রেকর্ড খরচের এমআরটি-৬ প্রকল্প, তবুও একের পর এক প্রযুক্তিগত ত্রুটি
- আপডেট সময় : ০৩:৪৩:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 3
মেট্রোরেলের ভায়াডাক্টের ঝুঁকিপূর্ণ বিয়ারিং প্যাড নিয়ে নতুন করে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। রয়েছে পিলারে ফাটল ও ড্রেনেজ লিকেজের সমস্যাও। গতবছর মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর গত সপ্তাহে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট হিসেব তুলে ধরেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী। কিন্তু মাত্র সাড়ে ৩ বছরেই প্রায় রেকর্ড খরচে তৈরি করা এমআরটি-সিক্সে কেন দেখা দিল এ প্রযুক্তিগত ত্রুটি? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঠিকাদার এবং পরামর্শকদের অবহেলার খেসারত দিতে হচ্ছে দেশকে।
গত বছর ২৬ অক্টোবর ফার্মগেট এলাকায় দুপুরে মেট্রোরেলের ভায়াডাক্ট থেকে প্রায় ১০০ কেজি ওজনের একটি বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে প্রাণ হারান আবুল কালাম আজাদ। সেই দুর্ঘটনার পর থেকেই নগরবাসীর মনে স্থায়ী রূপ নিয়েছে নিরাপত্তার প্রশ্ন।
এর ১ বছর পর গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) সংসদে মেট্রোরেলের ৭৩০টি ত্রুটিপূর্ণ বিয়ারিং প্যাডের মধ্যে ২৭টিকে ‘ক্রিটিক্যাল’ হিসেবে চিহ্নিত করার কথা জানান সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী। এছাড়াও রুটের ৪৬টি পিয়ারে বিভিন্ন মাত্রায় ফাটল শনাক্ত করা হয়েছে। তা ছাড়া ড্রেনেজ লাইনে লিকেজ, আর হরহামেশাই নানা কারণে মেট্রোরেল বন্ধ বা বিলম্বে আসার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
আওয়ামী লীগের আমলে প্রায় ২৩ হাজার ৪৯০ কোটি টাকায় এমআরটি লাইন-৬ এর পূর্ণাঙ্গ কাজ শেষ হতে সময় লেগেছিল প্রায় সাড়ে ৭ বছর। যেখানে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় প্রতি কিলোমিটারে নির্মাণ ব্যয় ছিলো দ্বিগুণ। এসব নির্মাণের শতবছরের স্থায়িত্ব থাকার কথা থাকলেও মাত্র সাড়ে ৩ বছরের মাথায় এই দৈন্যদশার কারণ কী?
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘এটা একটা বড় প্রশ্ন, যারা কনসালটেন্ট ছিলো, তারা কেন আসলে বিয়ারিং প্যাড ব্যবহার করেছে—এটা কিন্তু একটা বড় প্রশ্ন।
‘সে জায়গায় আমি বলব যে, আমাদের একটা দুর্বলতা এখানে হয়েছে। যেহেতু একটা কমপ্লিকেটেড প্রজেক্ট, এটা থার্ড পার্টি দিয়ে ভেটিং করার কিন্তু দরকার ছিলো। কিন্তু এই ভেটিংটা কিন্তু এখানে হয়নি। যদি থার্ড পার্টি দিয়ে ভেটিং করা হতো, তার নকশায় যে ত্রুটি আছে, সেটা প্রথমেই ধরা পড়ত।
‘কারণ, একবার কনস্ট্রাকশন হয়ে যাওয়ার পরে, যখন উইকনেস বা দুর্বলতাগুলি দেখা দিচ্ছে, এটা রেকটিফিকেশন করা কিন্তু অনেক কঠিন এবং ব্যয়বহুল। আমরা যে বিয়ারিং প্যাডগুলি সাধারণত নকশা করি এবং কনস্ট্রাকশনে ব্যবহার করি, এটার আয়ুষ্কাল প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর আমরা ধরি।’
ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘যদি আমি বিবেচনায় নেই, অবশ্যই ২০-২৫ বছরের তুলনায় যে টাইম ফ্রেমটা আমি বলছি, তার অনেক আগেই কিন্তু এই বিয়ারিং প্যাডগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেফটি অডিট টিম তারাই বলছে যে, আমাদের যে বিয়ারিং প্যাডগুলি আছে—প্রত্যেকটা খুঁটির উপরে, প্রতি চারটার মধ্যে একটা ক্ষতিগ্রস্ত বা সেখানে কিছুটা ডিসপ্লেসমেন্টের সমস্যা আছে।’
নির্মাণকাজের নিম্নমান নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই সামনে আসছে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের নাম। মেট্রোরেলের প্রধান মূল অবকাঠামো ও ভায়াডাক্ট নির্মাণের দায়িত্বে ছিলো ইতালিয়ান-থাই উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান ‘ইতালথাই’ এবং জাপানের ‘সোমিতোমো মিৎসুই কনস্ট্রাকশন’। আর পুরো প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন ও তদারকি পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছে জাপানের ‘জাইকা’ চালিত এনকেআই ও ওরিয়েন্টাল কনসালট্যান্টস গ্লোবাল সমন্বিত যৌথ অ্যালায়েন্স।
ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘আমি ডিএমটিসিএলকে বলব, ওই বাকি পাঁচটা—সেটা আসলে যারা পরামর্শক বা ঠিকাদার ছিলো, তাদেরকেই দিয়ে রিপ্লেসমেন্ট কিন্তু করাতে হবে। কারণ, আমরা যে অবকাঠামোটা আসলে বুঝে পেয়েছি, এটা একটা ফ্রেশ প্রজেক্ট। তিন-সাড়ে তিন বছর ধরে আমরা চালাচ্ছি, এত দ্রুত আসলে তাকে যদি আমরা মেইনটেনেন্স করতে হয়, তাহলে তো সে মেইনটেনেন্স হাংরি হয়ে যাবে।’
গুরুত্বপূর্ণ নানা ত্রুটির কারণে পরামর্শক এবং ঠিকাদার কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা হচ্ছে কিনা তা নিয়ে স্পষ্ট কিছুই জানাতে পারেনি ডিএমটিসিএল।
ডিএমটিসিএলের এক কর্মকর্তা বলেন, আমার কাজ হচ্ছে তথ্যের কোঅর্ডিনেট করা। এ টোটাল সিস্টেমে হয়তো একজন একটা কাজ করছে, আরেকজন আরেকটা কাজ করছে— সব জায়গা থেকে আমাকে তথ্য আনতে হবে, নিয়ে আমাকে কম্পাইল করতে হবে।
তবে নিরীক্ষা কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে গেল ১৬ জুলাই কমিটি করেছে কর্তৃপক্ষ। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা ১০টি বিয়ারিং প্যাডের জায়গায় স্টিলের ব্র্যাকেট বসানো হয়েছে। আর ঝুঁকিপূর্ণ ২৭টি প্যাড বসে যাচ্ছে কি-না তারও পর নজর রাখতে স্থাপন করা হয়েছে সেটেলমেন্ট মার্কার এবং সিসি ক্যামেরা। এসব ত্রুটি আগেভাগেই চিহ্নিত করতে পারায় নিরাপত্তার শঙ্কা অনেকটাই কেটে গেছে বলে মত এ বিশেষজ্ঞের।
ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘এখান থেকে আমাদের লেসন লার্ন করতে হবে, শিক্ষা নিতে হবে। যে ভবিষ্যতে যে আমরা মেট্রোগুলি করব, সেখানে নকশা যে আমরা করছি—এই নকশাটা একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট থার্ড পার্টি, থার্ড পার্টি যাদের কম্পিটেন্সি আছে, দক্ষতা আছে, তাদেরকে নিয়ে আমাদের যে ভেটিংয়ের কথা আমি বলছি, এ ভেটিংটা কিন্তু করাতে হবে।’




















মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে নতুন দেশ যুক্ত হতে পারে: পাকিস্তানের সেনাবাহিনী