২০০ বছর পর নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

- আপডেট সময় : ১২:৫২:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 0
নাশভিল, টেনেসি: যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে প্রায় ২০০ বছর পর প্রথম কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে যাচ্ছে। ৫০ বছর বয়সী খ্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড আগামী বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর কার্যকর করার কথা রয়েছে। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে ১৮২০ সালের পর টেনেসিতে প্রথম কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে।
১৯৯৫ সালে ১৮ বছর বয়সে সহপাঠী ১৯ বছর বয়সী কোলিন স্লেমারকে হত্যার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হন পাইক। তারা দুজনই নক্সভিলের জব কর্পসে পড়াশোনা করতেন। প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, পাইক মনে করতেন স্লেমার তার প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছেন। এ কারণে পাইক ও তার প্রেমিক টাডারিল শিপ স্লেমারকে একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে গিয়ে নির্যাতন ও হত্যা করেন।
হত্যাকাণ্ডটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ঘটনার নৃশংসতা, জড়িতদের অল্প বয়স এবং নিহতের শরীরে শয়তানবাদ-সংশ্লিষ্ট একটি প্রতীক খোদাই করার বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়। মামলায় শিপ স্বীকার করেছিলেন যে তিনিই স্লেমারের শরীরে পেন্টাগ্রাম বা পাঁচকোণা তারকা আকৃতির প্রতীকটি খোদাই করেছিলেন।
পাইক তার অপরাধের দায় অস্বীকার করেননি। তবে তার আইনজীবীরা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছেন, ১৮ বছর বয়সে সংঘটিত অপরাধের জন্য তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া উপযুক্ত নয়। তাদের দাবি, শৈশব থেকেই পাইক গুরুতর নির্যাতন, যৌন নিপীড়ন ও অবহেলার শিকার হয়েছেন। পরবর্তী সময়ে তার বাইপোলার ডিসঅর্ডার ও পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার শনাক্ত হয়।
পাইকের আইনজীবী স্টিফেন ফেরেলের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকেই পাইক যৌন নির্যাতনের শিকার হন এবং ১১ ও ১৭ বছর বয়সে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন। তার আইনজীবীদের দাবি, মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণের সময় বিচারকদের সামনে তার শৈশবের এসব পরিস্থিতি ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যথেষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয়নি।
ক্ষমা প্রার্থনার আবেদনে পাইক নিজের অপরাধের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন। সেখানে তিনি বলেন, তিনি তখন মানসিকভাবে অসুস্থ ১৮ বছর বয়সী এক তরুণী ছিলেন এবং নিজের কর্মকাণ্ডের ভয়াবহতা বুঝতে তার অনেক বছর লেগেছে। তিনি স্বীকার করেছেন, তার কর্মকাণ্ডে একটি পরিবারের সন্তান, বোন ও বন্ধুকে হারাতে হয়েছে।
পাইকের আইনজীবীরা আরও বলছেন, বর্তমানে কিশোর-কিশোরীদের মস্তিষ্কের বিকাশ ও শৈশবের মানসিক আঘাতের প্রভাব সম্পর্কে আগের তুলনায় অনেক বেশি বৈজ্ঞানিক তথ্য জানা যায়। তাদের মতে, অপরাধের সময় পাইকের বয়স এবং তার শৈশবের পরিস্থিতি মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার কারণ হওয়া উচিত।
মামলায় পাইকের প্রেমিক টাডারিল শিপের বয়স ছিল ১৭ বছর। তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে প্যারোলের সুযোগ রাখা হয়েছিল। ২০২৫ সালে তার প্যারোলের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়। আরেক কিশোর সহযোগী হিসেবে দায় স্বীকার করে পরীক্ষামূলক মুক্তির সাজা পেয়েছিল।
টেনেসির গভর্নর বিল লি সোমবার জানিয়েছেন, তিনি পাইকের সাজা মওকুফ করবেন না। এর পর পাইকের আইনজীবীরা যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ চেয়ে আবেদন করেছেন। এর আগে টেনেসি সুপ্রিম কোর্টও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পথ বন্ধ করেনি। ২৩ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক রায়ে আদালত জানায়, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য নির্ধারিত পদ্ধতি নিয়ে পাইকের করা চ্যালেঞ্জ সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম।
এদিকে নিহত কোলিন স্লেমারের মা মে মার্টিনেজ মেয়ের মৃত্যুর পর প্রায় তিন দশক ধরে অপেক্ষা করছেন। তিনি পাইকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার ভাষ্য, কোলিন মাত্র ১৯ বছর বয়সে মারা যান এবং বড় হয়ে ওঠার সুযোগ পাননি। মার্টিনেজ জানান, তার মেয়ে স্পেশাল অলিম্পিকসে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতেন, রোলার স্কেটিং পছন্দ করতেন এবং কম্পিউটার নিয়ে কাজ করার পেশাগত স্বপ্ন ছিল।
কোলিনের হত্যাকাণ্ড নক্সভিল শহরেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, হামলার সময় তাকে ধারালো বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয় এবং বড় একটি পাথর বা অ্যাসফল্টের টুকরা দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল। ঘটনাটি ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকের তথাকথিত ‘স্যাটানিক প্যানিক’ বা শয়তানবাদ নিয়ে সামাজিক আতঙ্কের আলোচনাকেও উসকে দিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা তুলনামূলকভাবে বিরল। ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড পুনরায় কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ১৮ জন নারীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা ওই সময়ের মোট মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রায় ১ শতাংশ। ২০২৩ সালে মিসৌরিতে অ্যাম্বার ম্যাকলাফলিনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার লিসা মন্টগোমেরির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে, যা প্রায় সাত দশকের মধ্যে কোনো নারী ফেডারেল বন্দির প্রথম মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ছিল।
ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের হিসাবে, আধুনিক মৃত্যুদণ্ডের যুগে যুক্তরাষ্ট্রে ১৮, ১৯ বা ২০ বছর বয়সে সংঘটিত অপরাধের জন্য ২৭৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। তবে এই বয়সসীমার ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ডের সাজা বর্তমানে ক্রমেই বিরল হয়ে এসেছে। পাইক ১৯৯৬ সালে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার পর প্রায় ৩০ বছর ধরে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি হিসেবে কারাগারে রয়েছেন। তার মৃত্যুদণ্ড বুধবার কার্যকর হলে টেনেসির ইতিহাসে ২০০ বছরেরও বেশি সময় পর প্রথম কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে। সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (AP), ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টার (DPIC)






















