‘আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে, আমি জবাব চাই’
- আপডেট সময় : ১১:৫৬:৩৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 4
আমার ছোট্ট ছেলে কী অন্যায় করেছে, আমি এটার জবাব চাই। আমি কোনো বিচার মানিনা। আমাকে উত্তর দিতে হবে। অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন কুমিল্লায় মৃত উদ্ধার ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতীমের মা নাহিদা বেগম। তিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী শোকসন্তপ্ত পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যান।
নাহিদা বেগম বলতে থাকেন, ‘আমি কোন দেশে থাকি? এটা কোন দেশ? একটা ছেলে বের হলে তাকে মেরে ফেলতে হবে?’
তিনি আর্তনাদ করতে করতে বলেন, ‘আমি বাঁচব ক্যামনে? আমাকে সবাই একটু বলেন, আমার তো একটাই ছেলে।! আমি ক্যামনে আমার জীবন কাটাব? আমি আমার জীবন পার করবো ক্যামনে?’
অন্যদিকে শিশুর বাবা অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ফোনটা নেয়ার জন্য মেরে ফেললো আমার ছেলেকে!’
এসময় উপস্থিত এমপি মনিরুল হকও কাঁদতে থাকেন। তাকেও হতবিহ্বল হয়ে চোখের জল মুছতে দেখা যায়।
এদিকে অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী সন্তান ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে রোববার সাধারণ শোক, ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশায়্যাত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সাধারণ শোক ঘোষণা করেছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সেই সঙ্গে এদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. মজিবুর রহমান মজুমদারের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়্যাত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার গভীরভাবে শোকাহত এবং স্তব্ধ। বিশ্ববিদ্যালয় এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জ্ঞাপন এবং মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার জঘন্য এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। সেই সঙ্গে অপ্রতিমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জ্ঞাপন করেছে।
এ ছাড়াও বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সাধারণ শোক’ ঘোষণা করা হয়েছে। সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব সম্মানিত শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, রোববার বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগের ক্লাস ও পূর্বনির্ধারিত পরীক্ষাসমূহ স্থগিত থাকবে। এ ক্ষেত্রে স্থগিতকৃত পরীক্ষার নতুন সময়সূচি পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট বিভাগ কর্তৃক নোটিশের মাধ্যমে জানানো হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
অপ্রতীমের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী সন্তান ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাত সোয়া ৮টার দিকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহটি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম। তিনি বলেন, রাত সোয়া ৮টার দিকে অপ্রতীমের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এদিকে, অপ্রতীমকে হত্যার ঘটনায় তুহিন, আনাস ও ফাহিম নামে তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
জানা যায়, সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতীমের সঙ্গে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকায় তুহিনকে দেখা যায়। তারা দুজন প্রায় এক ঘণ্টা ক্যাম্পাস এলাকায় অবস্থান করে। ওই সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে শনিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয় পুলিশ। সন্ধ্যা ৭টার দিকে আনাস নামে একজন এবং সাড়ে ৭টার দিকে ফাহিম নামে আরও একজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয়া হয়।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রকিবুল ইসলাম বলেন, সন্দেহভাজন তুহিন, আনাস ও ফাহিমকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছে। ঘটনার রহস্য উদঘাটনসহ এ ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত আছে।
প্রসঙ্গত, শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টার দিকে মায়ের মোবাইল ফোন (আইফোন) নিয়ে ছবি তোলার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয় সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী অপ্রতীম। নিখোঁজের পর পরিবারের সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং পুলিশ বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালায়। নিখোঁজের প্রায় ২১ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুরে লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
সেই শেষ বিকেলে কার সঙ্গে নির্জন পাহাড়ের পথে যাচ্ছিল অপ্রতীম
নিখোঁজ হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে ১৩ বছরের অপ্রতীমকে এক কিশোর/তরুণের সঙ্গে দেখা গিয়েছিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে। এবার সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে, সন্দেহভাজন হিসেবে আটক তুহিনের সঙ্গে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) পড়ন্ত বিকেলে অপ্রতীম নির্জন পাহাড়ের দিকে যাচ্ছে। এই ফুটেজ সামনে আসার পর অপ্রতীমের শেষ সময়ের গতিবিধি নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে অপ্রতীম বর্ডারগার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে মায়ের আইফোন নিয়ে কোটবাড়ীর বাসা থেকে বের হয় সে। এরপর আর বাসায় ফেরেনি।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত অপ্রতীমের ফোনের অবস্থান কোটবাড়ীর গন্ধমতি এলাকায় শনাক্ত করা যায়। এরপর ফোনটির অবস্থান আর পাওয়া যায়নি। ছেলেকে না পেয়ে শুক্রবার রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি করে পরিবার।
পুলিশ জানায়, শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে অপ্রতীম অটোরিকশায় করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে যায়। সেখানে এক যুবকের সঙ্গে তাকে হাত মেলাতে এবং প্রায় এক ঘণ্টা কথা বলতে দেখা যায়। সিসিটিভি ফুটেজে ওই যুবককে দেখা গেলেও তখন তার পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।
এরপরের সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতীমকে তুহিনের সঙ্গে পাহাড়ের দিকে যেতে দেখা গেছে বলে জানা গেছে। সেই ফুটেজের সূত্র ধরেই তুহিনকে আটক করা হয়েছে। তবে অপ্রতীমের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক ছিল এবং কেন তারা নির্জন পাহাড়ের দিকে যাচ্ছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
শনিবার দুপুর ১টার দিকে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকা থেকে অপ্রতীমের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মরদেহ উদ্ধারের পর স্থানীয় এক কৃষক জানান, নির্জন এলাকায় পড়ে থাকা অপ্রতীমের মরদেহ একটি শিয়াল টানাহেঁচড়া করছিল।
এখন তদন্তে নতুন মোড় নিয়েছে, অপ্রতিম কেন তুহিনের সঙ্গে পাহাড়ের দিকে গিয়েছিল? সেখানে কী ঘটেছিল? আর কীভাবে সে ওই নির্জন এলাকায় পৌঁছাল? শিশুটিকে কী পাহাড়ের উপরে তোলার পর সেখানে হত্যা করা হয়েছে নাকি হত্যার পর তার মৃতদেহ পাহাড়ে নিয়ে ফেলে দেয়া হয়েছে?
সিসিটিভি ফুটেজ, আটক তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
কুমিল্লায় নিজেদের বাড়ির পাশে দাফন হবে অপ্রতিমের
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের (১৩) দাফন হবে কুমিল্লার কোটবাড়ি গন্ধমতি এলাকায় নিজেদের বাড়ির পাশের কবরস্থানে। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সকালে তাকে শেষ বিদায় জানানো হবে।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাত সোয়া ৯টার দিকে কোটবাড়ি গন্ধমতি এলাকায় অপ্রতিমদের বাড়ির আঙিনায় দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরীফুল করীম।
উপাচার্য বলেন, অপ্রতিমের দাদার বাড়ি কুষ্টিয়ায় এবং নানার বাড়ি চাঁদপুরে। কুমিল্লার গন্ধমতি এলাকায় তাদের নিজেদের বাড়িতেই অপ্রতিমের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। পরিবারের ইচ্ছায় বাড়ির পাশের কবরস্থানেই তাকে দাফন করা হবে।
তিনি বলেন, রোববার সকাল ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অপ্রতিমের জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে সকাল সাড়ে ১০টায় তাকে দাফন করা হবে।
এর আগে ময়নাতদন্ত শেষে লাশবাহী ফ্রিজিং গাড়িতে করে অপ্রতিমের মরদেহ কোটবাড়ি গন্ধমতি এলাকায় আনা হয়। মরদেহ একনজর দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে শত শত মানুষ সেখানে ছুটে আসেন। দুপুর থেকে পুরো এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়, যা রাতেও অব্যাহত ছিল।
প্রসঙ্গত, শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকা থেকে নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয়ে সে আর বাসায় ফেরেনি। পরে তার বাবা ফিরোজ শাহরিয়ার সদর দক্ষিণ মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
নিখোঁজের পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ গেটের পাশে লালমাই পাহাড়ঘেঁষা সানন্দা গ্রামের একটি ঝোপ থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
অপ্রতিম কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তুহিন নামের একজনকে আটক করেছে পুলিশ। পরে আনাস নামের আরও একজনকে আটক করে এসআরবি। আইফোন নেওয়ার জন্য অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আটক দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।





















‘আমার ছেলে কী অন্যায় করেছে, আমি জবাব চাই’