ঢাকা ০৬:৪৩ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তেলকাণ্ড: কৃত্রিম সংকট, নাকি ব্যবস্থাপনায় সমস্যা

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৫:০০:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬
  • / 61

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও পড়ছে। বিশেষ করে দেশজুড়ে জ্বালানি সংকট অনেকটা দৃশ্যমান। সারা দেশে জ্বালানি সংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে সংকট না থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে তেল পাচ্ছেন না মোটর সাইকেল চালকরা। আর পাম্পের কাছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল না পেয়ে অনেকের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

দেশে বিভিন্ন জেলায় অনেক পেট্রোল পাম্প বন্ধ রয়েছে। কোথাও ‘জ্বালানি নেই’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে, আবার কোথাও পাম্প ঢেকে রাখা হয়েছে কাপড় দিয়ে। জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে এক অস্থির পরিস্থিতি। কোথাও পাম্প বন্ধ, কোথাও আবার দীর্ঘ লাইন। সাধারণ গ্রাহকদের মনে এখন বড় প্রশ্ন—এই সংকট কি আসলেই তেলের অভাব, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনও কৃত্রিম কারসাজি ও অব্যবস্থাপনা?

সরকার তেলের কোনো সংকট নেই বলে আশ্বস্ত করলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এই সংকটের নেপথ্যে মূল সমস্যা কোথায়—তা নিয়ে পাম্প সংশ্লিষ্টরা মুখ খুলতে নারাজ। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি পেট্রল পাম্পের এক কর্মকর্তা জানান, আগে যে পরিমাণ তেল সরবরাহ পাওয়া যেত, এখন আসছে তার প্রায় অর্ধেক। তিনি বলেন, আগে যেখানে ৫ হাজার লিটার তেল আসত, এখন পাচ্ছি ২ থেকে আড়াই হাজার লিটার। সরবরাহ কম থাকায় আমাদেরও কিছু করার নেই।

জেট ফুয়েলের দাম ৮০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত

ফিলিং স্টেশনগুলো কৃত্রিমভাবে তেল মজুদ করছে কি না—এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

দেশে হঠাৎ করে তেলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মূলত সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেন, দেশে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে, তাই জনগণকে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ না করার আহ্বান জানাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, সবাই প্রয়োজন মতো তেল পাবেন এবং শঙ্কার কোনও কারণ নেই। প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল না নিলে সরবরাহ ঠিক থাকবে। তেলের দাম বাড়ানো নিয়ে কাজ করে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন, তবে সরকার এখনও তেলের দাম বাড়ায়নি।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমাদের সামনে কিন্তু খুব ভালো সময় না। একটু কঠিন সময়। এই যুদ্ধটা আমাদের একটু ক্ষতি করছে। আমাদের তেলের দাম বাড়বে, আমাদের জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে, কিন্তু সেগুলোকে সয়ে নিয়ে আমাদেরকে এগোতে হবে।’

অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার আভাস পেলে বা নীতিগত কোনও পরিবর্তনের অপেক্ষায় ডিলার ও পাম্প মালিকদের একটি অংশ তেল মজুত করা শুরু করেন। অধিক মুনাফার আশায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলার অভিযোগ নতুন নয়। বিশেষ করে যখন সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার দাবি করে কর্তৃপক্ষ, তখনও পাম্পগুলোতে তেল নেই সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা গেলে জনমনে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।

গ্রাহকরা বলছেন, তেল মাঝে মাঝে পাওয়া যাচ্ছে। আবার একবারে সরবরাহ বন্ধও রাখছে পাম্পগুলো। এটি সরকারের ব্যবস্থাপনা সমস্যা অথবা সিন্ডিকেট হতে পারে। গাড়ি ও মোটরসাইকেলে পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় হন্যে হয়ে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরতে দেখা গেছে অনেক চালকদের।

এক বাইক চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আসলেই তেল নেই, নাকি কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে—সরকারের বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ, খোলা বাজারে গেলে ঠিকই তেল পাওয়া যায়, কিন্তু পাম্পে গেলে বলে তেল নেই।’

কেউ কেউ বলছেন, নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল দেয়া হচ্ছে তবে সময় অনেক বেশি লাগছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, ২০০-৩০০ টাকার বেশি তেল নেয়া যাচ্ছে না। এর জন্যও ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ঘটছে অনাকাঙ্খিত ঘটনাও। একটি সিন্ডিকেট করে তেল নিয়ে এরকম করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা এরকম অভিযোগ উঠেছে।

সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরায় তেলের জন্য সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত তেল মিলছে না। এরপরও মাত্র তিনশো থেকে পাঁচশো টাকার তেল নিতে পারছেন তারা। ভুক্তভোগীরা বলছেন, এভাবে পাম্প থেকে দুই-তিন লিটার তেল কিনতে সারা দিন বা সারা রাত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

অন্যদিকে বাইরের দোকানগুলোতে আগে থেকে মজুত করা তেল বিক্রি করছে প্রায় দ্বিগুণ দামে। সেখানে পেট্রোল প্রতি লিটার ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা এবং অকটেন ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। এতে আয়-বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে বলেও জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। যদিও পাম্প মালিকরা বলছেন, ডিপো থেকে যতটুকু পাওয়া যাচ্ছে আমরা তাই বিক্রি করছি।

নওগাঁ: নওগাঁর ফিলিং স্টেশনগুলোতে সপ্তাহ ধরে তীব্র জ্বালানি সংকট চলছে। পাম্পগুলোতে তেলের জন্য হাহাকার থাকলেও স্থানীয় হাট-বাজারে বোতলে করে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে পেট্রোল ও অকটেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে ‘তেল নেই’ লেখা নোটিশ ঝুলছে। কিন্তু ২০০ থেকে ৩০০ টাকা লিটার দরে তেল বিক্রি হচ্ছে বাইরের দোকানগুলোতে। সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট পাম্প থেকে তেল সরিয়ে খোলা বাজারে চড়া দামে বিক্রি করছে। সরকার নির্ধারিত পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা দরে বিক্রি হওয়ার কথা। ভুক্তভোগীরা বলছেন, প্রশাসনের নীরবতার কারণে অসাধু ব্যবসায়ীরা তেল মজুত করে প্রকাশ্যে চড়া দামে বিক্রি করার সুযোগ পাচ্ছে।

নেত্রকোণা: নেত্রকোনায়ও তেল সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। জেলা শহরের বেশিরভাগ পাম্প বন্ধ থাকায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও মিলছে না তেল। যদিও সংকট কাটানোর আশ্বাস দিয়েছে জেলা প্রশাসন। এছাড়াও দেশের অন্যান্য জেলায় জ্বালানি তেল সংকটের খবর পাওয়া গেছে।

জ্বালানি তেলের বর্তমান মজুদ চিত্র
বিপিসি সূত্র জানায়, পরিস্থিতি সামাল দিতে এপ্রিলে সমুদ্রপথে ১৪টি জাহাজ এবং পাইপলাইনে ৩টি পার্সেলের মাধ্যমে বিশাল অংকের জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা (Import planning) রয়েছে।

এপ্রিলের লক্ষ্যমাত্রা: ৩ লাখ টন ডিজেল (Diesel), ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল (Jet fuel), ২৫ হাজার টন অকটেন (Octane) এবং ৫০ হাজার টন ফার্নেস অয়েল।

বর্তমান অবস্থা: এখন পর্যন্ত ১ লাখ ১০ হাজার টন ডিজেল এবং পাইপলাইনে ২০ হাজার টন সরবরাহের নিশ্চয়তা (Supply assurance) মিলেছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (BPC) এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের মজুদ পরিস্থিতি নিম্নরূপ:

ডিজেল (Diesel): দেশে ডিজেলের সবচেয়ে বেশি চাহিদা। বর্তমানে ১ লাখ ৮৫ হাজার টন ডিজেল মজুদ আছে, যা দিয়ে আগামী ১৪ দিন সরবরাহ সচল রাখা সম্ভব।
অকটেন (Octane): বর্তমানে মজুদের পরিমাণ ১১ হাজার টন, যা দিয়ে প্রায় ৯ দিন চলবে।
পেট্রোল (Petrol): ১৬ হাজার ৬০৫ টন মজুদ আছে, যা দিয়ে আগামী ১১ দিন চাহিদা মেটানো যাবে।
জেট ফুয়েল (Jet Fuel): উড়োজাহাজের জ্বালানি মজুদ আছে প্রায় ৩৪ হাজার ৮৭৭ টন, যা দিয়ে ২৩ দিন চলবে।
ফার্নেস অয়েল (Furnace Oil): বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত এই তেলের মজুদ আছে ৭০ হাজার ৮৩৩ টন, যা চলবে ২৯ দিন।
কেরোসিন (Kerosene): মজুদ আছে ৮ হাজার ৫৭১ টন, যা দিয়ে ৪৬ দিন সরবরাহ সম্ভব।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

তেলকাণ্ড: কৃত্রিম সংকট, নাকি ব্যবস্থাপনায় সমস্যা

আপডেট সময় : ০৫:০০:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও পড়ছে। বিশেষ করে দেশজুড়ে জ্বালানি সংকট অনেকটা দৃশ্যমান। সারা দেশে জ্বালানি সংকট দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে সংকট না থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে তেল পাচ্ছেন না মোটর সাইকেল চালকরা। আর পাম্পের কাছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল না পেয়ে অনেকের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

দেশে বিভিন্ন জেলায় অনেক পেট্রোল পাম্প বন্ধ রয়েছে। কোথাও ‘জ্বালানি নেই’ লেখা সাইনবোর্ড ঝুলছে, আবার কোথাও পাম্প ঢেকে রাখা হয়েছে কাপড় দিয়ে। জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে তৈরি হয়েছে এক অস্থির পরিস্থিতি। কোথাও পাম্প বন্ধ, কোথাও আবার দীর্ঘ লাইন। সাধারণ গ্রাহকদের মনে এখন বড় প্রশ্ন—এই সংকট কি আসলেই তেলের অভাব, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনও কৃত্রিম কারসাজি ও অব্যবস্থাপনা?

সরকার তেলের কোনো সংকট নেই বলে আশ্বস্ত করলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এই সংকটের নেপথ্যে মূল সমস্যা কোথায়—তা নিয়ে পাম্প সংশ্লিষ্টরা মুখ খুলতে নারাজ। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি পেট্রল পাম্পের এক কর্মকর্তা জানান, আগে যে পরিমাণ তেল সরবরাহ পাওয়া যেত, এখন আসছে তার প্রায় অর্ধেক। তিনি বলেন, আগে যেখানে ৫ হাজার লিটার তেল আসত, এখন পাচ্ছি ২ থেকে আড়াই হাজার লিটার। সরবরাহ কম থাকায় আমাদেরও কিছু করার নেই।

জেট ফুয়েলের দাম ৮০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত

ফিলিং স্টেশনগুলো কৃত্রিমভাবে তেল মজুদ করছে কি না—এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।

দেশে হঠাৎ করে তেলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় মূলত সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেন, দেশে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে, তাই জনগণকে অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ না করার আহ্বান জানাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, সবাই প্রয়োজন মতো তেল পাবেন এবং শঙ্কার কোনও কারণ নেই। প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল না নিলে সরবরাহ ঠিক থাকবে। তেলের দাম বাড়ানো নিয়ে কাজ করে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন, তবে সরকার এখনও তেলের দাম বাড়ায়নি।

স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমাদের সামনে কিন্তু খুব ভালো সময় না। একটু কঠিন সময়। এই যুদ্ধটা আমাদের একটু ক্ষতি করছে। আমাদের তেলের দাম বাড়বে, আমাদের জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে, কিন্তু সেগুলোকে সয়ে নিয়ে আমাদেরকে এগোতে হবে।’

অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার আভাস পেলে বা নীতিগত কোনও পরিবর্তনের অপেক্ষায় ডিলার ও পাম্প মালিকদের একটি অংশ তেল মজুত করা শুরু করেন। অধিক মুনাফার আশায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলার অভিযোগ নতুন নয়। বিশেষ করে যখন সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার দাবি করে কর্তৃপক্ষ, তখনও পাম্পগুলোতে তেল নেই সাইনবোর্ড ঝুলতে দেখা গেলে জনমনে সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।

গ্রাহকরা বলছেন, তেল মাঝে মাঝে পাওয়া যাচ্ছে। আবার একবারে সরবরাহ বন্ধও রাখছে পাম্পগুলো। এটি সরকারের ব্যবস্থাপনা সমস্যা অথবা সিন্ডিকেট হতে পারে। গাড়ি ও মোটরসাইকেলে পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় হন্যে হয়ে এক পাম্প থেকে আরেক পাম্পে ঘুরতে দেখা গেছে অনেক চালকদের।

এক বাইক চালক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আসলেই তেল নেই, নাকি কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে—সরকারের বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত। কারণ, খোলা বাজারে গেলে ঠিকই তেল পাওয়া যায়, কিন্তু পাম্পে গেলে বলে তেল নেই।’

কেউ কেউ বলছেন, নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল দেয়া হচ্ছে তবে সময় অনেক বেশি লাগছে। আবার কেউ কেউ বলছেন, ২০০-৩০০ টাকার বেশি তেল নেয়া যাচ্ছে না। এর জন্যও ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ঘটছে অনাকাঙ্খিত ঘটনাও। একটি সিন্ডিকেট করে তেল নিয়ে এরকম করছে অসাধু ব্যবসায়ীরা এরকম অভিযোগ উঠেছে।

সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরায় তেলের জন্য সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত তেল মিলছে না। এরপরও মাত্র তিনশো থেকে পাঁচশো টাকার তেল নিতে পারছেন তারা। ভুক্তভোগীরা বলছেন, এভাবে পাম্প থেকে দুই-তিন লিটার তেল কিনতে সারা দিন বা সারা রাত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

অন্যদিকে বাইরের দোকানগুলোতে আগে থেকে মজুত করা তেল বিক্রি করছে প্রায় দ্বিগুণ দামে। সেখানে পেট্রোল প্রতি লিটার ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা এবং অকটেন ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। এতে আয়-বাণিজ্য বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে বলেও জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। যদিও পাম্প মালিকরা বলছেন, ডিপো থেকে যতটুকু পাওয়া যাচ্ছে আমরা তাই বিক্রি করছি।

নওগাঁ: নওগাঁর ফিলিং স্টেশনগুলোতে সপ্তাহ ধরে তীব্র জ্বালানি সংকট চলছে। পাম্পগুলোতে তেলের জন্য হাহাকার থাকলেও স্থানীয় হাট-বাজারে বোতলে করে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে পেট্রোল ও অকটেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলার অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে ‘তেল নেই’ লেখা নোটিশ ঝুলছে। কিন্তু ২০০ থেকে ৩০০ টাকা লিটার দরে তেল বিক্রি হচ্ছে বাইরের দোকানগুলোতে। সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট পাম্প থেকে তেল সরিয়ে খোলা বাজারে চড়া দামে বিক্রি করছে। সরকার নির্ধারিত পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা দরে বিক্রি হওয়ার কথা। ভুক্তভোগীরা বলছেন, প্রশাসনের নীরবতার কারণে অসাধু ব্যবসায়ীরা তেল মজুত করে প্রকাশ্যে চড়া দামে বিক্রি করার সুযোগ পাচ্ছে।

নেত্রকোণা: নেত্রকোনায়ও তেল সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। জেলা শহরের বেশিরভাগ পাম্প বন্ধ থাকায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও মিলছে না তেল। যদিও সংকট কাটানোর আশ্বাস দিয়েছে জেলা প্রশাসন। এছাড়াও দেশের অন্যান্য জেলায় জ্বালানি তেল সংকটের খবর পাওয়া গেছে।

জ্বালানি তেলের বর্তমান মজুদ চিত্র
বিপিসি সূত্র জানায়, পরিস্থিতি সামাল দিতে এপ্রিলে সমুদ্রপথে ১৪টি জাহাজ এবং পাইপলাইনে ৩টি পার্সেলের মাধ্যমে বিশাল অংকের জ্বালানি আমদানির পরিকল্পনা (Import planning) রয়েছে।

এপ্রিলের লক্ষ্যমাত্রা: ৩ লাখ টন ডিজেল (Diesel), ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল (Jet fuel), ২৫ হাজার টন অকটেন (Octane) এবং ৫০ হাজার টন ফার্নেস অয়েল।

বর্তমান অবস্থা: এখন পর্যন্ত ১ লাখ ১০ হাজার টন ডিজেল এবং পাইপলাইনে ২০ হাজার টন সরবরাহের নিশ্চয়তা (Supply assurance) মিলেছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (BPC) এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের মজুদ পরিস্থিতি নিম্নরূপ:

ডিজেল (Diesel): দেশে ডিজেলের সবচেয়ে বেশি চাহিদা। বর্তমানে ১ লাখ ৮৫ হাজার টন ডিজেল মজুদ আছে, যা দিয়ে আগামী ১৪ দিন সরবরাহ সচল রাখা সম্ভব।
অকটেন (Octane): বর্তমানে মজুদের পরিমাণ ১১ হাজার টন, যা দিয়ে প্রায় ৯ দিন চলবে।
পেট্রোল (Petrol): ১৬ হাজার ৬০৫ টন মজুদ আছে, যা দিয়ে আগামী ১১ দিন চাহিদা মেটানো যাবে।
জেট ফুয়েল (Jet Fuel): উড়োজাহাজের জ্বালানি মজুদ আছে প্রায় ৩৪ হাজার ৮৭৭ টন, যা দিয়ে ২৩ দিন চলবে।
ফার্নেস অয়েল (Furnace Oil): বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত এই তেলের মজুদ আছে ৭০ হাজার ৮৩৩ টন, যা চলবে ২৯ দিন।
কেরোসিন (Kerosene): মজুদ আছে ৮ হাজার ৫৭১ টন, যা দিয়ে ৪৬ দিন সরবরাহ সম্ভব।