ঢাকা ০১:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ব্রেকিং নিউজ ::
ওয়েব সাইড আপগ্রেট করার কারণে ৫ সেপ্টেম্বর থেকে সংবাদ সম্প্রচার বন্ধ থাকবে। এ জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।

বন্যার ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে নেপাল, বাড়ছে জনদুর্ভোগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১১:৫৫:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 7

পাহাড়ি ঢলের পর সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ঘুরে দাঁড়তে পারেনি হিমালয় কন্যা নেপাল, প্রতিদিনই বাড়ছে জনদুর্ভোগ। ভূমিধস আর বানের তোড়ে ক্ষত-বিক্ষত ভোটেকোশী আর ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী জেলা। শ্মশানে বিরতিহীনভাবে জ্বলছে চিতার আগুন, দেয়া হচ্ছে গণকবরও। প্রায় সাড়ে ৫০০ বিদেশি পর্যটক আর ৪ হাজারেরও বেশি স্থানীয়র খোঁজ মেলেনি দুর্যোগের ৯ দিন পরেও।

২৬ আগস্ট বুধবার। সকাল পৌনে নয়টার দিকে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে ধসে পড়ে একটি বিশাল হিমবাহ। ৫.২ মাত্রায় কেঁপে ওঠে আশপাশের এলাকা। হিমবাহ গলে ভয়ংকর গতিতে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসে বরফ, পাথর আর কাদা মিশ্রিত পানির নজিরবিহীন স্রোত। ভোটেকোশী এবং ত্রিশূলী নদীতে নেমে আসা আকস্মিক এই ঢলেই দশকের ভয়াবহ দুর্যোগের কবলে পড়ে হিমালয় কণ্যা। দেখা দেয় আকস্মিক বন্যা; প্লাবিত হয় রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার বিভিন্ন জনপদ ও বিস্তীর্ণ এলাকা। নদী তীরে বিধ্বস্ত হয় প্রায় ৩ হাজার অবকাঠামো।

সময় গড়াতেই ধীরে ধীরে বের হয়ে আসে নিখোঁজদের তথ্য। শুরুতে বিদেশি পর্যটকদের ব্যাপারে জানা গেলেও তালিকায় যোগ হন স্থানীয় বাসিন্দা, শ্রমিক, সেনা কর্মকর্তাসহ হাজার হাজার মানুষ। বিধ্বংসী পাহাড়ি বান আঘাত হানার ঠিক পরদিনই দ্বিতীয় দফায় বন্যার ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি হয় নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে। উজানে কাদামাটি পানি জমে সৃষ্টি হয় কৃত্রিম হ্রদ। এরই জেরে উদ্ধার অভিযান থামাতেও হয়েছে বেশ কয়েকবার। ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়তে থাকে প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যা।

বন্যা দুর্গত এলাকার অন্তত ১৯টি সেতু এবং ৪০ কিলোমিটার সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় হেলিকপ্টারে করে জরুরি খাবার ও ওষুধ পৌঁছাতে শুরু করে সেনাবাহিনী। দুর্গোগের ৩য় দিন থেকেই লাশ শনাক্ত ও সংরক্ষণ নিয়ে বিপদে পড়ে স্থানীয় হাসপাতাল ও মর্গ কর্তৃপক্ষ। তাই আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বিদেশি উদ্ধারকারী দলকে দেশে প্রবেশের অনুমতি দেয় নেপাল সরকার। তবে সাধারণ উদ্ধার অভিযান নয়, সুড়ঙ্গে আটকে পড়াদের উদ্ধার নেয়া হয় চীনা টানেল রেসকিউ টিমের সদস্য। এছাড়া লাশ সংরক্ষণ ও ফরেনসিকের জন্য ভিনদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিয়ে রাজি হয় কাঠমান্ডু।

এক পর্যায়ে হ্রদের পানি নামতে শুরু করলেও বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে আটকা পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে কোনো গতি হয়না। পাঠানো হয় চীনের টানেল রেসকিউ টিম। ভারী যন্ত্রপাতি, এক্সকাভেটর, ড্রিল এবং থার্মাল ড্রোন দিয়ে আরও জোরদার করা হয় তল্লাশি। ৯ দিনে বিভিন্ন টানেল থেকে ৩০০ জনকে উদ্ধার করা হলেও ৬ শতাধিক শ্রমিকের হদিস মেলেনি এখনও।

স্মরণকালের ভয়াবহ এই দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা আর উদ্ধারকারী দলগুলোর প্রচেষ্টায় দুর্গতদের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে জরুরি সামগ্রী। যদিও তা পর্যাপ্ত না। আবার ত্রাণের খাবার বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করছেন অনেকে। কারণ বিনামূল্যে যে ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে তা সাধারণ রোগের। হৃদরোগ, ক্যান্সার বা অন্য দুরারোগ্য ব্যাধির জন্য নির্ধারিত ওষুধ কিনতে প্রয়োজন নগদ অর্থের। যা সহায় সম্বলহীন মানুষের নাগালের বাইরে।

২১ হাজার দেশি বিদেশি উদ্ধারকর্মী নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ ১২ হাজারের বন্যা দুর্গতকে উদ্ধার করলেও এখনও হদিস পাওয়া যায়নি ৪ হাজারেরও বেশি মানুষের। বিপরীতে প্রতিদিনই বিভিন্ন নদীর ভাটি এলাকায় ভেসে উঠছে লাশ। এর ৯৬ শতাংশই শনাক্ত করা যাচ্ছে না। কোথাও প্রতীকী সৎকার, কোথাও গণকবর দেয়া হচ্ছে। রাবনের চিতার মতো জ্বলছে শ্মশানের আগুন।

আর যাদের স্বজন এখনও নিখোঁজ, হাসপাতাল থেকে মর্গে ছুটে বেড়াচ্ছেন তারা। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে একেবারেই ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে নিখোঁজদের বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা। মন্দির উপাসনালয়ে চলছে পূজা-প্রার্থনা। মিসিং ওয়ালে ঘণ্টায় ঘণ্টায় টানানো হচ্ছে নতুন ছবি।

আপাতত দুর্গতদের পুনর্বাসন আর দুর্যোগ পরবর্তী সংকট নিয়েই মাথা ঘামাচ্ছে বালেন্দ্র শাহ’র সরকার। বৈদেশিক সহায়তার বিষয়ে কাঠমান্ডুর স্পষ্ট বার্তা অনুদান বা সহায়তা নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশগুলো থেকে ক্ষতিপূরণ চায় নেপাল।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

বন্যার ক্ষতচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে নেপাল, বাড়ছে জনদুর্ভোগ

আপডেট সময় : ১১:৫৫:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পাহাড়ি ঢলের পর সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও ঘুরে দাঁড়তে পারেনি হিমালয় কন্যা নেপাল, প্রতিদিনই বাড়ছে জনদুর্ভোগ। ভূমিধস আর বানের তোড়ে ক্ষত-বিক্ষত ভোটেকোশী আর ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী জেলা। শ্মশানে বিরতিহীনভাবে জ্বলছে চিতার আগুন, দেয়া হচ্ছে গণকবরও। প্রায় সাড়ে ৫০০ বিদেশি পর্যটক আর ৪ হাজারেরও বেশি স্থানীয়র খোঁজ মেলেনি দুর্যোগের ৯ দিন পরেও।

২৬ আগস্ট বুধবার। সকাল পৌনে নয়টার দিকে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে ধসে পড়ে একটি বিশাল হিমবাহ। ৫.২ মাত্রায় কেঁপে ওঠে আশপাশের এলাকা। হিমবাহ গলে ভয়ংকর গতিতে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসে বরফ, পাথর আর কাদা মিশ্রিত পানির নজিরবিহীন স্রোত। ভোটেকোশী এবং ত্রিশূলী নদীতে নেমে আসা আকস্মিক এই ঢলেই দশকের ভয়াবহ দুর্যোগের কবলে পড়ে হিমালয় কণ্যা। দেখা দেয় আকস্মিক বন্যা; প্লাবিত হয় রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার বিভিন্ন জনপদ ও বিস্তীর্ণ এলাকা। নদী তীরে বিধ্বস্ত হয় প্রায় ৩ হাজার অবকাঠামো।

সময় গড়াতেই ধীরে ধীরে বের হয়ে আসে নিখোঁজদের তথ্য। শুরুতে বিদেশি পর্যটকদের ব্যাপারে জানা গেলেও তালিকায় যোগ হন স্থানীয় বাসিন্দা, শ্রমিক, সেনা কর্মকর্তাসহ হাজার হাজার মানুষ। বিধ্বংসী পাহাড়ি বান আঘাত হানার ঠিক পরদিনই দ্বিতীয় দফায় বন্যার ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি হয় নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে। উজানে কাদামাটি পানি জমে সৃষ্টি হয় কৃত্রিম হ্রদ। এরই জেরে উদ্ধার অভিযান থামাতেও হয়েছে বেশ কয়েকবার। ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাড়তে থাকে প্রাণহানি ও নিখোঁজের সংখ্যা।

বন্যা দুর্গত এলাকার অন্তত ১৯টি সেতু এবং ৪০ কিলোমিটার সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় হেলিকপ্টারে করে জরুরি খাবার ও ওষুধ পৌঁছাতে শুরু করে সেনাবাহিনী। দুর্গোগের ৩য় দিন থেকেই লাশ শনাক্ত ও সংরক্ষণ নিয়ে বিপদে পড়ে স্থানীয় হাসপাতাল ও মর্গ কর্তৃপক্ষ। তাই আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বিদেশি উদ্ধারকারী দলকে দেশে প্রবেশের অনুমতি দেয় নেপাল সরকার। তবে সাধারণ উদ্ধার অভিযান নয়, সুড়ঙ্গে আটকে পড়াদের উদ্ধার নেয়া হয় চীনা টানেল রেসকিউ টিমের সদস্য। এছাড়া লাশ সংরক্ষণ ও ফরেনসিকের জন্য ভিনদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নিয়ে রাজি হয় কাঠমান্ডু।

এক পর্যায়ে হ্রদের পানি নামতে শুরু করলেও বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে আটকা পড়া শ্রমিকদের উদ্ধারে কোনো গতি হয়না। পাঠানো হয় চীনের টানেল রেসকিউ টিম। ভারী যন্ত্রপাতি, এক্সকাভেটর, ড্রিল এবং থার্মাল ড্রোন দিয়ে আরও জোরদার করা হয় তল্লাশি। ৯ দিনে বিভিন্ন টানেল থেকে ৩০০ জনকে উদ্ধার করা হলেও ৬ শতাধিক শ্রমিকের হদিস মেলেনি এখনও।

স্মরণকালের ভয়াবহ এই দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা আর উদ্ধারকারী দলগুলোর প্রচেষ্টায় দুর্গতদের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে জরুরি সামগ্রী। যদিও তা পর্যাপ্ত না। আবার ত্রাণের খাবার বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করছেন অনেকে। কারণ বিনামূল্যে যে ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে তা সাধারণ রোগের। হৃদরোগ, ক্যান্সার বা অন্য দুরারোগ্য ব্যাধির জন্য নির্ধারিত ওষুধ কিনতে প্রয়োজন নগদ অর্থের। যা সহায় সম্বলহীন মানুষের নাগালের বাইরে।

২১ হাজার দেশি বিদেশি উদ্ধারকর্মী নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ ১২ হাজারের বন্যা দুর্গতকে উদ্ধার করলেও এখনও হদিস পাওয়া যায়নি ৪ হাজারেরও বেশি মানুষের। বিপরীতে প্রতিদিনই বিভিন্ন নদীর ভাটি এলাকায় ভেসে উঠছে লাশ। এর ৯৬ শতাংশই শনাক্ত করা যাচ্ছে না। কোথাও প্রতীকী সৎকার, কোথাও গণকবর দেয়া হচ্ছে। রাবনের চিতার মতো জ্বলছে শ্মশানের আগুন।

আর যাদের স্বজন এখনও নিখোঁজ, হাসপাতাল থেকে মর্গে ছুটে বেড়াচ্ছেন তারা। তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে একেবারেই ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে নিখোঁজদের বেঁচে ফেরার সম্ভাবনা। মন্দির উপাসনালয়ে চলছে পূজা-প্রার্থনা। মিসিং ওয়ালে ঘণ্টায় ঘণ্টায় টানানো হচ্ছে নতুন ছবি।

আপাতত দুর্গতদের পুনর্বাসন আর দুর্যোগ পরবর্তী সংকট নিয়েই মাথা ঘামাচ্ছে বালেন্দ্র শাহ’র সরকার। বৈদেশিক সহায়তার বিষয়ে কাঠমান্ডুর স্পষ্ট বার্তা অনুদান বা সহায়তা নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী দেশগুলো থেকে ক্ষতিপূরণ চায় নেপাল।