ঢাকা ০৭:৫০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৩ জুলাই ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মনোনয়ন বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১০:৪৫:৪৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 72

একই সমস্যা থাকার পরও কারও মনোনয়ন বাতিল, কারোটা বৈধ। কেউ কেউ একই তথ্যে এক আসনে আটকে গেলেও ছাড় পাচ্ছেন অন্য আসনে। কেউ পাচ্ছেন রিভিউয়ের সুযোগ, কাউকে বলা হচ্ছে নেই পুনর্বিবেচনার সুযোগ। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তারা দ্বৈত নীতি অবলম্বন করছেন বলে অভিযোগ প্রার্থীদের। এতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তথা রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গাইবান্ধা ১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাজেদুর রহমানের মনোনয়নপত্র প্রথমে বাতিল হলেও পরে রিভিউ করে তার প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং অফিসার। কিন্তু কক্সবাজার ২ আসনে জামায়াতের আরেক প্রার্থী হামিদুর রহমান আযাদ পুন:বিবেচনার আবেদন করলে-সেখানকার রিটার্নিং অফিসার জানান, রিভিউ করার কোনো বিধান নেই।

যে মামলায় হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে, একই মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি জামায়াতের আরেক নেতা রফিকুল ইসলাম খানের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেন সিরাজগঞ্জের রিটার্নিং কর্মকর্তা। জামায়াতের আরেক নেতা সেলিম উদ্দীনও ওই মামলার আসামি। কিন্তু সিলেটের রিটার্নিং অফিসার তার মনোনয়নও বৈধ ঘোষণা করেন। অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে স্থানীয় প্রশাসন নির্দিষ্ট প্রার্থীকে সুবিধা দিয়েছে বলে দাবি বাতিল হওয়া প্রার্থীদের।

কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘উনারা কাগজ চেয়েছিলেন। বলেছেন আপনার সব কিছু ভ্যালিড। শুধু ট্রাইব্যুনাল কি, কোন ধারায় আপনাকে আদেশ দিয়েছিল রায় দিয়েছিল সে কপিটা দেন। কপিটা উনারা ঠিকভাবে পড়লেন না, আমার আইনজীবীকে আর্গুমেন্ট করতেও দিলেন না।’

সারাদেশে ১৮৪২ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ, বাতিল ৭২৩

দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতায় বাতিল করা হয়েছে কুড়িগ্রাম-৩ আসনের জামায়াত প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহীর মনোনয়ন। ঠিক একই জটিলতা রয়েছে সিলেট-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালিকের হলফনামায়। কিন্তু তার মনোনয়ন বাতিল না করে আপাতত স্থগিত রেখেছেন রিটার্নিং অফিসার।

একই জটিলতায় বিএনপির আরেক প্রার্থী এম কয়সারের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হলেও শেরপুর-২ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী ফাহিম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

কুড়িগ্রাম-৩ আসনে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী বলেন, ‘একদেশে দুই আইন এটা তো একদম আশা করা যায় না। আমাদের কাছে লেগেছে আমাদের রিটার্নিং কর্মকর্তা খুবই বায়াসড। আইনের যে সঠিক রুপ এবং ওনার যে দায়িত্ব তার প্রতি উনি সদ্ব্যবহার করতে পারেন নাই।’

ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা বলেন, ‘স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর দিতে হয়। সেক্ষেত্রে তারা ১০ জনের তথ্য ভ্যারিফাই করতে গিয়েছেন। তার মধ্যে দুইজনের ক্ষেত্রে তারা ঢাকা-৯ এর ভোটার না। এবং এ দুইজনেরই জানার কোনো উপায় ছিলো না তারা ঢাকা-৯ এর ভোটার না।’

অন্যদিকে যাচাই বাছাইয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বগুড়া ২ আসনে আটকে গেলেও একই কাগজ দেখিয়ে ঢাকা ১৮ আসন থেকে তার মনোনয়নপত্র বৈধতা পায়।

একই দেশের নির্বাচন কমিশনের আইন প্রয়োগে দ্বৈতনীতির এ উদাহরণ- ভোটের মাঠের সামঞ্জস্য নষ্ট করছে বলে অভিযোগ তুলছেন অনেকেই। বিশেষ করে নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার প্রথম ধাপেই ইসির নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, এমন মত বিশ্লেষকদের।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম বলেন, ‘এ সংক্রান্ত যে পরিপত্র আছে তাতে বলা আছে যে ছোটখাটো কারণে মনোনয়ন বাতিল করা যায় না। যারা এটা করছেন তাদের এক্ষেত্রে একটা গ্যাপ আছে। তারা এ মেসেজটা ঠিকমতো নিতে পারেন নাই, বুঝতে পারেন নাই বা কিছু একটা হবে।’

সারাদেশে সবমিলিয়ে ২ হাজার ৫৮০টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। ৫ দিনের বাছাইয়ে বাদ পড়ে যায় ৭২৩ জনের মনোনয়ন। নির্বাচন বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, রিটার্নিং অফিসারদের এই দ্বিমুখী আচরণ প্রার্থীদের ভাবমূর্তিতে আঘাত এসেছে, তার দায় কে নিবে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, ‘দলের বাইরে গিয়ে যত পপুলারই হোক কেউ যেন স্বতন্ত্র নির্বাচন করতে না পারে। এটা একধরনের আইনি ইঞ্জিনিয়ারিং সিস্টেম। আমার কাছে মনে হয় অনেক হেভিওয়েট প্রার্থীও বাদ পড়েছে। এটা একধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং। বিষয়টাকে সহজ করবেন। আমার একটা ছোট দল। আমার এক হাজার বা দুই হাজার লেকের সাক্ষর আনছি এ ভোটারগুলার কিন্তু প্রাইভেসি ওপেন হয়ে যাচ্ছে। বড় দল তাদের আইডেন্টিফাই করতে পারছে। আপনি তো ভোটারের প্রাইভেসি রাখছেন না।’

আপিলে গিয়ে সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা যদি যৌক্তিকভাবে তাদের প্রার্থিতা ফেরত পান, তবেই ইসির নিরপেক্ষতা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে বলে মনে করেন তারা।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

মনোনয়ন বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

আপডেট সময় : ১০:৪৫:৪৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ জানুয়ারী ২০২৬

একই সমস্যা থাকার পরও কারও মনোনয়ন বাতিল, কারোটা বৈধ। কেউ কেউ একই তথ্যে এক আসনে আটকে গেলেও ছাড় পাচ্ছেন অন্য আসনে। কেউ পাচ্ছেন রিভিউয়ের সুযোগ, কাউকে বলা হচ্ছে নেই পুনর্বিবেচনার সুযোগ। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তারা দ্বৈত নীতি অবলম্বন করছেন বলে অভিযোগ প্রার্থীদের। এতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তথা রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

গাইবান্ধা ১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাজেদুর রহমানের মনোনয়নপত্র প্রথমে বাতিল হলেও পরে রিভিউ করে তার প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং অফিসার। কিন্তু কক্সবাজার ২ আসনে জামায়াতের আরেক প্রার্থী হামিদুর রহমান আযাদ পুন:বিবেচনার আবেদন করলে-সেখানকার রিটার্নিং অফিসার জানান, রিভিউ করার কোনো বিধান নেই।

যে মামলায় হামিদুর রহমান আযাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে, একই মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি জামায়াতের আরেক নেতা রফিকুল ইসলাম খানের প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেন সিরাজগঞ্জের রিটার্নিং কর্মকর্তা। জামায়াতের আরেক নেতা সেলিম উদ্দীনও ওই মামলার আসামি। কিন্তু সিলেটের রিটার্নিং অফিসার তার মনোনয়নও বৈধ ঘোষণা করেন। অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে স্থানীয় প্রশাসন নির্দিষ্ট প্রার্থীকে সুবিধা দিয়েছে বলে দাবি বাতিল হওয়া প্রার্থীদের।

কক্সবাজার-২ আসনে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘উনারা কাগজ চেয়েছিলেন। বলেছেন আপনার সব কিছু ভ্যালিড। শুধু ট্রাইব্যুনাল কি, কোন ধারায় আপনাকে আদেশ দিয়েছিল রায় দিয়েছিল সে কপিটা দেন। কপিটা উনারা ঠিকভাবে পড়লেন না, আমার আইনজীবীকে আর্গুমেন্ট করতেও দিলেন না।’

সারাদেশে ১৮৪২ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ, বাতিল ৭২৩

দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত জটিলতায় বাতিল করা হয়েছে কুড়িগ্রাম-৩ আসনের জামায়াত প্রার্থী মাহবুবুল আলম সালেহীর মনোনয়ন। ঠিক একই জটিলতা রয়েছে সিলেট-৩ আসনের বিএনপির প্রার্থী যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি এম এ মালিকের হলফনামায়। কিন্তু তার মনোনয়ন বাতিল না করে আপাতত স্থগিত রেখেছেন রিটার্নিং অফিসার।

একই জটিলতায় বিএনপির আরেক প্রার্থী এম কয়সারের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হলেও শেরপুর-২ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী ফাহিম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

কুড়িগ্রাম-৩ আসনে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহী বলেন, ‘একদেশে দুই আইন এটা তো একদম আশা করা যায় না। আমাদের কাছে লেগেছে আমাদের রিটার্নিং কর্মকর্তা খুবই বায়াসড। আইনের যে সঠিক রুপ এবং ওনার যে দায়িত্ব তার প্রতি উনি সদ্ব্যবহার করতে পারেন নাই।’

ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা বলেন, ‘স্বতন্ত্র প্রার্থীর ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর দিতে হয়। সেক্ষেত্রে তারা ১০ জনের তথ্য ভ্যারিফাই করতে গিয়েছেন। তার মধ্যে দুইজনের ক্ষেত্রে তারা ঢাকা-৯ এর ভোটার না। এবং এ দুইজনেরই জানার কোনো উপায় ছিলো না তারা ঢাকা-৯ এর ভোটার না।’

অন্যদিকে যাচাই বাছাইয়ে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বগুড়া ২ আসনে আটকে গেলেও একই কাগজ দেখিয়ে ঢাকা ১৮ আসন থেকে তার মনোনয়নপত্র বৈধতা পায়।

একই দেশের নির্বাচন কমিশনের আইন প্রয়োগে দ্বৈতনীতির এ উদাহরণ- ভোটের মাঠের সামঞ্জস্য নষ্ট করছে বলে অভিযোগ তুলছেন অনেকেই। বিশেষ করে নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার প্রথম ধাপেই ইসির নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, এমন মত বিশ্লেষকদের।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম বলেন, ‘এ সংক্রান্ত যে পরিপত্র আছে তাতে বলা আছে যে ছোটখাটো কারণে মনোনয়ন বাতিল করা যায় না। যারা এটা করছেন তাদের এক্ষেত্রে একটা গ্যাপ আছে। তারা এ মেসেজটা ঠিকমতো নিতে পারেন নাই, বুঝতে পারেন নাই বা কিছু একটা হবে।’

সারাদেশে সবমিলিয়ে ২ হাজার ৫৮০টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। ৫ দিনের বাছাইয়ে বাদ পড়ে যায় ৭২৩ জনের মনোনয়ন। নির্বাচন বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, রিটার্নিং অফিসারদের এই দ্বিমুখী আচরণ প্রার্থীদের ভাবমূর্তিতে আঘাত এসেছে, তার দায় কে নিবে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, ‘দলের বাইরে গিয়ে যত পপুলারই হোক কেউ যেন স্বতন্ত্র নির্বাচন করতে না পারে। এটা একধরনের আইনি ইঞ্জিনিয়ারিং সিস্টেম। আমার কাছে মনে হয় অনেক হেভিওয়েট প্রার্থীও বাদ পড়েছে। এটা একধরনের ইঞ্জিনিয়ারিং। বিষয়টাকে সহজ করবেন। আমার একটা ছোট দল। আমার এক হাজার বা দুই হাজার লেকের সাক্ষর আনছি এ ভোটারগুলার কিন্তু প্রাইভেসি ওপেন হয়ে যাচ্ছে। বড় দল তাদের আইডেন্টিফাই করতে পারছে। আপনি তো ভোটারের প্রাইভেসি রাখছেন না।’

আপিলে গিয়ে সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা যদি যৌক্তিকভাবে তাদের প্রার্থিতা ফেরত পান, তবেই ইসির নিরপেক্ষতা পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে বলে মনে করেন তারা।