হৃদয় জিতল কেপ ভার্দে, লড়াই শেষে জয় আর্জেন্টিনার
- আপডেট সময় : ১২:৩৩:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ জুলাই ২০২৬
- / 17
স্কোরবোর্ডে শেষ পর্যন্ত লেখা থাকবে আর্জেন্টিনা ৩, কেপ ভার্দে ২। ইতিহাসের পাতায়ও ফলাফলটি এভাবেই জায়গা করে নেবে। কিন্তু মায়ামির মাঠে ১২০ মিনিট ধরে যে গল্প লেখা হয়েছে, সেটি কেবল একটি পরাজয়ের গল্প নয়। সেটি ছিল সাহস, আত্মবিশ্বাস আর অসম লড়াইকে মহাকাব্যে পরিণত করার গল্প।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চাপে রেখে কেপ ভার্দে প্রমাণ করে দিয়েছে, ফুটবলে নামের জৌলুস নয়, লড়াইয়ের মানসিকতাই অনেক সময় সবচেয়ে বড় পরিচয়।
ম্যাচ শুরুর আগে শক্তির বিচারে দু’দলের মধ্যে ব্যবধান ছিল বিশাল। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি আর্জেন্টিনার বিপক্ষে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে আসা কেপ ভার্দেকে কেউই বড় কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ভাবেনি। ফিফা র্যাঙ্কিংয়েও দু’দলের ব্যবধান ছিল ৬৩ ধাপ। কিন্তু মাঠে নেমে সেই পরিসংখ্যানকে প্রায় অর্থহীন করে দেয় আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপদেশটি।
শুরু থেকেই কেপ ভার্দে আক্রমণ-প্রতিরক্ষার দারুণ সমন্বয় দেখায়। বল হারালেই দ্রুত রক্ষণে নেমে এসেছে, আবার সুযোগ পেলেই একযোগে আক্রমণে উঠে গেছে। পুরো ম্যাচে তাদের ফুটবলে ছিল শৃঙ্খলা, গতি ও আত্মবিশ্বাসের ছাপ। আর্জেন্টিনার মতো দলের বিপক্ষে খেলেও কোথাও ভয় কিংবা জড়তা দেখা যায়নি।
ম্যাচ যত এগিয়েছে, ততই বাড়তে থেকেছে উত্তেজনা। একসময় মনে হচ্ছিল, বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে আরেকটি বড় অঘটনের সাক্ষী হতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্ব। ম্যাচের আবহ অনেকের কাছেই মনে করিয়ে দিয়েছে ২০২২ বিশ্বকাপের সেই রুদ্ধশ্বাস ফাইনালের কথা। লুসাইল স্টেডিয়ামের মতোই মায়ামির গ্যালারিতেও ছিল টানটান উত্তেজনা।
এই ম্যাচে লিওনেল মেসি নিজের স্বাভাবিক ছন্দে থাকার চেষ্টা করলেও বারবার বাধা হয়ে দাঁড়ান কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনিয়া। প্রথমার্ধে মেসি একবার জালের দেখা পেলেও এরপর একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে দেন অভিজ্ঞ এই গোলরক্ষক। ওয়ান-অন-ওয়ান পরিস্থিতিতে মেসিকে হতাশ করেছেন, ফ্রি-কিক থেকেও ফিরিয়ে দিয়েছেন নিশ্চিত গোল। পুরো ম্যাচে ভোজিনিয়া করেছেন আটটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ, যা ম্যাচের অন্যতম বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে কয়েকটি সেভ ছিল অসাধারণ। নিজের শরীরকে বলের সামনে নিখুঁতভাবে রেখে যেভাবে তিনি আর্জেন্টিনার আক্রমণ ভেস্তে দিয়েছেন, তাতে বোঝা গেছে কেন ফুটবলে একজন গোলরক্ষক একাই ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন। প্রায় ৪০ বছর বয়সেও তার ক্ষিপ্রতা ও সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ছিল ঈর্ষণীয়। বিশ্বসেরা ফুটবলারের বিপক্ষেও তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, সাহস আর প্রস্তুতি থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।
কেপ ভার্দের আক্রমণভাগও কম চোখে পড়েনি। বিশেষ করে অতিরিক্ত সময়ের ১০৩ মিনিটে সিডনি কাবরালের গোলটি ম্যাচের অন্যতম সেরা মুহূর্ত হয়ে থাকবে। বাঁ দিক থেকে বল নিয়ে ভেতরে ঢুকে ডান পায়ের নিখুঁত বাঁকানো শটে তিনি বল জড়ান দূরের ওপরের কোণে। আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজের কিছুই করার ছিল না। গোলের পর গ্যালারিতে ছুটে গিয়ে প্রিয়জনকে খুঁজে নিয়ে তার উদ্যাপন ম্যাচটিকে আরও আবেগঘন করে তোলে।
আর্জেন্টিনা শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতা ও মানের পার্থক্যে জয় নিশ্চিত করলেও সেই জয় মোটেও সহজ ছিল না। কেপ ভার্দে একের পর এক আক্রমণ চালিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে রেখেছে এবং শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত জয় না পেলেও তারা দর্শকদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে।
এই ম্যাচ কেপ ভার্দের জন্য ছিল অনেক কিছু অর্জনের সুযোগ। ট্রফি বা জয় না এলেও তারা পেয়েছে বিশ্ব ফুটবলপ্রেমীদের সম্মান, ভালোবাসা এবং স্বীকৃতি। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ভয়হীন ফুটবল খেলে তারা দেখিয়ে দিয়েছে, বিশ্বকাপের মঞ্চে ছোট দল বলে কিছু নেই। সঠিক পরিকল্পনা, আত্মবিশ্বাস এবং সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকলে যে কোনো দলই পরাশক্তিদের কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে পারে।
ফলাফলের হিসেবে কেপ ভার্দে বিদায় নিয়েছে পরাজিত দল হিসেবে। কিন্তু পারফরম্যান্সের বিচারে তারা হয়ে উঠেছে এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়ে কেপ ভার্দে এমন এক স্মৃতি উপহার দিয়েছে, যা অনেক দিন ধরে ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনায় থাকবে। কখনো কখনো পরাজয়ও জয়ের চেয়ে বেশি সম্মান এনে দেয় মায়ামির এই ম্যাচটি তারই উজ্জ্বল উদাহরণ।
শনিবার (৪ জুলাই) মায়ামিতে ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল ও আক্রমণের ধার সবকিছুতেই এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। রদ্রিগো ডি পল, থিয়াগো আলমাদা ও আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের সমন্বয়ে একের পর এক আক্রমণ গড়ে তোলে স্কালোনির দল। অবশেষে ২৯ মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত গোল। নিজের অর্ধ থেকে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের দেয়া নিখুঁত লম্বা পাস ধরে দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে গোলরক্ষক ভোজিনিয়াকে পরাস্ত করেন মেসি।
এই গোলটি ব্যক্তিগতভাবেও মেসির জন্য ছিল বিশেষ। এর মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের ২০তম গোল পূর্ণ করেন তিনি। পাশাপাশি টানা অষ্টম বিশ্বকাপ ম্যাচে গোল করার অনন্য নজিরও গড়েন। শুধু গোলই নয়, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এটি ছিল তার ১২তম সরাসরি গোল-অবদান (৬ গোল ও ৬ অ্যাসিস্ট), যা ১৯৬৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী নতুন রেকর্ড।
তবে কেপ ভার্দের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ না থাকলে ব্যবধান আরও বড় হতে পারত।
বিরতির পর খেলার চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই আগ্রাসী ফুটবল খেলতে থাকে কেপ ভার্দে। ৫৯ মিনিটে মোরেইরার পাস থেকে রায়ান মেন্দেস ডান দিক দিয়ে উঠে নিখুঁত কাট-ব্যাক করেন। সেই বল থেকে কঠিন কোণ থেকেও ডেরয় দুয়ার্তে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও এমিলিয়ানো মার্টিনেজকে পরাস্ত করে দূরের কোণে বল জড়িয়ে দেন।
গোল হজমের পর আর্জেন্টিনা পাল্টা চাপ বাড়ায়। কোচ লিওনেল স্কালোনি আক্রমণে নতুন গতি আনতে একের পর এক পরিবর্তন করেন। কিন্তু বদলির পরও ভোজিনিয়াকে আর পরাস্ত করতে পারেনি আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষে ১-১ সমতায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে।
অতিরিক্ত সময়ের শুরুতেই আবারও এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ৯২ মিনিটে মেসির নেয়া কর্নার থেকে অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার হেডে বল বাড়িয়ে দেন। সেই বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শটে বল জড়িয়ে দেন জালের ওপরের কোণে।
কিন্তু কেপ ভার্দে হাল ছাড়েনি। ১০৩ মিনিটে নিজেদের অর্ধ থেকে গড়া দ্রুত আক্রমণে সিডনি কাবরাল বাঁ দিক থেকে ভেতরে ঢুকে ম্যাক অ্যালিস্টারকে কাটিয়ে বাঁকানো শটে গোল করে আবারও সমতা ফেরান।
দ্বিতীয় অতিরিক্ত সময়ে আবারও আক্রমণের গতি বাড়ায় আর্জেন্টিনা। ১১১ মিনিটে মেসির নেয়া কর্নার থেকে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর হেড বোর্জেসের গায়ে লেগে দিক বদলে জালে ঢুকে যায়। আত্মঘাতী গোল হিসেবে নথিভুক্ত হওয়া সেই গোলেই ৩-২ ব্যবধানে আবারও এগিয়ে যায় বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
শেষ মুহূর্তের মরিয়া আক্রমণেও কেপ ভার্দে আর সমতা ফেরাতে পারেনি। শেষ বাঁশি বাজতেই স্বস্তির উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন আর্জেন্টাইন ফুটবলাররা।
এই জয়ের ফলে শেষ ষোলোয় আর্জেন্টিনা মিশরীয় বাধা মোকাবিলা করবে। অস্ট্রেলিয়াকে টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে হারিয়ে ইতিহাস গড়ে মিশরে। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময় শেষে ১-১ সমতা থাকার পর টাইব্রেকারে জয় নিশ্চিত করে তারা। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় পৌঁছে নতুন ইতিহাস লিখেছে আফ্রিকার দলটি, আর এবার সেই স্বপ্নযাত্রার সামনে দাঁড়াবে আর্জেন্টিনা।


























টাঙ্গাইলে ১১ দলীয় ঐক্যজোটের গণমিছিল