ঢাকা ০৬:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ২২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভাঙনের মুখে জুলাই অভ্যুত্থানে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ঐক্য?

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০২:৩২:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ নভেম্বর ২০২৫
  • / 41

জুলাই অভ্যুত্থানে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ঐক্য এখন ভাঙনের মুখে। গণভোট, জুলাই সনদসহ বিভিন্ন ইস্যুতে রাজনীতিবিদদের পরস্পরবিরোধী অবস্থানে হতাশ উপদেষ্টারা। তবে ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য টিকে থাকবে কি না, নভেম্বরের পরই তা স্পষ্ট হবে বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। জাতীয় স্বার্থে ছাড় দেয়ার পরামর্শ দিয়ে সময়ের প্রয়োজনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য ফিরবে বলেও মনে করেন তারা।

জুলাই অভ্যুত্থানে জনতার ঐক্য কাঁপিয়ে দেয় স্বৈরাচারের মসনদ। গোষ্ঠী স্বার্থ ভুলে রাজনৈতিক দলগুলোও দাঁড়ায় এক কাতারে। তবে গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন দেশ গড়তে রাজনীতিবিদরা ঐক্যবদ্ধ থাকার অঙ্গীকার করলেও ক্রমেই দূরত্ব বাড়ছে। জুলাই সনদ ও গণভোটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ঐক্য ধরে রাখতে পারছে না দলগুলো।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘নির্বাচনের দিন গণভোটে আমরা একমত হয়েছি জাতির স্বার্থে। এর বাইরে আমরা কোনোদিনই একমত হবো না।’

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের পূর্বেই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে, এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চয়তা চাই এবং এটা আমাদের স্পষ্ট দাবি।

এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘ইতিহাসে যদি লেখা থাকে গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম কোন দল বাংলাদেশে অনৈক্যের জন্ম দিয়েছে, সেটা হলো বিএনপি।’

এরকম পরিস্থিতিতে ফের অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অঙ্গন, যা নিয়ে হতাশ অন্তবর্তী সরকারের কিছু উপদেষ্টারাও। এমনকি সরকার যে এসব ষিয় নিয়ে কিছুটা সন্দিহান তা আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল স্বীকারও করে নিয়েছেন।

বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিলেন পিচ কিউরেটর গামিনি

আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘বুঝতে পারছি না যে এতদিন আলোচনার পরেও যদি আপনাদের ঐকমত্য না আসে, তো এখন আমরা কীভাবে কী করবো, সেটা নিয়ে আমাদের একটু চিন্তা করতে হচ্ছে।’

সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি স্পষ্ট না হওয়ায় এনসিপিসহ ৫টি রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করেনি। আর ২৫টি রাজনৈতিক দল সই করলেও গণভোট নিয়ে রয়েছে মতপার্থক্য। জামায়াত নভেম্বরে, আর বিএনপি জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট চায়।

এছাড়াও যেসব বিষয়ে বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে, সেগুলো জাতীয় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রস্তাবে উল্লেখ না থাকায় অসন্তুষ্ট দলটির।

ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গণভোটের পক্ষে–বিপক্ষে চলছে প্রচার। আগে গণভোটের বিপক্ষে থাকা বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ফেসবুক পোস্টে লিখছেন ‘না’। অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয়রা গণভোটের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ লিখে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

এমন রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে বিশ্লেষকরা বলছেন, নভেম্বরের পরই স্পষ্ট হবে দলগুলোর ঐক্য থাকবে কি না। তবে সাময়িক টানাপড়েনের প্রভাব নির্বাচনে পড়বে না বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ। তার মতে, কোনো দলের জন্যই নির্বাচনে অংশ না নেয়ার মতো সিদ্ধান্ত এখনই নেয়া ঠিক হবে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘নির্বাচন পিছিয়ে দিতে পারে এরকম জায়গায় যাবে না পরিস্থিতি। কিছুটা টানাপোড়েন থাকবেই, সবাই কম্পিটিশনে নিজের অস্তিত্বটাকে জানান দিতে চাচ্ছে। এ অভিযোগটা সমাধানের সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি, এটা এখনও আছে। সুতরাং আমি বিশ্বাস করি, বিএনপিও এটা বুঝেশুনেই কথা বলছে এবং সরকারও হয়তো জিনিসটা বুঝতে পেরেছে। নির্বাচনের দিন গণভোট হলে জামায়াত নির্বাচন বয়কট করবে, এটা অন্তত আমি মনে করি না।’

বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, জাতীয় স্বার্থে ছাড়ের মানসিকতা দেখাতে হবে রাজনীতিকদের। এই সময়ে স্থিতিশীল রাজনীতি ও গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার স্বার্থে দলগুলোর ঐক্য ধরে রাখা জরুরি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এটা বড় একটা অনৈক্যআমার কাছে মনে হয় না। কারণ রাজনৈতিক দল তাদের আদর্শ এবং জনগণের কাছে পৌঁছাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করে। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে এবং অবশ্যই তাদের ছাড় দিতে হবে।’

রাজনীতির মাঠে কৌশল অবলম্বন করেই কিছুটা বিরোধী অবস্থান নিচ্ছেন বিভিন্ন দলের নেতারা। তবে সময়ের প্রয়োজনে দলগুলো ফের ঐক্যে ফিরবে বলে আশা করেন বিশ্লেষকরা।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

ভাঙনের মুখে জুলাই অভ্যুত্থানে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ঐক্য?

আপডেট সময় : ০২:৩২:৫৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ১ নভেম্বর ২০২৫

জুলাই অভ্যুত্থানে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ঐক্য এখন ভাঙনের মুখে। গণভোট, জুলাই সনদসহ বিভিন্ন ইস্যুতে রাজনীতিবিদদের পরস্পরবিরোধী অবস্থানে হতাশ উপদেষ্টারা। তবে ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্য টিকে থাকবে কি না, নভেম্বরের পরই তা স্পষ্ট হবে বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। জাতীয় স্বার্থে ছাড় দেয়ার পরামর্শ দিয়ে সময়ের প্রয়োজনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য ফিরবে বলেও মনে করেন তারা।

জুলাই অভ্যুত্থানে জনতার ঐক্য কাঁপিয়ে দেয় স্বৈরাচারের মসনদ। গোষ্ঠী স্বার্থ ভুলে রাজনৈতিক দলগুলোও দাঁড়ায় এক কাতারে। তবে গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন দেশ গড়তে রাজনীতিবিদরা ঐক্যবদ্ধ থাকার অঙ্গীকার করলেও ক্রমেই দূরত্ব বাড়ছে। জুলাই সনদ ও গণভোটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে ঐক্য ধরে রাখতে পারছে না দলগুলো।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, ‘নির্বাচনের দিন গণভোটে আমরা একমত হয়েছি জাতির স্বার্থে। এর বাইরে আমরা কোনোদিনই একমত হবো না।’

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের পূর্বেই গণভোট অনুষ্ঠিত হবে, এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চয়তা চাই এবং এটা আমাদের স্পষ্ট দাবি।

এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ‘ইতিহাসে যদি লেখা থাকে গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম কোন দল বাংলাদেশে অনৈক্যের জন্ম দিয়েছে, সেটা হলো বিএনপি।’

এরকম পরিস্থিতিতে ফের অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে রাজনৈতিক অঙ্গন, যা নিয়ে হতাশ অন্তবর্তী সরকারের কিছু উপদেষ্টারাও। এমনকি সরকার যে এসব ষিয় নিয়ে কিছুটা সন্দিহান তা আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল স্বীকারও করে নিয়েছেন।

বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিলেন পিচ কিউরেটর গামিনি

আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘বুঝতে পারছি না যে এতদিন আলোচনার পরেও যদি আপনাদের ঐকমত্য না আসে, তো এখন আমরা কীভাবে কী করবো, সেটা নিয়ে আমাদের একটু চিন্তা করতে হচ্ছে।’

সনদের বাস্তবায়ন পদ্ধতি স্পষ্ট না হওয়ায় এনসিপিসহ ৫টি রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করেনি। আর ২৫টি রাজনৈতিক দল সই করলেও গণভোট নিয়ে রয়েছে মতপার্থক্য। জামায়াত নভেম্বরে, আর বিএনপি জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট চায়।

এছাড়াও যেসব বিষয়ে বিএনপি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে, সেগুলো জাতীয় জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রস্তাবে উল্লেখ না থাকায় অসন্তুষ্ট দলটির।

ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গণভোটের পক্ষে–বিপক্ষে চলছে প্রচার। আগে গণভোটের বিপক্ষে থাকা বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ফেসবুক পোস্টে লিখছেন ‘না’। অন্যদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয়রা গণভোটের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ লিখে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

এমন রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে বিশ্লেষকরা বলছেন, নভেম্বরের পরই স্পষ্ট হবে দলগুলোর ঐক্য থাকবে কি না। তবে সাময়িক টানাপড়েনের প্রভাব নির্বাচনে পড়বে না বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ। তার মতে, কোনো দলের জন্যই নির্বাচনে অংশ না নেয়ার মতো সিদ্ধান্ত এখনই নেয়া ঠিক হবে না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘নির্বাচন পিছিয়ে দিতে পারে এরকম জায়গায় যাবে না পরিস্থিতি। কিছুটা টানাপোড়েন থাকবেই, সবাই কম্পিটিশনে নিজের অস্তিত্বটাকে জানান দিতে চাচ্ছে। এ অভিযোগটা সমাধানের সুযোগ শেষ হয়ে যায়নি, এটা এখনও আছে। সুতরাং আমি বিশ্বাস করি, বিএনপিও এটা বুঝেশুনেই কথা বলছে এবং সরকারও হয়তো জিনিসটা বুঝতে পেরেছে। নির্বাচনের দিন গণভোট হলে জামায়াত নির্বাচন বয়কট করবে, এটা অন্তত আমি মনে করি না।’

বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, জাতীয় স্বার্থে ছাড়ের মানসিকতা দেখাতে হবে রাজনীতিকদের। এই সময়ে স্থিতিশীল রাজনীতি ও গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার স্বার্থে দলগুলোর ঐক্য ধরে রাখা জরুরি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এটা বড় একটা অনৈক্যআমার কাছে মনে হয় না। কারণ রাজনৈতিক দল তাদের আদর্শ এবং জনগণের কাছে পৌঁছাতে বিভিন্ন রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করে। বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে এবং অবশ্যই তাদের ছাড় দিতে হবে।’

রাজনীতির মাঠে কৌশল অবলম্বন করেই কিছুটা বিরোধী অবস্থান নিচ্ছেন বিভিন্ন দলের নেতারা। তবে সময়ের প্রয়োজনে দলগুলো ফের ঐক্যে ফিরবে বলে আশা করেন বিশ্লেষকরা।