জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে ক্ষোভ: অস্থিরতার শঙ্কা
- আপডেট সময় : ১০:৫০:২০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 2
জ্বালানি তেলের দামের নতুন রেকর্ডে চরম ক্ষুব্ধ ভোক্তারা। গণপরিবহনের ভাড়া থেকে শুরু করে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়াসহ চরম নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা করছেন তারা। ইতোমধ্যেই গণপরিবহনের বাড়তি ভাড়া আদায় করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনে লিটার প্রতি ২০ টাকা হারে বাড়ানো হয়েছে। ডিজেল প্রতি লিটার ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অতীতে কখনও জ্বালানি তেলের দাম এই পর্যায়ে ছিল না।
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম যখন কমতির দিকে ঠিক সেই সময়ে দাম বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রেন্ট ক্রুডের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল (৮ মার্চ ২০২২) ব্যারেল প্রতি ১৩৭.৬৪ ডলার। আর সর্বোনিম্ন দামের রেকর্ড করা হয় করোনার সময় ২০২১ সালের ৪ জানুয়ারি ৫০.৩৩ ডলার। যা ইরান যুদ্ধের আগে ৭২ ডলার ছিল, বর্তমানে চলছে ১০১ ডলারের কাছাকাছি।
শুধু ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কমতির দিকে নয়, পরিশোধিত ডিজেলের দামও কমতির দিকে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত প্ল্যাটসের তথ্য অনুযায়ী, ২০ সেপ্টেম্বর পরিশোধিত ডিজেল বিক্রি হয়েছে ১৬৯ ডলারে, যা আগের দিন ১৯ সেপ্টেম্বর ছিল ১৭৭ এবং তার আগের দিন ১৮ সেপ্টেম্বর ছিল ১৮৬ ডলার। বাংলাদেশও জ্বালানি তেল কেনাকাটা করে প্ল্যাটসের দর অনুযায়ী।
দাম বাড়ানো সংক্রান্ত সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, জ্বালানি তেল প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে পাচার হওয়ার বড় ঝুঁকিতে থাকায় মূল্য সমন্বয় করতে হয়েছে। জ্বালানির বাজার স্বাভাবিক হয়ে এলে আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যেই চাইবো মূল্য আবারও সমন্বয় করে আগের জায়গায় কিংবা তার থেকেও আরও কম নির্ধারণ করার।
ডিজেল পাচার হওয়া বক্তব্যের বিষয়ে ক্যাবের জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেন, অতীতের সরকারও এই রেকর্ড বাজাতো। পাচার ঠেকানোর জন্য সীমান্তে বিএসএফ রয়েছে, তাদের পেছনে হাজার হাজার কোটি টাকা দিতে হচ্ছে। দাম বাড়াতে এসব অজুহাত হিসেবে খুব একটা টেকে না। মূল কথা হচ্ছে, সরকারের ভেতর থেকেই শুল্ক কমিয়ে ঘাটতি মোকাবিলার প্রস্তাব ছিল। সেই দিকে না গিয়ে বিপদজনক পথ বেছে নিয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, ভারতে (কলকাতায়) প্রতি লিটার ডিজেলের মূল্য ১৩৪.৭৬ টাকা, মিয়ানমারে ১৬৪.৮৩ টাকা, নেপালে ১৬১.২৪ টাকা, শ্রীলঙ্কায় ১৭৯.৪২ টাকা, থাইল্যান্ডে ১৫১.২২ টাকা, ভিয়েতনামে ১৩৭ টাকা, মালদ্বীপে ১৪০ টাকা, ফিলিপাইনে ১৬৮.৫৩ টাকা ও পাকিস্তানে ১৮৫.৪৮ টাকা। দাম না বাড়ালে শুধু ডিজেলেই বছরে লোকসান বা ভর্তুকি দিতে হতো প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। আর সব ধরনের জ্বালানি তেল মিলিয়ে সেই লোকসানের পরিমাণ দাঁড়াত প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।
জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ার কারণে পরিবহন ভাড়ায় বিশৃঙ্খলা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় ও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় এ নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবেই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আপনারা আশ্বস্ত থাকতে পারেন।
তবে প্রতিমন্ত্রীর এই কথায় আস্থা রাখতে ভয় পাচ্ছেন ভোক্তারা। কারণ অতীতে এমন নজীর খুব কমই রয়েছে। সুজন নামে একজন বাসযাত্রী দাবি করেছেন, কোন সময় যদি তেলের দাম কমে আসে, তখন কি বাসভাড়া কমবে! আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি, কমবে না। কোন সরকারই পারেনি পরিবহন মালিকদের সঙ্গে।
২০২২ সালের ৫ আগস্ট ডিজেল ও কেরোসিন লিটার প্রতি ৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৪ টাকা লিটার, অকটেন ও পেট্টোল যথাক্রমে ৪৬ ও ৪৪ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা, ১৩০ টাকা লিটার নির্ধারণ করা হয়। ওই দাম বৃদ্ধির পর গণপরিবহনের ভাড়া বেড়েছিল সর্বোচ্চ ২২ শতাংশ। এরপর বিভিন্ন সময়ে কমে ডিজেলের দাম ১০০ টাকায় নেমে আসে। কিন্তু পরিবহনের ভাড়া আর আগের অবস্থায় ফেরেনি।
কিন্তু ফের যখন ডিজেলের দাম বেড়ে যায়, আবার পরিবহনের ভাড়া বাড়ানো হয়। গত ১৮ এপ্রিল প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৪০ টাকা করা হয়। দাম ২০২২ সালের সমান হলেও ফের বাড়ানো হয় গণপরিবহনের ভাড়া। ২৩ এপ্রিল প্রতি কিলোমিটারে ১১ পয়সা বাড়িয়ে আন্তঃজেলায় ২.২৩ টাকা (আগে ২.১২ টাকা), ডিটিসি (ঢাকা ট্রান্সপোর্ট করপোরেশন) এলাকায় ২.৪৩ টাকা (আগে ২.৩২ টাকা) নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটার্স, এজেন্ট অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সচিব মীর আহসান উদ্দিন পারভেজ বলেছেন, সব সেক্টরেই জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। মনিটরিং থাকা উচিত, গাড়ি ভাড়া যদি বাড়ানো হয়, তেলের দাম কমলে যেনো কমে আসে।
তিনি বলেন, ডিপো থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরত্বে তেল আনা নেওয়ার কাজে ব্যবহৃত লরির তেল খরচ বেড়ে যাবে ৬০০ টাকার মতো। ৫০ কিলোমিটার যাতায়াতে ৩০ লিটার ডিজেল লাগে, প্রতি লিটার ২০ টাকা করে হলে ৬০০ টাকা খরচ বেড়ে যাবে। এ জন্য কয়েক পয়সা কমিশন বাড়ানো হয়েছে।
সেলিম মিয়া নামের একজন প্যাক পয়েন্ট ডিলার বলেছেন, যাদের নিজেদের লরি রয়েছে তাদের বিষয়টি এক রকম। আর আমাদের যাদের গাড়ি ভাড়া করতে হয়, তাদের দাম বেড়ে যাবে অনেক বেশি হারে। এখানে আমরা এবং আমাদের সরকার সব সময় অসহায়। যদি সমহারে বাড়ত তাহলে কথা ছিল না। এখন দেখবেন ট্রাকভাড়াও বেড়ে যাবে, এতে সব ধরণের পণ্যের দাম বেড়ে যাবে।রাজনীতি বিশ্লেষণ
ক্যাবের জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম বলেছেন, সরকার ক্ষমতায় আসার পরে সামর্থের সংকটে আছে। যে সব কৌশল অবলম্বন করার কথা, সেখানে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। সরকার জ্বালানি পণ্যের ভর্তুকি কমিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে চাচ্ছে এতে করে সরকার এবং জনগণের উপর চাপ বাড়ছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি খাত যদি মুনাফা মুক্ত হতো তাহলে জনকল্যাণমূলক হতো। যদি লুণ্ঠনমূলক না হতো তাহলে এই খাত লাভে থাকতে পারে। এই অভিযোগ গণশুনানির জন্য কেনো সরকারে এগিয়ে আসে না এটাই বড় বিষ্ময়। কোন পণ্য যৌক্তিক মূল্য যাচাই বাছাই করার এখতিয়ার ভোক্তার রয়েছে। গণশুনানিতে যাচাই বাচাই করার সুযোগ রয়েছে। জ্বালানি পণ্যের দাম নির্ধারণের একক এখতিয়ার বিইআরসির, সরকার সেখানে নিজে নিজের পক্ষ হয়ে দাম বাড়াচ্ছে, জনগণকে নির্যাতন করা হচ্ছে। আমরা এক সভ্য সমাজ হিসেবে দাবি করতে পারি না।





















ঢাকাসহ ২০ জেলায় বয়ে যাচ্ছে তাপপ্রবাহ