কারাভোগের পর আধুনিক পৃথিবী দেখে হতবাক কয়েদি
- আপডেট সময় : ০৪:৫৬:১১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৬
- / 119
চার দশকেরও বেশি সময় কারাগারে কাটিয়ে ২০১৪ সালে নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে পা রাখেন ওটিস জনসন। তখন তার মনে হয়েছিল, তিনি যেন কোনো অবাস্তব জগতে এসে পড়েছেন। চারপাশে দ্রুতগতিতে হাঁটা মানুষ, সবার কানে ঝুলে থাকা সাদা তার, সব মিলিয়ে দৃশ্যটি তার কাছে নিউইয়র্কের চেয়ে কোনো গুপ্তচর সিনেমার মতো মনে হচ্ছিল। ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝির পর থেকে তিনি প্রায় সম্পূর্ণভাবে বাইরের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন।
কারাগার থেকে বের হয়ে জনসন এত পরিবর্তন দেখে বাস্তব জগৎকে বাস্তব হিসেবে মেনে নিতে পারছিলেন না। তার চোখে তখন মনে হয়েছিল, সবাই যেন গোপন এজেন্ট। ১৯৭৫ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে এক পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন ওটিস জনসন। অভিযোগটি তিনি বরাবরই অস্বীকার করে এসেছেন। তবুও তাকে দেয়া হয় যাবজ্জীবন সাজা। আর এরপর তার দীর্ঘ অন্ধকার জীবনের যাত্রা শুরু হয়।
শেষ পর্যন্ত ৪৪ বছর কারাগারে আটকে থাকেন তিনি এবং ২০১৪ সালের আগস্টে ৬৯ বছর বয়সে মুক্তি পান। তবে মুক্তির আগেও তাকে আরও আট মাস অপেক্ষা করতে হয়, কারণ ১৭ বছর বয়সে করা এক দোকানচুরির পুরোনো মামলার জটিলতা তখনও ঝুলে ছিল।
পরে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই মুক্তি আসে হঠাৎ করেই। তার হাতে তুলে দেয়া হয় একটি পরিচয়পত্র, মামলার কিছু কাগজপত্র, দুটি বাস টিকিট এবং ৪০ ডলার। জীবিত কোনো ঘনিষ্ঠ পারিবারিক সম্পর্ক না থাকায়, কারাগার থেকে মুক্তিপ্রাপ্তদের সহায়তা করা হারলেমভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ‘দ্য ফরচুন সোসাইটি’র ওপরই ভরসা করতে হয় তাকে। সংস্থাটি তাকে থাকার জায়গা ও প্রাথমিক সহায়তা দেয়, যা সে সময় আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে আসে।
ট্রান্সকমের সিমিনসহ তিন জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা
কারাগারে যাওয়ার সময় জনসন যে পৃথিবী ছেড়ে গিয়েছিলেন, সেখানে ছিল রোটারি ফোন, রাস্তার মোড়ে মোড়ে পে-ফোন, আর দোকানের কাঁচে শুধু মানুষের প্রতিবিম্ব। ফিরে এসে তিনি দেখলেন, কাঁচের ওপরই চলছে ভিডিও। টাইমস স্কয়ারের বিশাল ডিজিটাল বিলবোর্ড দেখে তিনি বিস্ময়ে হেসে উঠেছিলেন। আল জাজিরার তথ্যচিত্রে তাকে বলতে শোনা যায়। ‘জানালার ওপর ভিডিও?! ‘আমরা তো জানালায় শুধু মানুষ হাঁটতে দেখতাম, কোনো ভিডিও দেখিনি।’
প্রযুক্তির পাশাপাশি মানুষকে দেখেও তিনি সমানভাবে অবাক হয়েছিলেন। তিনি বলেন, ‘অনেকেই নিজেদের সাথে কথা বলছিল, চোখ সামনে স্থির করে, হাতে ছোট ছোট আয়তক্ষেত্রাকার আঙুল দিয়ে টোকা দিচ্ছিল।’ কাছে তাকানোর পরই তিনি বুঝতে পারলেন যে তারগুলো তাদের কান থেকে পকেটে থাকা ডিভাইসে চলে গেছে। অচেনা শব্দ উচ্চারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ওগুলো নাকি আইফোন বলে?’
তিনি যখন বাইরের জগৎ শেষবার দেখে গিয়েছিলেন ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে তখন কেবল গোয়েন্দারাই ইয়ারপিস ব্যবহার করতেন। দৈনন্দিন সাধারণ কাজও তার জন্য ছিল বিভ্রান্তিকর। সুপারমার্কেটে পণ্যের প্রাচুর্য তাকে হতবাক করে দেয়। একসঙ্গে পিনাট বাটার আর জেলি থাকা জার, সারি সারি রঙিন স্পোর্টস ড্রিংক, অগণিত পছন্দের জিনিস সবই ছিল তার কাছে সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। এমনকি পে-ফোনেও তিনি প্রথমে বিভ্রান্ত হন। এক ডলার কল চার্জ দেখে তার মনে হয়েছিল নিশ্চয়ই কোনো ভুল হয়েছে, শেষবার তিনি যখন ফোন করেছিলেন তখন খরচ ছিল ২৫ সেন্ট। পরে তিনি বুঝতে পারেন মানুষ এখন আর সেসব ফোন ব্যবহারই করে না।
ওটিস জনসনের অভিজ্ঞতা অবশ্য বিরল হলেও একেবারে অনন্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব জাস্টিস স্ট্যাটিসটিকস অনুযায়ী, ২০১৩ সালে অঙ্গরাজ্য কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ৩ হাজার ৯০০ জন ২০ বছর বা তার বেশি সময় সাজা ভোগ করেছিলেন, যা সে বছরের মোট মুক্তির শূন্য দশমিক সাত শতাংশেরও কম। দীর্ঘ সময় কারাগারে কাটানো মানুষদের জন্য চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন প্রযুক্তি শেখা নয়, বরং আবার সিদ্ধান্ত নিতে শেখাও।
এই বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছেন হার্ভার্ড কেনেডি স্কুলের গবেষক মারিকে লিম। তিনি দীর্ঘমেয়াদি সাজা শেষে মুক্তি পাওয়া বহু মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তার মতে, এতদিন কারাবন্দি থাকার ফলে মানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ধীরে ধীরে লুপ্ত হয়ে যায়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, গণপরিবহন ব্যবহার, এমনকি কী খাবেন বা দিনের সময়সূচি কী হবে। এসব সাধারণ বিষয়েও তারা হিমশিম খায়।
লিয়েম বলেন, ‘কারাগার ঠিক করে দেয় কখন আলো জ্বলবে, কখন নিভবে। দিনের প্রতিটি মুহূর্ত নির্ধারিত। জীবনের অধিকাংশ সময় যদি এমন ব্যবস্থায় কাটে, তাহলে সমাজে ফিরে এসে পরিকল্পনা করা বা স্বাভাবিকভাবে চলা কতটা কঠিন, তা সহজেই বোঝা যায়।’
তবে এত কিছুর পরও ওটিস জনসনের উপলব্ধি ছিল শান্ত ও সংযত। আল জাজিরার তথ্যচিত্রের শেষদিকে সেন্ট্রাল পার্কে বসে তিনি বলেন, ক্ষোভ আঁকড়ে ধরে রাখলে তা কেবল নিজের অগ্রগতিকেই থামিয়ে দেয়। সমাজ তার কাছে কিছু ঋণী, এই ধারণাকেও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তার কাছে বেঁচে থাকার অর্থ ছিল যা পরিবর্তন করা যায় না তা পুনরুজ্জীবিত করার চেয়ে সামনের দিকে তাকানো। সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া



























সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী