ঢাকা ০৪:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবের মুখে বাংলাদেশ

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৩:০৮:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 8

একসময় হাম নির্মূলের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া বাংলাদেশ এখন ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি। মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামজনিত কারণে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মিলিয়ে ৯৯৯ জনের মৃত্যুর তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে দেশের হাসপাতালগুলোতেও বাড়ছে চাপ। প্রতিদিনই অসুস্থ শিশুদের ভিড় বাড়ায় চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, আক্রান্ত রোগীর চাপ, হাসপাতালের অতিরিক্ত ভিড় এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বড় ধরনের চাপে পড়েছে। এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও প্রাদুর্ভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এপ্রিল মাসে দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়া সত্ত্বেও এই দীর্ঘস্থায়ী প্রাদুর্ভাবের পেছনে রয়েছে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাত ঘটার বিষয়টি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশটি যখন রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখনই এই বিঘ্ন ঘটেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’ (সিডিসি)-এর ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে টিকা না পাওয়া এবং টিকা সরবরাহে সমস্যার ফলে শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়েছে। বিশেষ করে নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা—যাদের নিয়মিত টিকা দেওয়ার বয়স এখনো হয়নি—তারা অরক্ষিত থাকায় বিভিন্ন বয়সের মানুষের মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে পড়া ত্বরান্বিত হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে বাংলাদেশে ১ লাখ ৬৬ হাজারেরও বেশি সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৯ হাজার ৮৩৫ জনের সংক্রমণ ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত করা হয়েছে। এই প্রাদুর্ভাবের কারণে ৯৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছে (যার মধ্যে ১০০ জনের মৃত্যু হামজনিত বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে) এবং ১ লাখ ৪৬ হাজারেরও বেশি সন্দেহভাজন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা এই প্রাদুর্ভাবের জন্য দুর্বল কর্মসূচি তদারকি, অপর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ এবং শেখ হাসিনার স্থলাভিষিক্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে টিকা সংগ্রহ নীতিতে পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন। এসব কারণে টিকার প্রাপ্যতা ব্যাহত হয়েছে এবং অত্যন্ত সংক্রামক এই রোগের বিরুদ্ধে অনেক শিশু অরক্ষিত থেকে গেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সোমবার সংসদে জানিয়েছেন যে, টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের ফলে টিকার ঘাটতি দেখা দেয়; পাশাপাশি ২০২৪ সালে একটি টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে দেওয়া এবং পরের বছর দেশব্যাপী হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন বাতিল করার ফলে আরও বেশি সংখ্যক শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থাও টিকাদানের সময়সূচি ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছে। রোগটি ছড়িয়ে পড়ার শুরুর দিকে আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

হাম নির্মূলের পথে দীর্ঘদিনের অগ্রগতির পরই এই প্রাদুর্ভাব দেখা দিল। গত এক দশকের বেশিরভাগ সময় বাংলাদেশ হামের টিকাদানে উচ্চ হার বজায় রেখেছিল; কোভিড-১৯ মহামারির সময় কিছুটা ঘাটতি ছাড়া বাকি সময়জুড়ে এই হার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত ৯৫ শতাংশ বা তার বেশি ছিল।

এপিডেমিওলজিস্ট এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকাদানে ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ হাম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি বলেন, আমার জানামতে, বাংলাদেশ আগে কখনও হামে এত শিশুর মৃত্যু দেখেনি। এমনকি এক বছরে এত বিপুল সংখ্যক রোগীও আমরা আগে কখনও দেখিনি। এটি সত্যিই একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি এবং সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এর শিকার হচ্ছে শিশুরা।

রহমান বলেন, এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি পূরণ, টিকাদানের হার বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

হামের রোগীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে; একই সময়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় আগে থেকেই চাপের মুখে থাকা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর আরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৪৫ হাজারেরও বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মঙ্গলবার ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে নয়জনে দাঁড়িয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা বেড়ে ১,৫৭১-এ পৌঁছেছে—উভয়ই এ বছরের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যা।

ঢাকার সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা বলেন, অবিরত রোগী আসছে এবং সবার জন্য জায়গার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও জানান যে, হাসপাতালে বর্তমানে হামের রোগীদের জন্য ৬০টি শয্যা থাকলেও অনেক রোগীকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ডা. সাহা উল্লেখ করেন, শিশুদের জন্য উপযোগী স্যালাইনের (যা হামের উপসর্গ উপশমে সহায়তা করে) ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

তিনি জানান, ১,৩৫০ জন রোগীর ধারণক্ষমতা সম্পন্ন এই হাসপাতালে বর্তমানে ২,৩৫০ জনেরও বেশি রোগীর চিকিৎসা চলছে।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য এই প্রাদুর্ভাব মানেই হলো সপ্তাহের পর সপ্তাহ অনিশ্চয়তা, বারবার হাসপাতালে ছোটাছুটি এবং ক্রমবর্ধমান চিকিৎসা ব্যয়।

৩৫ বছর বয়সী গৃহকর্মী নাসিমা বেগম জানান, প্রায় দুই মাস আগে তাঁর ১৩ মাস বয়সী ছেলের হাম হয়েছিল। চারটি হাসপাতালে চেষ্টা করেও শয্যা না পাওয়ার পর অবশেষে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা সম্ভব হয় এবং ১০ দিন পর সে ছাড়া পায়; কিন্তু তার বারবার জ্বর আসছে এবং সে এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি।

নাসিমা বেগম বলেন, অসুস্থতার কারণে তাঁর ছেলে নির্ধারিত সময়ে টিকা নিতে পারেনি। পরে টিকা কেন্দ্রে গেলে তাদের জানানো হয় যে টিকাটি তখন আর পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর ছোট ছেলের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটলেও, তাঁর অন্য চার সন্তান নিয়মিত টিকা পেয়েছিল।

কারখানা শ্রমিক মোহাম্মদ রিপন জানান, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার কয়েক দিন পরই তাঁর আট মাস বয়সী মেয়ের শরীরে র‍্যাশ (ত্বকে লালচে দাগ) ও হামের মতো অন্যান্য উপসর্গ দেখা দেয়। এর ফলে পরিবারটিকে একাধিক চিকিৎসা কেন্দ্রে ছুটতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত হামের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত একটি হাসপাতালে যেতে হয়।

রিপন বলেন, আমরা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছি। কিন্তু কোথাও সঠিক তথ্য পাচ্ছি না।

বাংলাদেশে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এরপর থেকে ১ কোটি ৯৭ লাখেরও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে; তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করা এবং বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনার বিশেষ কর্মসূচি (ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন) অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

হাম এবং মশা-বাহিত ডেঙ্গু—উষ্ণ তাপমাত্রা ও নগরায়ণের সাথে সম্পর্কিত এই দুর্বলকারী রোগ—একই সাথে দেখা দেওয়া স্বাস্থ্যসংকট বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামনে এক বড় চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছে। এই চ্যালেঞ্জটি হলো প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগের মোকাবিলা করার পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমও সচল রাখা।

হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ এবং এতে সাধারণত জ্বর ও শরীরে বিশেষ ধরনের ফুসকুড়ি দেখা দেয়; তবে দুই ডোজ টিকা গ্রহণের মাধ্যমেই এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবের মুখে বাংলাদেশ

আপডেট সময় : ০৩:০৮:৫৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একসময় হাম নির্মূলের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া বাংলাদেশ এখন ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি। মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামজনিত কারণে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মিলিয়ে ৯৯৯ জনের মৃত্যুর তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে দেশের হাসপাতালগুলোতেও বাড়ছে চাপ। প্রতিদিনই অসুস্থ শিশুদের ভিড় বাড়ায় চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, আক্রান্ত রোগীর চাপ, হাসপাতালের অতিরিক্ত ভিড় এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা বড় ধরনের চাপে পড়েছে। এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও প্রাদুর্ভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এপ্রিল মাসে দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হওয়া সত্ত্বেও এই দীর্ঘস্থায়ী প্রাদুর্ভাবের পেছনে রয়েছে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ব্যাঘাত ঘটার বিষয়টি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশটি যখন রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখনই এই বিঘ্ন ঘটেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন’ (সিডিসি)-এর ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে টিকা না পাওয়া এবং টিকা সরবরাহে সমস্যার ফলে শিশুরা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়েছে। বিশেষ করে নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা—যাদের নিয়মিত টিকা দেওয়ার বয়স এখনো হয়নি—তারা অরক্ষিত থাকায় বিভিন্ন বয়সের মানুষের মধ্যে রোগটি ছড়িয়ে পড়া ত্বরান্বিত হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে প্রাদুর্ভাব শুরুর পর থেকে বাংলাদেশে ১ লাখ ৬৬ হাজারেরও বেশি সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৯ হাজার ৮৩৫ জনের সংক্রমণ ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত করা হয়েছে। এই প্রাদুর্ভাবের কারণে ৯৯৯ জনের মৃত্যু হয়েছে (যার মধ্যে ১০০ জনের মৃত্যু হামজনিত বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে) এবং ১ লাখ ৪৬ হাজারেরও বেশি সন্দেহভাজন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা এই প্রাদুর্ভাবের জন্য দুর্বল কর্মসূচি তদারকি, অপর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ এবং শেখ হাসিনার স্থলাভিষিক্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে টিকা সংগ্রহ নীতিতে পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন। এসব কারণে টিকার প্রাপ্যতা ব্যাহত হয়েছে এবং অত্যন্ত সংক্রামক এই রোগের বিরুদ্ধে অনেক শিশু অরক্ষিত থেকে গেছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সোমবার সংসদে জানিয়েছেন যে, টিকা সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের ফলে টিকার ঘাটতি দেখা দেয়; পাশাপাশি ২০২৪ সালে একটি টিকাদান কর্মসূচি পিছিয়ে দেওয়া এবং পরের বছর দেশব্যাপী হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইন বাতিল করার ফলে আরও বেশি সংখ্যক শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), ইউনিসেফ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সংস্থাও টিকাদানের সময়সূচি ব্যাহত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছে। রোগটি ছড়িয়ে পড়ার শুরুর দিকে আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।

হাম নির্মূলের পথে দীর্ঘদিনের অগ্রগতির পরই এই প্রাদুর্ভাব দেখা দিল। গত এক দশকের বেশিরভাগ সময় বাংলাদেশ হামের টিকাদানে উচ্চ হার বজায় রেখেছিল; কোভিড-১৯ মহামারির সময় কিছুটা ঘাটতি ছাড়া বাকি সময়জুড়ে এই হার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত ৯৫ শতাংশ বা তার বেশি ছিল।

এপিডেমিওলজিস্ট এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকাদানে ঘাটতির কারণে বাংলাদেশ হাম নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।

তিনি বলেন, আমার জানামতে, বাংলাদেশ আগে কখনও হামে এত শিশুর মৃত্যু দেখেনি। এমনকি এক বছরে এত বিপুল সংখ্যক রোগীও আমরা আগে কখনও দেখিনি। এটি সত্যিই একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি এবং সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এর শিকার হচ্ছে শিশুরা।

রহমান বলেন, এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হিসেবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি পূরণ, টিকাদানের হার বৃদ্ধি এবং জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

হামের রোগীর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলো হিমশিম খাচ্ছে; একই সময়ে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় আগে থেকেই চাপের মুখে থাকা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর আরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৪৫ হাজারেরও বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মঙ্গলবার ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে নয়জনে দাঁড়িয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা বেড়ে ১,৫৭১-এ পৌঁছেছে—উভয়ই এ বছরের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যা।

ঢাকার সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা বলেন, অবিরত রোগী আসছে এবং সবার জন্য জায়গার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও জানান যে, হাসপাতালে বর্তমানে হামের রোগীদের জন্য ৬০টি শয্যা থাকলেও অনেক রোগীকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ডা. সাহা উল্লেখ করেন, শিশুদের জন্য উপযোগী স্যালাইনের (যা হামের উপসর্গ উপশমে সহায়তা করে) ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

তিনি জানান, ১,৩৫০ জন রোগীর ধারণক্ষমতা সম্পন্ন এই হাসপাতালে বর্তমানে ২,৩৫০ জনেরও বেশি রোগীর চিকিৎসা চলছে।

ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য এই প্রাদুর্ভাব মানেই হলো সপ্তাহের পর সপ্তাহ অনিশ্চয়তা, বারবার হাসপাতালে ছোটাছুটি এবং ক্রমবর্ধমান চিকিৎসা ব্যয়।

৩৫ বছর বয়সী গৃহকর্মী নাসিমা বেগম জানান, প্রায় দুই মাস আগে তাঁর ১৩ মাস বয়সী ছেলের হাম হয়েছিল। চারটি হাসপাতালে চেষ্টা করেও শয্যা না পাওয়ার পর অবশেষে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা সম্ভব হয় এবং ১০ দিন পর সে ছাড়া পায়; কিন্তু তার বারবার জ্বর আসছে এবং সে এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি।

নাসিমা বেগম বলেন, অসুস্থতার কারণে তাঁর ছেলে নির্ধারিত সময়ে টিকা নিতে পারেনি। পরে টিকা কেন্দ্রে গেলে তাদের জানানো হয় যে টিকাটি তখন আর পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর ছোট ছেলের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটলেও, তাঁর অন্য চার সন্তান নিয়মিত টিকা পেয়েছিল।

কারখানা শ্রমিক মোহাম্মদ রিপন জানান, হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার কয়েক দিন পরই তাঁর আট মাস বয়সী মেয়ের শরীরে র‍্যাশ (ত্বকে লালচে দাগ) ও হামের মতো অন্যান্য উপসর্গ দেখা দেয়। এর ফলে পরিবারটিকে একাধিক চিকিৎসা কেন্দ্রে ছুটতে হয় এবং শেষ পর্যন্ত হামের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত একটি হাসপাতালে যেতে হয়।

রিপন বলেন, আমরা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছি। কিন্তু কোথাও সঠিক তথ্য পাচ্ছি না।

বাংলাদেশে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এরপর থেকে ১ কোটি ৯৭ লাখেরও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে; তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করা এবং বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনার বিশেষ কর্মসূচি (ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন) অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।

হাম এবং মশা-বাহিত ডেঙ্গু—উষ্ণ তাপমাত্রা ও নগরায়ণের সাথে সম্পর্কিত এই দুর্বলকারী রোগ—একই সাথে দেখা দেওয়া স্বাস্থ্যসংকট বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামনে এক বড় চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছে। এই চ্যালেঞ্জটি হলো প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক রোগের মোকাবিলা করার পাশাপাশি নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমও সচল রাখা।

হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ এবং এতে সাধারণত জ্বর ও শরীরে বিশেষ ধরনের ফুসকুড়ি দেখা দেয়; তবে দুই ডোজ টিকা গ্রহণের মাধ্যমেই এটি প্রতিরোধ করা সম্ভব।