েলের দিকে হিজবুল্লাহর সবচেয়ে বড় হামলার পরই নেতানিয়াহু এই নির্দেশ দেন। ওই হামলার কারণে ইসরায়েলে স্কুল বন্ধ করে দেওয়াসহ নানা বিধিনিষেধ আরোপ করতে হয়েছিল। রোববারের এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু জানান, তিনি লেবাননে স্থল অভিযান সম্প্রসারণের নির্দেশ দিয়েছেন। তাঁর মূল লক্ষ্য হলো হিজবুল্লাহ নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে ইসরায়েলের অবস্থান আরও সম্প্রসারিত ও মজবুত করা। লিটানি নদী পর্যন্ত এলাকা আগে থেকেই ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন তারা আরও প্রায় ১০ কিলোমিটার উত্তরে জাহারানি নদীর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর অন্যতম প্রধান ঘাঁটি নাবাতিয়েহর কাছেও ইসরায়েলি বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে।

সর্বশেষ এই অগ্রযাত্রায় বিউফোর্ট রিজ এবং ওয়াদি আল-সালুকি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার মাধ্যমে দক্ষিণ লেবানন ও উত্তর ইসরায়েলের বিস্তীর্ণ এলাকার ওপর নজরদারি করার একটি সুবিধাজনক অবস্থান পেয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। ১৮ বছর পর ২০০০ সালের মে মাসে দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর এবারই প্রথম ইসরায়েল এই এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিল। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ জানিয়েছেন, এই দুর্গটি দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বলয়ের অংশ হিসেবে রাখা হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুর্গে ইসরায়েলি পতাকা ও সামরিক বাহিনীর গোলানি ব্রিগেডের পতাকার ছবি শেয়ার করে কাটজ বলেন, সংঘাত এখনো শেষ হয়নি এবং হিজবুল্লাহর শক্তি গুঁড়িয়ে দিতে তারা বদ্ধপরিকর। লেবানিজ বিশ্লেষক তালাল আত্রিসির মতে, দুর্গে পতাকা ওড়ানোর এই ছবি দিয়ে মূলত ইসরায়েলি সমাজকে বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে, হিজবুল্লাহর ড্রোনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও সামরিক বাহিনী তাদের লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হচ্ছে।

সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সর্বশেষ এই অভিযানে এক ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন। এদিকে জাহারানি নদীর দক্ষিণের বাসিন্দাদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েল। লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, শনিবার রাতের বিমান হামলায় দক্ষিণাঞ্চলীয় দেইর এল জাহারানি গ্রামে আটজন নিহত হয়েছেন। এছাড়া রোববারের সারাদিনে দক্ষিণ লেবাননজুড়ে ইসরায়েলি বাহিনী ৪০টিরও বেশি হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে, হিজবুল্লাহ বর্তমানে সস্তা ও সহজে তৈরি করা কামিকাজে ড্রোন ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে, যা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে প্রতিহত করা কঠিন এবং এর আঘাতেই দক্ষিণ লেবাননে বেশ কয়েকজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন।

লেবাননে এই সংঘাত বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সোমবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডেকেছে ফ্রান্স। অথচ গত শুক্রবারই দুই দেশের মধ্যে শান্তি স্থাপন এবং হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি ও লেবানিজ প্রতিরক্ষা প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি বৈঠকের আয়োজন করেছিল। এমনকি গত ১৫ মে উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৪৫ দিন বাড়াতেও সম্মত হয়েছিল।

ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে লেবাননেই। মিত্র ইরানের সমর্থনে গত ২ মার্চ থেকে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট ও ড্রোন হামলা শুরু করে। এর জেরে ইসরায়েলি হামলা ও সরে যাওয়ার নির্দেশের কারণে লেবাননের ১২ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। লেবানন সরকারের মতে, এ পর্যন্ত ৩,৩৭০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, একই সময়ে তাদের ২৪ জন সেনা ও চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং হিজবুল্লাহর হামলায় উত্তর ইসরায়েলের হাজার হাজার বাসিন্দা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। আসন্ন নির্বাচনে নেতানিয়াহুর অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী নাফতালি বেনেট বৈরুতের শহরতলিতে হামলাসহ লেবাননে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তবে এসব বিষয়ে লেবানন বা হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। সূত্র: রয়টার্স