মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ফ্লাইট পরিচালনা করছে ইরান

- আপডেট সময় : ০১:৪৯:৩৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 0
ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে সম্প্রতি দেশটির বিমান চলাচলের ওপর একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের পুরো বিমান চলাচল খাতের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞা ইতোমধ্যেই কার্যকর হলেও দেশটির আকাশপথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
মূলত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই তেহরান বিমানবন্দর থেকে এখনো ৩০টির বেশি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে ফ্লাইট সংখ্যা কমে গেলেও চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তানসহ অন্য কয়েকটি দেশের সঙ্গে ইরানের বিমান যোগাযোগ এখনো চালু রয়েছে।
সংবাদমাধ্যম আরব নিউজ বলছে, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ইরানের পুরো বিমান চলাচল খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, এই পদক্ষেপের ফলে ইরান কার্যত ‘অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরুদ্ধ’ হয়ে পড়বে। নিষেধাজ্ঞা মেনে চলার জন্য বিদেশি কোম্পানিগুলোকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় দেয় ওয়াশিংটন।
এরপর বেসেন্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিশ্বের যেকোনো জায়গায় ইরানের সব বিমান সংস্থার কার্যক্রম ‘বন্ধ করে দেয়া হবে’। তিনি বলেন, ‘ইরানের বিমান যদি অবতরণ করে, তাহলে তাদের জ্বালানি দেয়া যাবে না, অবতরণ-সংক্রান্ত সেবা দেয়া যাবে না, তাদের কাছে টিকিট বিক্রিও করা যাবে না। অন্যথায় আপনাকে ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা থেকে বাদ দেয়া হবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে তেহরান সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতেও অভিযোগ করার কথা জানিয়েছে। একইসঙ্গে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও শুধু তেহরান থেকেই প্রায় ৩০টি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা অব্যাহত রয়েছে বলে তেহরানের দাবি করেছে।
ফ্লাইট চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার তেহরানের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে মোট ৪১টি ফ্লাইট উড্ডয়ন করেছে বা সেখানে অবতরণ করেছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার আগের দুই দিনে প্রতিদিন গড়ে ৮০ থেকে ৯০টি ফ্লাইট চলাচল করেছিল। অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞার পর তেহরানের ফ্লাইট সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
মার্কিন এই নিষেধাজ্ঞায় ইরানের দুটি প্রধান বিমান সংস্থা—রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ইরান এয়ার এবং বেসরকারি বিমান সংস্থা মাহান এয়ার সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত রোববার তেহরান বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করা ২৪টি ফ্লাইটের মধ্যে মাত্র পাঁচটি পরিচালনা করেছে মাহান এয়ার এবং দুটি ইরান এয়ার। নিষেধাজ্ঞার আগে দুই বিমান সংস্থাই প্রতিদিন প্রায় ১০টি করে ফ্লাইট পরিচালনা করত।
অবশ্য এই সংখ্যা বেসেন্টের দেয়া হিসাবের চেয়ে বেশি। তিনি বলেছিলেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেয়া বক্তব্যে তেহরান বিমানবন্দরের পরিচালক বলেন, ‘৩০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক গন্তব্যে এখনো ফ্লাইট চলাচল করছে।’
এদিকে তেহরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে ‘অবৈধ ও একতরফা’ বলে আখ্যা দিয়ে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে চীন। চীনা বিমানবন্দরগুলোতে মাহান এয়ারের ফ্লাইট চলাচলও অব্যাহত রয়েছে।
রাশিয়া ও পাকিস্তানের সঙ্গেও ইরানের ফ্লাইট চলাচল করছে। তবে এই দুই দেশ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। অবশ্য তুরস্কের কর্তৃপক্ষের অনুরোধে দেশটিতে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করেছে মাহান এয়ার। বিমান সংস্থাটি এ তথ্য জানিয়েছে। যদিও ইরান এয়ার এখনো প্রতিদিন ইস্তাম্বুলে ফ্লাইট পরিচালনা করছে।
ইরানের আরও কয়েকটি ছোট বিমান সংস্থাও তুরস্কের অন্যান্য শহরে ফ্লাইট চালাচ্ছে। আর্মেনিয়া, আফগানিস্তান, বেলারুশ ও মালয়েশিয়ায় এখনো নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়নি। এসব দেশে মূলত ইরানের ছোট বিমান সংস্থাগুলো ফ্লাইট পরিচালনা করে।
এদিকে নিষেধাজ্ঞা না মানা দেশগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা কোনো ব্যবস্থা নেবে কি না, সে বিষয়ে এখনো কিছু জানায়নি ওয়াশিংটন। তবে ইরানি যাত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট কেন্দ্র সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের ভূখণ্ড থেকে ইরানের সব ফ্লাইট ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত’ স্থগিত করেছে।
আর কুয়েতের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা সোমবার বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেন, সাত মাস আগে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরানের বিমান সংস্থাগুলোকে কুয়েতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হচ্ছে না। অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলো এ বিষয়ে কোনো ঘোষণা দেয়নি। তবে তাদের বিমানবন্দরের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এসব দেশও ইরানের ফ্লাইট স্থগিত করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইএসএনএ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইরানের ফ্লাইট এখন আর আজারবাইজান, জর্জিয়া ও ইরাকে যেতে পারছে না। তবে ইরাক নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি চাচ্ছে।
ইরাক সরকার গত শনিবার জানিয়েছে, ইরানের বিমান সংস্থাগুলোর ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় পেতে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে রোগী, শিক্ষার্থী ও তীর্থযাত্রীদের যাতায়াত ব্যাহত হয়েছে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া দপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, ‘নির্দিষ্ট কিছু ইরাকি বিমানবন্দরকে এসব পদক্ষেপের বাইরে রাখার জন্য ইরাক সরকার সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা করছে।’
বিবৃতিতে বলা হয়, ছাড় দেয়া হলে ‘মানবিক কারণে’ ফ্লাইট চলাচল আবার শুরু করা সম্ভব হবে। এর মধ্যে চিকিৎসা, শিক্ষা, ধর্মীয় সফর এবং বেসামরিক নাগরিকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যাতায়াতও রয়েছে।
ইরানের বিমান সংস্থাগুলো মূলত ইরাকের শিয়া তীর্থযাত্রীদের ইরানের পবিত্র শহরগুলোতে নিয়ে যায়। একইভাবে ইরানিরা ইরাকের পবিত্র স্থানগুলোতে যাওয়ার জন্য এসব ফ্লাইট ব্যবহার করেন। এ ছাড়া ইরানে পড়াশোনা করা ইরাকি শিক্ষার্থী এবং সেখানে চিকিৎসা নিতে যাওয়া রোগীরাও এসব ফ্লাইটের ওপর নির্ভর করেন।























