ঢাকা ০৪:৪২ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সেতুর অভাবে ৩ গ্রামের মানুষের ভরসা নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো

যশোর প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ১২:৪২:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 4

একটি সেতুর অভাবে দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগ ও ভোগান্তি পোহাচ্ছে শত শিক্ষার্থীসহ তিন গ্রামের মানুষ। বিদ্যালয়ে যাতায়াতের একমাত্র পথ হিসেবে একটি নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ স্থানীয় বাসিন্দারা। সেতুর অভাবে প্রতিদিন হাট-বাজারে যেতে হয় দশ কিলোমিটার পথ ঘুরে।

বাঘারপাড়ার খাজুরা বাজার থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার উত্তরে বন্দবিলা বিজয় চন্দ্র রায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবস্থান। ৭-৮টি গ্রামের মাধ্যমিক স্তরের লেখাপড়ার একমাত্র প্রতিষ্ঠান এটি। পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে এ বিদ্যালয়ে। বড় খুদড়া, ছোড় খুদড়া ও প্রেমচারা গ্রাম থেকে শতাধিক শিক্ষার্থী এ বিদ্যালয়ে আসে। বন্দবিলা ও ওই তিন গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা চিত্রা নদী তাদের পৃথক করে রেখেছে। এ নদীর ওপর কোনো সেতু না থাকায় দুর্ভোগে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। ইউনিয়ন পরিষদ, বিদ্যালয় ও স্থানীয়দের আর্থিক সহায়তায় চিত্রা নদীর ওপর কাঠ ও বাঁশের তৈরি প্রায় পঞ্চাশ মিটার লম্বা একটি সাঁকো নির্মাণ হয়েছে।

শুকনা মৌসুমে সাঁকোটি চলাচলের উপযোগী থাকলেও বর্ষা মৌসুমে ঘটে চরম বিপত্তি। নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ওই সাঁকো আর চলাচলের উপযোগী থাকে না।

বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাইম হাসান জানায়, তার বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় আড়াই কিলোমিটার। বাইসাইকেলসহ প্রতিদিন সাঁকো পার হয়ে তাকে বিদ্যালয়ে আসতে হয়। সাঁকো পার না হলে তাকে প্রায় সাত কিলোমিটার পথ ঘুরে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। সম্প্রতি নদী খনন হয়েছে। এ কারণে নদীর পাড় আগের তুলনায় অনেক উঁচু হয়েছে।

বাইসাইকেল নিয়ে সাঁকো থেকে উঠানামায় অনেকটা ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে। বর্ষাকালে নদীর দুই পাড় ও সাঁকোর উপর কর্দমাক্ত হওয়ায় তা চলাচলের অনুপোযোগী হয়ে পড়ে।

বড় খুড়া গ্রামের বাসিন্দা লিয়াকত আলী বলেন, তাদের কৃষি পণ্য বিক্রির প্রধান বাজার খাজুরা ও পুলেরহাট। সেতুর অভাবে তাদের দশ কিলোমিটার পথ ঘুরে হাটে যেতে হয়। বন্দবিলা ও খুদড়া গ্রামের মাঝে চিত্রা নদীর উপর সেতু না থাকায় বছরের পর বছর ধরে তাদের এ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

একই গ্রামের ইউনুচ আলীর বাড়ি ছোট খুদড়ায়। বন্দবিলা বাজারে তার কৃষি যন্ত্রপাতির দোকান আছে। প্রতিদিন ৬ বার তার সাঁকো পার হতে হয়। প্রেমচারার কামরুজ্জামানের বন্দবিলা বাজারে দর্জির দোকান রয়েছে। তাকেও প্রতিদিন ৪ থেকে ৬ বার সাঁকো পার হতে হয়। তারা জানান, সেতুটি নির্মিত হলে বন্দবিলা বাজারে যেমন ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে, তেমনি অন্যান্য হাট-বাজারে যাতায়াতের পথ অর্থেক কমে যেতো।

বন্দবিলা বিজয় চন্দ্র রায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পরিতোষ কুমার মন্ডল বলেন, বর্ষা মৌসুমে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে নির্মিত ওই সেতুটি চলাচলের জন্য একেবারেই অনুপোযোগী হয়ে পড়ে। যে কারণে বর্ষা মৌসুমে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতির সংখ্যাও কমে যায়। প্রতি বছর সাঁকো মেরামতের জন্য বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে মোটা একটি অর্থ ব্যয় করতে হয়।

বন্দবিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সবদুল হোসেন খান বলেন, প্রতি বছর সাঁকোর বাঁশ ও কাঠ পরিবর্তন করতে হয়। দীর্ঘ বাঁশের সাঁকোটি মেরামত করে রাখাও বেশ ব্যয়সাধ্য ব্যাপার। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা দেওয়া হয়। সাঁকোটি অনেক লম্বা হওয়ায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না। সামান্য অসাবধানতায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। তারপরও বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে হয় শিক্ষার্থীদের। ফলে অনেক অভিভাবক সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন।

তিনি আরও বলেন, সেতুটি নির্মাণ হলে শুধু শিক্ষার্থীদেরই সুবিধা হবে না, আশপাশের কয়েকটি গ্রামের দুই সহস্রাধিক মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। কৃষি পণ্য পরিবহনে যেমন সুবিধা হবে, তেমনি স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেরও গতি আসবে।

বাঘারপাড়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও বন্দবিলা বিজয় চন্দ্র রায় মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আশরাফুল আলম বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সাঁকোর সমস্যার কথা শুনে সরেজমিনে গিয়েছি। সেখানে গিয়ে দেখেছি সাঁকোর উপরের কাঠগুলো নতুন হলেও বেশিরভাগ খুঁটি নড়বড়ে হয়ে গেছে। দীর্ঘ সাঁকো মেরামত করে রাখাও খুব কঠিন। মনে হয়েছে একটি সেতু নির্মাণের জন্য এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি হলেও কার্যকর কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

বাঘারপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার ভুপালী সরকার বলেন, সেতুর অভাবে এ অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগের কথা শুনে সরেজমিনে সেতুটি পরিদর্শন করেছি। সেখানে কমপক্ষে পঞ্চাশ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতু প্রয়োজন। দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

সেতুর অভাবে ৩ গ্রামের মানুষের ভরসা নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো

আপডেট সময় : ১২:৪২:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একটি সেতুর অভাবে দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগ ও ভোগান্তি পোহাচ্ছে শত শিক্ষার্থীসহ তিন গ্রামের মানুষ। বিদ্যালয়ে যাতায়াতের একমাত্র পথ হিসেবে একটি নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে তাদের। প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করছেন শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ স্থানীয় বাসিন্দারা। সেতুর অভাবে প্রতিদিন হাট-বাজারে যেতে হয় দশ কিলোমিটার পথ ঘুরে।

বাঘারপাড়ার খাজুরা বাজার থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার উত্তরে বন্দবিলা বিজয় চন্দ্র রায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবস্থান। ৭-৮টি গ্রামের মাধ্যমিক স্তরের লেখাপড়ার একমাত্র প্রতিষ্ঠান এটি। পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে এ বিদ্যালয়ে। বড় খুদড়া, ছোড় খুদড়া ও প্রেমচারা গ্রাম থেকে শতাধিক শিক্ষার্থী এ বিদ্যালয়ে আসে। বন্দবিলা ও ওই তিন গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা চিত্রা নদী তাদের পৃথক করে রেখেছে। এ নদীর ওপর কোনো সেতু না থাকায় দুর্ভোগে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের। ইউনিয়ন পরিষদ, বিদ্যালয় ও স্থানীয়দের আর্থিক সহায়তায় চিত্রা নদীর ওপর কাঠ ও বাঁশের তৈরি প্রায় পঞ্চাশ মিটার লম্বা একটি সাঁকো নির্মাণ হয়েছে।

শুকনা মৌসুমে সাঁকোটি চলাচলের উপযোগী থাকলেও বর্ষা মৌসুমে ঘটে চরম বিপত্তি। নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ওই সাঁকো আর চলাচলের উপযোগী থাকে না।

বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাইম হাসান জানায়, তার বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় আড়াই কিলোমিটার। বাইসাইকেলসহ প্রতিদিন সাঁকো পার হয়ে তাকে বিদ্যালয়ে আসতে হয়। সাঁকো পার না হলে তাকে প্রায় সাত কিলোমিটার পথ ঘুরে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। সম্প্রতি নদী খনন হয়েছে। এ কারণে নদীর পাড় আগের তুলনায় অনেক উঁচু হয়েছে।

বাইসাইকেল নিয়ে সাঁকো থেকে উঠানামায় অনেকটা ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে। বর্ষাকালে নদীর দুই পাড় ও সাঁকোর উপর কর্দমাক্ত হওয়ায় তা চলাচলের অনুপোযোগী হয়ে পড়ে।

বড় খুড়া গ্রামের বাসিন্দা লিয়াকত আলী বলেন, তাদের কৃষি পণ্য বিক্রির প্রধান বাজার খাজুরা ও পুলেরহাট। সেতুর অভাবে তাদের দশ কিলোমিটার পথ ঘুরে হাটে যেতে হয়। বন্দবিলা ও খুদড়া গ্রামের মাঝে চিত্রা নদীর উপর সেতু না থাকায় বছরের পর বছর ধরে তাদের এ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

একই গ্রামের ইউনুচ আলীর বাড়ি ছোট খুদড়ায়। বন্দবিলা বাজারে তার কৃষি যন্ত্রপাতির দোকান আছে। প্রতিদিন ৬ বার তার সাঁকো পার হতে হয়। প্রেমচারার কামরুজ্জামানের বন্দবিলা বাজারে দর্জির দোকান রয়েছে। তাকেও প্রতিদিন ৪ থেকে ৬ বার সাঁকো পার হতে হয়। তারা জানান, সেতুটি নির্মিত হলে বন্দবিলা বাজারে যেমন ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে, তেমনি অন্যান্য হাট-বাজারে যাতায়াতের পথ অর্থেক কমে যেতো।

বন্দবিলা বিজয় চন্দ্র রায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পরিতোষ কুমার মন্ডল বলেন, বর্ষা মৌসুমে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে নির্মিত ওই সেতুটি চলাচলের জন্য একেবারেই অনুপোযোগী হয়ে পড়ে। যে কারণে বর্ষা মৌসুমে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতির সংখ্যাও কমে যায়। প্রতি বছর সাঁকো মেরামতের জন্য বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে মোটা একটি অর্থ ব্যয় করতে হয়।

বন্দবিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সবদুল হোসেন খান বলেন, প্রতি বছর সাঁকোর বাঁশ ও কাঠ পরিবর্তন করতে হয়। দীর্ঘ বাঁশের সাঁকোটি মেরামত করে রাখাও বেশ ব্যয়সাধ্য ব্যাপার। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতা দেওয়া হয়। সাঁকোটি অনেক লম্বা হওয়ায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না। সামান্য অসাবধানতায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। তারপরও বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হতে হয় শিক্ষার্থীদের। ফলে অনেক অভিভাবক সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকেন।

তিনি আরও বলেন, সেতুটি নির্মাণ হলে শুধু শিক্ষার্থীদেরই সুবিধা হবে না, আশপাশের কয়েকটি গ্রামের দুই সহস্রাধিক মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। কৃষি পণ্য পরিবহনে যেমন সুবিধা হবে, তেমনি স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেরও গতি আসবে।

বাঘারপাড়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও বন্দবিলা বিজয় চন্দ্র রায় মাধ্যমিক বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি আশরাফুল আলম বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সাঁকোর সমস্যার কথা শুনে সরেজমিনে গিয়েছি। সেখানে গিয়ে দেখেছি সাঁকোর উপরের কাঠগুলো নতুন হলেও বেশিরভাগ খুঁটি নড়বড়ে হয়ে গেছে। দীর্ঘ সাঁকো মেরামত করে রাখাও খুব কঠিন। মনে হয়েছে একটি সেতু নির্মাণের জন্য এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি হলেও কার্যকর কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

বাঘারপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার ভুপালী সরকার বলেন, সেতুর অভাবে এ অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগের কথা শুনে সরেজমিনে সেতুটি পরিদর্শন করেছি। সেখানে কমপক্ষে পঞ্চাশ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সেতু প্রয়োজন। দুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে দ্রুত এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।