ঢাকা ০২:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬, ২৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
বিশেষ সতর্কীকরণ নোটিশ ::
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় কন্ট্রোল রুম চালু করেছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। কন্ট্রোল রুমের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও গণমাধ্যমকর্মীদের দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর বন্যা পরিস্থিতি ও পূর্বাভাসসংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করা হবে। এ জন্য ০১৩১৮২৩৪৯৬২, ০১৩১৮২৩৪৯৬৩, ০১৩২১১৩৯৫৪২ ও ০১৭০৯৬৫৪৭৯১ মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে। এছাড়া ffwcbwdb@gmail.com এবং ffwc05@yahoo.com ই-মেইলেও তথ্য পাওয়া যাবে।

পাঁচ নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর, চট্টগ্রামে ৩৫ প্রাণহানি

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০১:১৮:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
  • / 10

টানা কয়েক দিনের রেকর্ড পরিমাণ ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম বিভাগজুড়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা, পাহাড়ি ঢল, দেয়ালধস এবং পানির তীব্র স্রোতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটি মিলিয়ে এ পর্যন্ত অন্তত ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

অতিবৃষ্টির কারণে সাঙ্গু, মাতামুহুরী, কাচালং, চেঙ্গী ও মাইনি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে চার জেলার শত শত গ্রাম প্লাবিত হয়েছে এবং কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ৫টি নদীর ৯টি স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে সাঙ্গু নদীর বান্দরবান ও দোহাজারী পয়েন্টে পানি যথাক্রমে ৯৫ ও ২৩ সেন্টিমিটার, মাতামুহুরী নদীর লামা ও চিরিঙ্গা পয়েন্টে ৪৭ ও ৩২ সেন্টিমিটার, কুশিয়ারা নদীর মারকুলি ও ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ১৮ ও ১০ সেন্টিমিটার, মনু নদীর মনু রেলওয়ে ব্রিজ ও মৌলভীবাজার পয়েন্টে ৩৫ ও ৮০ সেন্টিমিটার এবং খোয়াই নদীর বল্লা পয়েন্টে ৬০ সেন্টিমিটার বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে।

এ ছাড়া ৫টি নদীর আরও ৯টি স্টেশন সতর্ক সীমায় রয়েছে। এগুলো হলো– তিস্তা নদীর ডালিয়া (নীলফামারী), কাউনিয়া (লালমনিরহাট) ও তারাপুর (গাইবান্ধা); কুশিয়ারা নদীর শেরপুর (মৌলভীবাজার); সুরমা নদীর কানাইঘাট (সিলেট), ছাতক ও সুনামগঞ্জ; সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দা (নেত্রকোণা) এবং ছোট ফেনী নদীর কোম্পানীগঞ্জ (নোয়াখালী) পয়েন্ট।

পর্যবেক্ষণাধীন ১২৭টি স্টেশনের মধ্যে ৭৯টিতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে, ৪৩টিতে কমেছে এবং ৫টিতে অপরিবর্তিত রয়েছে। নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

আবহাওয়ার সর্বশেষ পরিস্থিতিতে বলা হয়েছে, সমুদ্রবন্দরসমূহ, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ (তিন) নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী (৪৪-৮৮ মিলিমিটার/২৪ ঘণ্টা) থেকে অতি ভারী (৮৮ মিলিমিটার/২৪ ঘণ্টা) বর্ষণ হতে পারে। এর ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর কোথাও কোথাও সাময়িক জলাবদ্ধতা এবং চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় কোথাও কোথাও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে।

পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা, পাহাড়ি ঢল, দেয়ালধস এবং পানির তীব্র স্রোতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজার জেলায়, যেখানে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় বাসিন্দা মিলিয়ে অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরপর বান্দরবানে পাঁচজন, চট্টগ্রামে ছয়জন এবং রাঙামাটিতে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

খাগড়াছড়িতে এখন পর্যন্ত প্রাণহানির খবর না মিললেও জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে।

কক্সবাজারে গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ধস, দেয়ালধস ও ঢলের পানিতে স্থানীয় বাসিন্দা এবং রোহিঙ্গা মিলিয়ে অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প, চকরিয়া, কক্সবাজার পৌরসভা, রামু, টেকনাফ, পেকুয়া ও মহেশখালী।

চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের মহছনিয়াকাটার ডেবলতলী এলাকায় বুধবার (৮ জুলাই) দিবাগত রাত ১টার দিকে পাহাড়ধসে বসতঘর চাপা পড়ে একই পরিবারের দুই শিশু রুমি আক্তার (১৫) ও ওয়াহিদুল ইসলাম (১০) মারা যায়। রুমি বরইতলী দাখিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণির ছাত্রী এবং ওয়াহিদুল চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। তাদের পিতা যথাক্রমে আবদুল মজিদ ও মোহাম্মদ কাজল।

উখিয়ার ৫ নম্বর ক্যাম্পে খাদিজাতুল কুবরা মহিলা হেফজখানায় পাহাড়ধস ও দেয়াল ধসে মৃত্যু হয় রাশিদা বেগম (১৩), উম্মে নেজাতুল (১৩), উম্মে সালমা (১২), উমাইসা বিবি (১৩) এবং শিক্ষিকা শাহিদার।

ক্যাম্প ১১ এর বালুখালী ব্লক সি/১১-তে পাহাড়ধসে একই পরিবারের চার সহোদর উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) এবং হারুনুর রশিদের (৩) প্রাণহানি ঘটে।

উখিয়ার জামতলী ক্যাম্প-১৫-এ পাহাড়ধসে ঘুমন্ত অবস্থায় মারা যান মোহাম্মদ কামাল (কালাম) হোসেন (৪৪), তাঁর স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং তাঁদের চার বছরের ছেলে মোহাম্মদ আরফাত।

কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে মারা যান আলী আকবর (৫০)।

উখিয়ার হলদিয়াপালং ইউনিয়নে মাটির দেয়াল ধসে নিহত হন মোহাম্মদ মানিক (৪০)।

এ ছাড়া উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে এক শিশু, মহেশখালী উপজেলায় এক শিশু এবং উখিয়া, টেকনাফ ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকজন রোহিঙ্গা শরণার্থী পাহাড়ধস ও বন্যার পানিতে প্রাণ হারিয়েছেন। জেলা প্রশাসন ও শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয় জানিয়েছে, এসব ঘটনায় মোট প্রাণহানির সংখ্যা অন্তত ২৩ জনে পৌঁছেছে।

বর্তমানে চকরিয়া ও পেকুয়ার মাতামুহুরী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। চকরিয়া, পেকুয়া, রামু, টেকনাফ ও উখিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন ডুবে যাওয়ায় ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। জেলা প্রশাসন, এপিবিএন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের জোরপূর্বক নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিচ্ছে।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে বান্দরবানের লামা উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়া (পাগলির ঝিরি) এলাকায়। বৃহস্পতিবার ভোরে পৃথক দুই পাহাড়ধসে দুটি পরিবার মাটির নিচে চাপা পড়ে।

নিহতরা হলেন মো. ইউনুস (৪০), তার স্ত্রী রানু আক্তার (৩৫), তাদের পাঁচ বছরের ছেলে মো. সোলেমান, অপর পরিবারের মো. জুয়েল (৩৪) এবং কুলছুমা আক্তার (২৫)।

সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কের লাল ব্রিজ এলাকায় পাহাড়ধসে যান চলাচল ব্যাহত হয়। রুমা ও রোয়াংছড়ির বেইলি ব্রিজ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দুর্যোগ পরিস্থিতির কারণে জেলা প্রশাসন ১২ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটন কেন্দ্র, ঝরনা, পাহাড়ি ট্রেইল ও নদীপথে পর্যটকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

রাঙামাটিতে এখন পর্যন্ত পাহাড়ধসে লক্ষ্মী বিলাস চাকমা (৭০) নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। তিনি বাঘাইছড়ি পৌরসভার পশ্চিম লাইল্যাঘোনা এলাকার বাসিন্দা। এ ছাড়া পাহাড়ি ঢলে নদী পার হওয়ার সময় একজন নিখোঁজ হয়েছেন এবং বিলাইছড়িতে এক ব্যবসায়ী নিখোঁজ রয়েছেন। কাপ্তাইয়ে পাহাড়ধসে দুই শিশু আহত হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৯৮টি স্থানে ছোট-বড় পাহাড়ধস হয়েছে। বিলাইছড়িতে ৩৭টি, কাউখালীতে ৩০টি, কাপ্তাইয়ে ১৫টি এবং রাঙামাটি সদরে ১১টি স্থানে পাহাড়ধস হয়েছে।

কাচালং নদীর পানি উপচে বাঘাইছড়ির অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। জেলায় চার হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন। সাজেক ভ্যালিতে পর্যটক প্রবেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ২০৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৪টিতে দুর্গত মানুষ অবস্থান করছেন।

খাগড়াছড়ি শহরের শালবন, সবুজবাগ, কুমিল্লা টিলা ও আশপাশের এলাকায় পাহাড়ধস হয়েছে। চেঙ্গী ও মাইনি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় দীঘিনালা, মহালছড়ি ও সদর উপজেলার অন্তত ৪০টি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। প্রায় আট হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।

রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি, মহালছড়ি এবং সাজেকের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। জেলার সব প্রাথমিক বিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, প্রায় সাড়ে তিন হাজার পরিবার পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে ইতোমধ্যে তিন হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পাহাড়ধস ও পানির স্রোতে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরের আশরাফুল ইসলাম তানভীর (১০ মাস), পাঁচলাইশের চশমা হিল এলাকার সুমাইয়া (সামিয়া) আক্তার (১২)। পাঁচলাইশের রহমাননগরের শফিকুল রহমান (৩০), তার গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে।

রাউজানের ডাবুয়া ইউনিয়নের মোস্তাকিম (৩), বন্যার পানিতে তলিয়ে মারা যায়। এ ছাড়া বোয়ালখালীর ভাণ্ডালজুড়ি খালের স্রোতে ভেসে যাওয়া এক তরুণের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁর পরিচয় নিশ্চিতের কাজ করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

রেকর্ড বৃষ্টিতে নগরের মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট, চকবাজার, খাতুনগঞ্জ, আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন এলাকা হাঁটু থেকে কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে। ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান ও আনোয়ারার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

রেললাইনের ওপর পানি ওঠা ও গাছ উপড়ে পড়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। প্রায় এক হাজার যাত্রী নিয়ে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনটি ষোলশহর স্টেশনে আটকে পড়ে। তাছাড়া বৈরী আবহাওয়ায় শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কয়েকটি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট অবতরণ করে বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষ।

তবে চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্যে এখন পর্যন্ত বিভাগে ২৪ জনের প্রাণহানির সংখ্যা নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় ৫ জন, কক্সবাজারে ১৮ জন (রোহিঙ্গা ১৩ জনসহ) এবং রাঙামাটি জেলায় একজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে। এছাড়া এ দুযোর্গে আহত হয়েছেন ২১ জন।

বিভাগীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগে মোট ৩৩৯৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৬ হাজার ২৯৯ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

এদিকে দুর্গত মানুষের সহায়তায় বিভাগজুড়ে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলছে। এ পর্যন্ত ২৪৮২টি প্যাকেট শুকনা ও অন্যান্য খাবার, ১৫০ প্যাকেট শিশু খাদ্য, ১৪৮ মেট্রিক টন চাল এবং ৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা নগদ বিতরণ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসন জানিয়েছে, বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে বিভিন্ন জেলার নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে নামলেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিংসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম জেলার অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলা। সেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও বোয়ালখালীর বিস্তীর্ণ এলাকাও পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকায় বিশুদ্ধ পানি, খাবার সংকট দেখা দিয়েছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সব উপজেলা প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিতে কাজ চলছে।

এদিকে সাতকানিয়ায় মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে আবারও ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। উপজেলার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। অসংখ্য বসতঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাতকানিয়া আদালত, অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের কার্যালয়, পৌরসভা কার্যালয় ও থানায়ও বন্যার পানি প্রবেশ করেছে।

বাঁশখালীতেও ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে৷ বন্যার পানিতে পাঁচ শতাধিক মাটির ঘর ভেঙে গেছে। বুধবার (৮ জুলাই) রাত ১১টার দিকে বৈলছড়ি এলাকায় চট্টগ্রাম-বাঁশখালী প্রধান সড়ক পানিতে তলিয়ে গেলে চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে বাঁশখালীর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে দুর্ভোগে পড়েন হাজারো মানুষ। দুর্গত এলাকাগুলোতে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

পাঁচ নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর, চট্টগ্রামে ৩৫ প্রাণহানি

আপডেট সময় : ০১:১৮:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

টানা কয়েক দিনের রেকর্ড পরিমাণ ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম বিভাগজুড়ে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা, পাহাড়ি ঢল, দেয়ালধস এবং পানির তীব্র স্রোতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটি মিলিয়ে এ পর্যন্ত অন্তত ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

অতিবৃষ্টির কারণে সাঙ্গু, মাতামুহুরী, কাচালং, চেঙ্গী ও মাইনি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে চার জেলার শত শত গ্রাম প্লাবিত হয়েছে এবং কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।

এদিকে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ৫টি নদীর ৯টি স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর মধ্যে সাঙ্গু নদীর বান্দরবান ও দোহাজারী পয়েন্টে পানি যথাক্রমে ৯৫ ও ২৩ সেন্টিমিটার, মাতামুহুরী নদীর লামা ও চিরিঙ্গা পয়েন্টে ৪৭ ও ৩২ সেন্টিমিটার, কুশিয়ারা নদীর মারকুলি ও ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে ১৮ ও ১০ সেন্টিমিটার, মনু নদীর মনু রেলওয়ে ব্রিজ ও মৌলভীবাজার পয়েন্টে ৩৫ ও ৮০ সেন্টিমিটার এবং খোয়াই নদীর বল্লা পয়েন্টে ৬০ সেন্টিমিটার বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে।

এ ছাড়া ৫টি নদীর আরও ৯টি স্টেশন সতর্ক সীমায় রয়েছে। এগুলো হলো– তিস্তা নদীর ডালিয়া (নীলফামারী), কাউনিয়া (লালমনিরহাট) ও তারাপুর (গাইবান্ধা); কুশিয়ারা নদীর শেরপুর (মৌলভীবাজার); সুরমা নদীর কানাইঘাট (সিলেট), ছাতক ও সুনামগঞ্জ; সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দা (নেত্রকোণা) এবং ছোট ফেনী নদীর কোম্পানীগঞ্জ (নোয়াখালী) পয়েন্ট।

পর্যবেক্ষণাধীন ১২৭টি স্টেশনের মধ্যে ৭৯টিতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে, ৪৩টিতে কমেছে এবং ৫টিতে অপরিবর্তিত রয়েছে। নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার অনুরোধ জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

আবহাওয়ার সর্বশেষ পরিস্থিতিতে বলা হয়েছে, সমুদ্রবন্দরসমূহ, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ (তিন) নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া ভারী বৃষ্টিপাতের সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী (৪৪-৮৮ মিলিমিটার/২৪ ঘণ্টা) থেকে অতি ভারী (৮৮ মিলিমিটার/২৪ ঘণ্টা) বর্ষণ হতে পারে। এর ফলে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীর কোথাও কোথাও সাময়িক জলাবদ্ধতা এবং চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় কোথাও কোথাও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে।

পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা, পাহাড়ি ঢল, দেয়ালধস এবং পানির তীব্র স্রোতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজার জেলায়, যেখানে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় বাসিন্দা মিলিয়ে অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরপর বান্দরবানে পাঁচজন, চট্টগ্রামে ছয়জন এবং রাঙামাটিতে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

খাগড়াছড়িতে এখন পর্যন্ত প্রাণহানির খবর না মিললেও জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে।

কক্সবাজারে গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে পাহাড়ধস, দেয়ালধস ও ঢলের পানিতে স্থানীয় বাসিন্দা এবং রোহিঙ্গা মিলিয়ে অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প, চকরিয়া, কক্সবাজার পৌরসভা, রামু, টেকনাফ, পেকুয়া ও মহেশখালী।

চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের মহছনিয়াকাটার ডেবলতলী এলাকায় বুধবার (৮ জুলাই) দিবাগত রাত ১টার দিকে পাহাড়ধসে বসতঘর চাপা পড়ে একই পরিবারের দুই শিশু রুমি আক্তার (১৫) ও ওয়াহিদুল ইসলাম (১০) মারা যায়। রুমি বরইতলী দাখিল মাদ্রাসার দশম শ্রেণির ছাত্রী এবং ওয়াহিদুল চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। তাদের পিতা যথাক্রমে আবদুল মজিদ ও মোহাম্মদ কাজল।

উখিয়ার ৫ নম্বর ক্যাম্পে খাদিজাতুল কুবরা মহিলা হেফজখানায় পাহাড়ধস ও দেয়াল ধসে মৃত্যু হয় রাশিদা বেগম (১৩), উম্মে নেজাতুল (১৩), উম্মে সালমা (১২), উমাইসা বিবি (১৩) এবং শিক্ষিকা শাহিদার।

ক্যাম্প ১১ এর বালুখালী ব্লক সি/১১-তে পাহাড়ধসে একই পরিবারের চার সহোদর উম্মে হাবিবা (২৭), তানজিনা আক্তার (১৩), মোহাম্মদ রিহান (৫) এবং হারুনুর রশিদের (৩) প্রাণহানি ঘটে।

উখিয়ার জামতলী ক্যাম্প-১৫-এ পাহাড়ধসে ঘুমন্ত অবস্থায় মারা যান মোহাম্মদ কামাল (কালাম) হোসেন (৪৪), তাঁর স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং তাঁদের চার বছরের ছেলে মোহাম্মদ আরফাত।

কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে মারা যান আলী আকবর (৫০)।

উখিয়ার হলদিয়াপালং ইউনিয়নে মাটির দেয়াল ধসে নিহত হন মোহাম্মদ মানিক (৪০)।

এ ছাড়া উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে এক শিশু, মহেশখালী উপজেলায় এক শিশু এবং উখিয়া, টেকনাফ ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থানে আরও কয়েকজন রোহিঙ্গা শরণার্থী পাহাড়ধস ও বন্যার পানিতে প্রাণ হারিয়েছেন। জেলা প্রশাসন ও শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয় জানিয়েছে, এসব ঘটনায় মোট প্রাণহানির সংখ্যা অন্তত ২৩ জনে পৌঁছেছে।

বর্তমানে চকরিয়া ও পেকুয়ার মাতামুহুরী নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। চকরিয়া, পেকুয়া, রামু, টেকনাফ ও উখিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন ডুবে যাওয়ায় ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। জেলা প্রশাসন, এপিবিএন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের জোরপূর্বক নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিচ্ছে।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে বান্দরবানের লামা উপজেলার আজিজনগর ইউনিয়নের মিশনপাড়া (পাগলির ঝিরি) এলাকায়। বৃহস্পতিবার ভোরে পৃথক দুই পাহাড়ধসে দুটি পরিবার মাটির নিচে চাপা পড়ে।

নিহতরা হলেন মো. ইউনুস (৪০), তার স্ত্রী রানু আক্তার (৩৫), তাদের পাঁচ বছরের ছেলে মো. সোলেমান, অপর পরিবারের মো. জুয়েল (৩৪) এবং কুলছুমা আক্তার (২৫)।

সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বান্দরবান-কেরানীহাট সড়কের লাল ব্রিজ এলাকায় পাহাড়ধসে যান চলাচল ব্যাহত হয়। রুমা ও রোয়াংছড়ির বেইলি ব্রিজ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্কও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

দুর্যোগ পরিস্থিতির কারণে জেলা প্রশাসন ১২ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটন কেন্দ্র, ঝরনা, পাহাড়ি ট্রেইল ও নদীপথে পর্যটকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

রাঙামাটিতে এখন পর্যন্ত পাহাড়ধসে লক্ষ্মী বিলাস চাকমা (৭০) নামে এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে। তিনি বাঘাইছড়ি পৌরসভার পশ্চিম লাইল্যাঘোনা এলাকার বাসিন্দা। এ ছাড়া পাহাড়ি ঢলে নদী পার হওয়ার সময় একজন নিখোঁজ হয়েছেন এবং বিলাইছড়িতে এক ব্যবসায়ী নিখোঁজ রয়েছেন। কাপ্তাইয়ে পাহাড়ধসে দুই শিশু আহত হয়েছে।

জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৯৮টি স্থানে ছোট-বড় পাহাড়ধস হয়েছে। বিলাইছড়িতে ৩৭টি, কাউখালীতে ৩০টি, কাপ্তাইয়ে ১৫টি এবং রাঙামাটি সদরে ১১টি স্থানে পাহাড়ধস হয়েছে।

কাচালং নদীর পানি উপচে বাঘাইছড়ির অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। জেলায় চার হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন। সাজেক ভ্যালিতে পর্যটক প্রবেশ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ২০৪টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যার মধ্যে ৪৪টিতে দুর্গত মানুষ অবস্থান করছেন।

খাগড়াছড়ি শহরের শালবন, সবুজবাগ, কুমিল্লা টিলা ও আশপাশের এলাকায় পাহাড়ধস হয়েছে। চেঙ্গী ও মাইনি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় দীঘিনালা, মহালছড়ি ও সদর উপজেলার অন্তত ৪০টি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। প্রায় আট হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।

রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি, মহালছড়ি এবং সাজেকের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। জেলার সব প্রাথমিক বিদ্যালয় সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, প্রায় সাড়ে তিন হাজার পরিবার পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে। ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে ইতোমধ্যে তিন হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে পাহাড়ধস ও পানির স্রোতে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরের আশরাফুল ইসলাম তানভীর (১০ মাস), পাঁচলাইশের চশমা হিল এলাকার সুমাইয়া (সামিয়া) আক্তার (১২)। পাঁচলাইশের রহমাননগরের শফিকুল রহমান (৩০), তার গ্রামের বাড়ি গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে।

রাউজানের ডাবুয়া ইউনিয়নের মোস্তাকিম (৩), বন্যার পানিতে তলিয়ে মারা যায়। এ ছাড়া বোয়ালখালীর ভাণ্ডালজুড়ি খালের স্রোতে ভেসে যাওয়া এক তরুণের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁর পরিচয় নিশ্চিতের কাজ করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

রেকর্ড বৃষ্টিতে নগরের মুরাদপুর, দুই নম্বর গেট, চকবাজার, খাতুনগঞ্জ, আগ্রাবাদ, বহদ্দারহাটসহ বিভিন্ন এলাকা হাঁটু থেকে কোমর পানিতে তলিয়ে গেছে। ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান ও আনোয়ারার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

রেললাইনের ওপর পানি ওঠা ও গাছ উপড়ে পড়ায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। প্রায় এক হাজার যাত্রী নিয়ে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনটি ষোলশহর স্টেশনে আটকে পড়ে। তাছাড়া বৈরী আবহাওয়ায় শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কয়েকটি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট অবতরণ করে বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষ।

তবে চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্যে এখন পর্যন্ত বিভাগে ২৪ জনের প্রাণহানির সংখ্যা নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় ৫ জন, কক্সবাজারে ১৮ জন (রোহিঙ্গা ১৩ জনসহ) এবং রাঙামাটি জেলায় একজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে। এছাড়া এ দুযোর্গে আহত হয়েছেন ২১ জন।

বিভাগীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বিভাগে মোট ৩৩৯৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ৬ হাজার ২৯৯ জন আশ্রয় নিয়েছেন।

এদিকে দুর্গত মানুষের সহায়তায় বিভাগজুড়ে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলছে। এ পর্যন্ত ২৪৮২টি প্যাকেট শুকনা ও অন্যান্য খাবার, ১৫০ প্যাকেট শিশু খাদ্য, ১৪৮ মেট্রিক টন চাল এবং ৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা নগদ বিতরণ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রশাসন জানিয়েছে, বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে বিভিন্ন জেলার নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে নামলেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিংসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম জেলার অন্তত সাড়ে চার লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাতকানিয়া উপজেলা। সেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বাঁশখালী ও বোয়ালখালীর বিস্তীর্ণ এলাকাও পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকায় বিশুদ্ধ পানি, খাবার সংকট দেখা দিয়েছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সব উপজেলা প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকায় প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিতে কাজ চলছে।

এদিকে সাতকানিয়ায় মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে আবারও ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। উপজেলার প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে সাড়ে তিন লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন। অসংখ্য বসতঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সাতকানিয়া আদালত, অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের কার্যালয়, পৌরসভা কার্যালয় ও থানায়ও বন্যার পানি প্রবেশ করেছে।

বাঁশখালীতেও ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে৷ বন্যার পানিতে পাঁচ শতাধিক মাটির ঘর ভেঙে গেছে। বুধবার (৮ জুলাই) রাত ১১টার দিকে বৈলছড়ি এলাকায় চট্টগ্রাম-বাঁশখালী প্রধান সড়ক পানিতে তলিয়ে গেলে চট্টগ্রাম শহরের সঙ্গে বাঁশখালীর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে দুর্ভোগে পড়েন হাজারো মানুষ। দুর্গত এলাকাগুলোতে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।