ঢাকা ০৫:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের আস্থা; মানতে হবে কঠিন শর্ত

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৪:১৮:২৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
  • / 0

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বড় আস্থার বার্তা দিয়েছে বৈশ্বিক সংস্থাগুলো। তবে বাজেট সহায়তার আশ্বাস মিললেও, বিনিময়ে বাস্তবায়ন করতে হবে ব্যাংক খাতের সুশাসন ও কঠোর রাজস্ব সংস্কারের মতো কঠিন শর্ত। কিন্তু জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস আর মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পূর্বাভাস যখন উদ্বেগ বাড়াচ্ছেন, তখন এই আন্তর্জাতিক আশ্বাস কতটা বাস্তবে রূপ পাবে?

বৈশ্বিক মন্দা আর সামষ্টিক অর্থনীতির নানা টানাপোড়নের মাঝেই অনুষ্ঠিত হলো আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলন। ১২ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে শুরু হওয়া এই সম্মেলনের পর্দা নামলো ১৮ অক্টোবর।

সপ্তাহব্যাপী চলা এই সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বাজেট সহায়তা ও ঋণের আশ্বাস নিশ্চিত করা।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলছেন, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর পরামর্শের আগেই সংস্কার কাজে হাত দিয়েছে সরকার। তাই ঋণ সহায়তার ব্যাপারে আশাবাদী বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘তিনটি ইউনিক বিষয় আছে, সেই কারণেই আমরা উল্লেখ করেছি এবং যার কারণেই কিন্তু এই আলোচনা দর কষাকষিটা খুব সহজতর হয়েছে। কারণ তিনটি পরিস্থিতি এবং এই পরিস্থিতিগুলো থেকে উত্তরণের কৌশল এবং অগ্রাধিকারগুলো আমরা নির্ধারণ করেছি।’

সম্মেলনে অর্থনৈতিক সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে মিলেছে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ এর নীতিগত ইতিবাচক বার্তা। তবে সহায়তার সমান্তরালে ফুটে উঠেছে কঠোর কিছু শর্ত ও সতর্কবার্তা। অর্থ উপদেষ্টা বলছেন, শুধু সংস্কার চাইলেই হবে না, বাংলাদেশের বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখতে হবে।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘বৈশ্বিক যে নীতি কাঠামো সেখানেও যেন পরিবর্তনগুলো হয়। কারণ একটা তো হচ্ছে বিধিবদ্ধ কাঠামো, আরেকটা হচ্ছে যে নতুন পরিস্থিতির আলোকে বৈশ্বিক হস্তক্ষেপ দরকার। আইডার রিপ্লেনিশমেন্টে এবং বাংলাদেশের বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনা করা দরকার, অর্থাৎ লিগ্যাসি বা উত্তরাধিকার প্রবলেম। তারপরে আমরা যেহেতু জবাবদিহিতা, সেই জন্য আমরা তো এক লাফে বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম বাড়াতে পারি না এবং আমরা তা করিনি।’

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রাক্কলন অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩.২ শতাংশে। বিপরীতে মূল্যস্ফীতি ছুঁতে পারে প্রায় ১১ শতাংশের ঘর। যা সামলাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কর জিডিপির অনুপাত বাড়ানো এবং শক্ত হাতে সংস্কার কাজ বাস্তবায়ন না করতে পারলে সরকারকে শূন্য হাতেই ফিরতে হবে বলে মত অর্থনীতিবিদদের।

পলিসি একচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘২টা জায়গার সময় নিয়ে আমার মনে হয় বাংলাদেশকে একটা আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা অন্য মাল্টিল্যাটারালদের সঙ্গে যারা বাজেট সাপোর্ট দেবে একটু খুব দক্ষ আলোচনা করতে হবে। সেটা হলো সার বা কৃষি ক্ষেত্রের ভর্তুকি কমিয়ে নিয়ে আসা এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্সুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম জাহীদ বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার যদি আইএমএফ থেকে সফলভাবে ঋণ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়, তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তিদায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আমরা মনে করি।’

সবশেষ আশার বাণী হলো চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ সফর করবেন আইএমএফ প্রতিনিধি দল। আর এতেই বড় স্বস্তি দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের এই সম্মেলন থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তির তালিকা একেবারেই খালি নয়। বৈদেশিক ঋণ ও আন্তর্জাতিক সহায়তার দরজা উন্মুক্ত থাকলেও শর্তের বেড়াজাল টপকানো এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সরকার যদি তাদের নেয়া সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে, তাহলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর যে প্রচেষ্টা তা সফলতার মুখ দেখবে শিগগিরই।

নিউজটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের আস্থা; মানতে হবে কঠিন শর্ত

আপডেট সময় : ০৪:১৮:২৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বড় আস্থার বার্তা দিয়েছে বৈশ্বিক সংস্থাগুলো। তবে বাজেট সহায়তার আশ্বাস মিললেও, বিনিময়ে বাস্তবায়ন করতে হবে ব্যাংক খাতের সুশাসন ও কঠোর রাজস্ব সংস্কারের মতো কঠিন শর্ত। কিন্তু জিডিপি প্রবৃদ্ধি হ্রাস আর মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পূর্বাভাস যখন উদ্বেগ বাড়াচ্ছেন, তখন এই আন্তর্জাতিক আশ্বাস কতটা বাস্তবে রূপ পাবে?

বৈশ্বিক মন্দা আর সামষ্টিক অর্থনীতির নানা টানাপোড়নের মাঝেই অনুষ্ঠিত হলো আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সম্মেলন। ১২ অক্টোবর থাইল্যান্ডের ব্যাংককে শুরু হওয়া এই সম্মেলনের পর্দা নামলো ১৮ অক্টোবর।

সপ্তাহব্যাপী চলা এই সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধান লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বাজেট সহায়তা ও ঋণের আশ্বাস নিশ্চিত করা।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলছেন, আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর পরামর্শের আগেই সংস্কার কাজে হাত দিয়েছে সরকার। তাই ঋণ সহায়তার ব্যাপারে আশাবাদী বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘তিনটি ইউনিক বিষয় আছে, সেই কারণেই আমরা উল্লেখ করেছি এবং যার কারণেই কিন্তু এই আলোচনা দর কষাকষিটা খুব সহজতর হয়েছে। কারণ তিনটি পরিস্থিতি এবং এই পরিস্থিতিগুলো থেকে উত্তরণের কৌশল এবং অগ্রাধিকারগুলো আমরা নির্ধারণ করেছি।’

সম্মেলনে অর্থনৈতিক সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে মিলেছে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ এর নীতিগত ইতিবাচক বার্তা। তবে সহায়তার সমান্তরালে ফুটে উঠেছে কঠোর কিছু শর্ত ও সতর্কবার্তা। অর্থ উপদেষ্টা বলছেন, শুধু সংস্কার চাইলেই হবে না, বাংলাদেশের বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখতে হবে।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘বৈশ্বিক যে নীতি কাঠামো সেখানেও যেন পরিবর্তনগুলো হয়। কারণ একটা তো হচ্ছে বিধিবদ্ধ কাঠামো, আরেকটা হচ্ছে যে নতুন পরিস্থিতির আলোকে বৈশ্বিক হস্তক্ষেপ দরকার। আইডার রিপ্লেনিশমেন্টে এবং বাংলাদেশের বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনা করা দরকার, অর্থাৎ লিগ্যাসি বা উত্তরাধিকার প্রবলেম। তারপরে আমরা যেহেতু জবাবদিহিতা, সেই জন্য আমরা তো এক লাফে বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে দাম বাড়াতে পারি না এবং আমরা তা করিনি।’

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রাক্কলন অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩.২ শতাংশে। বিপরীতে মূল্যস্ফীতি ছুঁতে পারে প্রায় ১১ শতাংশের ঘর। যা সামলাতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কর জিডিপির অনুপাত বাড়ানো এবং শক্ত হাতে সংস্কার কাজ বাস্তবায়ন না করতে পারলে সরকারকে শূন্য হাতেই ফিরতে হবে বলে মত অর্থনীতিবিদদের।

পলিসি একচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, ‘২টা জায়গার সময় নিয়ে আমার মনে হয় বাংলাদেশকে একটা আইএমএফ, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক বা অন্য মাল্টিল্যাটারালদের সঙ্গে যারা বাজেট সাপোর্ট দেবে একটু খুব দক্ষ আলোচনা করতে হবে। সেটা হলো সার বা কৃষি ক্ষেত্রের ভর্তুকি কমিয়ে নিয়ে আসা এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্সুরেন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম জাহীদ বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকার যদি আইএমএফ থেকে সফলভাবে ঋণ গ্রহণ করতে সক্ষম হয়, তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তিদায়ক পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে বলে আমরা মনে করি।’

সবশেষ আশার বাণী হলো চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশ সফর করবেন আইএমএফ প্রতিনিধি দল। আর এতেই বড় স্বস্তি দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের এই সম্মেলন থেকে বাংলাদেশের প্রাপ্তির তালিকা একেবারেই খালি নয়। বৈদেশিক ঋণ ও আন্তর্জাতিক সহায়তার দরজা উন্মুক্ত থাকলেও শর্তের বেড়াজাল টপকানো এখন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

সরকার যদি তাদের নেয়া সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে, তাহলে নিশ্চিতভাবেই বলা যায় অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর যে প্রচেষ্টা তা সফলতার মুখ দেখবে শিগগিরই।