৫০ বছর আগে ইহুদির তৈরি ‘লোগো’ এখনও মেসিদের বুকে
- আপডেট সময় : ১১:২৬:০৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬
- / 7
সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের কাছে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের লোগোটি অতি পরিচিত। বিশ্বসেরা তারকা লিওনেল মেসির বুকে শোভা পাওয়া এই লোগোটি একটি লম্বালম্বি ঢাল আকৃতির, যার নিচের দিকে বিজয় ও গৌরবের প্রতীক হিসেবে রয়েছে লরেল পাতা এবং ওপরের দিকে রয়েছে তিনটি সোনালী তারকা; যা আর্জেন্টিনার তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের স্মারক।
কিন্তু খুব কম মানুষই জানেন যে, বিশ্বজুড়ে পরিচিত এই লোগোটির শিকড় মিশে আছে আর্জেন্টিনার ইহুদি স্পোর্টস ক্লাবগুলোর সাথে। এই ক্লাবের মাধ্যমেই এর নকশাকার ফুটবলের প্রতি নিজের ভালোবাসাকে লালন করেছিলেন।
নরবার্তো ‘তোতো’ রুদ যখন ১৯৭৬ সালে এই লোগোটির প্রস্তাব দেন, তখন তার বয়স ছিল ২০-এর কোঠায় এবং তিনি ‘ক্লাব নাউটিকো হাকোয়াজ’ নামক একটি ইহুদি ক্লাবের সদস্য ছিলেন। বুয়েনস আইরেসের একজন সফল ব্যবসায়ী এবং একনিষ্ঠ ফুটবল ভক্ত হিসেবে তিনি তার মেধা ও গ্রাফিক ডিজাইনের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে এই ঐতিহাসিক নকশাটি তৈরি করেন।
আর্জেন্টিনার জার্সি শুধুমাত্র সাদা ও আকাশী নীল রঙের ডোরার জন্যই পরিচিত ছিল। কিন্তু তোতো রুদ লক্ষ্য করেন যে, ইউরোপীয় দলগুলোর মতো আর্জেন্টিনার নিজস্ব কোনো বিশেষ প্রতীক নেই। এই পর্যবেক্ষণ থেকেই তিনি লোগোটি তৈরির উদ্যোগ নেন।
সাদা-কালো টেলিভিশনের যুগে আন্তর্জাতিক ফুটবল দেখার সময় রুদ লক্ষ্য করেন, দর্শকরা পশ্চিম জার্মানির জার্সি তাদের ঈগল পাখি দেখে বা সোভিয়েত ইউনিয়নের জার্সি তাদের বিশেষ লেখা (CCCP) দেখে সহজেই চিনতে পারতেন। কিন্তু আর্জেন্টিনার জার্সিটি একই ধরণের ডোরার জার্সি পরা অন্য যেকোনো ক্লাবের সাথে গুলিয়ে ফেলার সম্ভাবনা ছিল। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, আর্জেন্টিনার ফুটবল ঐতিহ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি দৃশ্যমান পরিচয় প্রয়োজন।
রুদ প্রায় ২০টি নকশা প্রস্তুত করেন এবং আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) নির্বাহী কমিটির কাছে জমা দেন। নকশাটি অনুমোদনের মাত্র কয়েক দিন পর ১৯৭৬ সালের ২৮ নভেম্বর বুয়েনস আইরেসে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে প্রথমবারের মতো লোগোটি জার্সিতে ব্যবহার করা হয়।
পঞ্চাশ বছর পর আজও এই লোগোটি প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে এবং এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত স্পোর্টস লোগোগুলোর একটি। বিশ্বজুড়ে মেসির জার্সির আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার কারণে এই লোগোটি এখন সবার কাছে চেনা। তোতো রুদের ছেলে অলিভার রুদ জানান, ‘একজন ইহুদি এবং একজন আর্জেন্টাইন হিসেবে এটি আমাদের কাছে অনেক বড় এক গর্বের বিষয়।’
তোতো রুদ তার জীবদ্দশায় নিজের নকশা করা লোগো পরে আর্জেন্টিনাকে ১৯৭৮ এবং ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ জিততে দেখেছেন। তবে ২০২২ সালের তৃতীয় শিরোপা দেখে যেতে পারেননি তিনি। ২০১০ সালে ৬১ বছর বয়সে তিনি মারা যান এবং তাকে লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম ইহুদি কবরস্থান ‘লা তাবলাদা’-তে সমাহিত করা হয়।
আর্জেন্টিনার ইহুদি অভিবাসীদের হাত ধরে ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ক্লাব নাউটিকো হাকোয়াজ’ ফুটবলসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু। হিব্রু শব্দ ‘হাকোয়াজ’-এর অর্থ হলো ‘শক্তি’। এই ক্লাব থেকেই টেনিস তারকা ডিয়েগো শোয়ার্টজম্যানের মতো অনেক নামী ক্রীড়াবিদ উঠে এসেছেন। ক্লাবের সভাপতি ওসভালদো অফম্যান বলেন, আমাদের একজন সদস্য এএফএ-র লোগো তৈরি করেছেন; এটি আমাদের জন্য বিশাল সম্মানের।
গতকাল বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াইয়ে মিশরের মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। এই ম্যাচের আগে থেকেই উত্তপ্ত ছিল পরিবেশ, কারণ মিশরের কোচ হোসাম হাসান আগের ম্যাচে জয়ের পর ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়ান। মাঠের ভেতর তার সেই পতাকা হাতে হাঁটা এবং গ্যালারিতে ‘ফ্রি ফিলিস্তিন’ স্লোগান মুহূর্তেই বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়ে যায়।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আর্জেন্টিনা ও মিশরের এই ম্যাচটি যেন ছায়া ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছিল, যদিও কোনো দেশই সরাসরি এই টুর্নামেন্টে খেলছে না। একদিকে মিশর ফিলিস্তিনকে সমর্থন দিচ্ছে, অন্যদিকে আর্জেন্টিনা সরকার ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক। এমনকি ইসরায়েলি দর্শকদের ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, ৩৮ শতাংশ ইসরায়েলি আর্জেন্টিনাকেই চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দেখতে চান।
এই নকআউট ম্যাচের আগে মেসির পুরনো একটি বিতর্কও আলোচনায় আসে। দশ বছর আগে একটি মিশরীয় টিভি প্রোগ্রামে নিজের জুতো দান করার ঘোষণা দিয়ে তোপের মুখে পড়েছিলেন মেসি। মিশরের ফুটবল কর্তারা সে সময় তাকে ‘ইহুদি’ ও ‘ইসরায়েলপন্থী’ আখ্যা দিয়ে তার দান প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তৎকালীন মিশরীয় ফুটবল ফেডারেশনের মুখপাত্র আজমি মোগাহেদ বলেছিলেন, ‘আমাদের তার জুতোর প্রয়োজন নেই।’
৩৯ বছর বয়সী মেসির জন্য এটিই সম্ভবত শেষ বিশ্বকাপ। তাই মিশরের কাছে হেরে গেলে এটিই হতে পারত তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। খেলায় এক পর্যায়ে মিশর ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেলেও মেসি নিজের জাদুকরী পারফরম্যান্সে একটি গোল এবং একটি অ্যাসিস্ট করে আর্জেন্টিনাকে ৩-২ ব্যবধানে অবিশ্বাস্য এক জয় এনে দেন।
তোতো রুদের ছেলে অলিভারের কাছে এই ম্যাচটি ছিল স্রেফ একটি জয় নয়, বরং তার বাবার সৃষ্টিকে নতুন করে অনুভব করার সুযোগ। তিনি বলেন, ‘যতবার আমি আর্জেন্টিনার লোগোটি দেখি, ততবার আমি অবাক হই যে ৫০ বছর আগে আমার বাবা এটি তৈরি করেছিলেন। প্রতিটি লোগোর ভেতরে আমি বাবার হৃদয়ের এক টুকরো অনুভব করি।’
























শাপলা চত্বর হত্যাযজ্ঞের তদন্ত শেষ, আসামি হচ্ছেন যারা