কী হচ্ছে পৃথিবীর গভীরে, নতুন গবেষণায় চাঞ্চল্য

- আপডেট সময় : ০১:৪১:০৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
- / 0
পৃথিবীর কেন্দ্র ও তার ওপরের স্তর ম্যান্টলের (গুরুমণ্ডল) মধ্যে গত ৪৫০ কোটি বছর ধরেই পদার্থের আদান-প্রদান চলছে; এমনই ইঙ্গিত মিলেছে নতুন এক গবেষণায়। এত দিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, পৃথিবীর কেন্দ্র মূলত বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে। তবে নতুন এই গবেষণা সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। গবেষকদের মতে, পৃথিবীর গভীর অভ্যন্তর থেকে হাইড্রোজেন, হিলিয়াম ও টাংস্টেনের মতো উপাদান ম্যান্টলের দিকে উঠে আসতে পারে। খবর এনডিটিভির।
‘সাইন্স অ্যাডভান্সেস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন চীনের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষকেরা। কম্পিউটার সিমুলেশন ও মেশিন লার্নিংয়ের সহায়তায় তারা পৃথিবীর অভ্যন্তরে হাইড্রোজেনের আচরণ বিশ্লেষণ করেছেন।
প্রায় ৪৫০ কোটি বছর আগে পৃথিবী গঠনের সময় গ্রহটি ছিল অত্যন্ত উত্তপ্ত এবং অনেকাংশে গলিত অবস্থায়। ধীরে ধীরে পৃথিবী শীতল হতে শুরু করলে ভারী পদার্থগুলো নিচে নেমে কেন্দ্র বা কোর তৈরি করে। অন্যদিকে, তুলনামূলক হালকা পদার্থ দিয়ে গঠিত হয় ম্যান্টল ও ভূত্বক।
পৃথিবীর প্রাথমিক গঠনের সময় কিছু উপাদান গভীর অভ্যন্তরে আটকে যায়। দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হতো, এসব প্রাচীন উপাদান পৃথিবীর কেন্দ্রের ভেতরেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু নতুন গবেষণা বলছে, কেন্দ্র ও ম্যান্টলের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে রাসায়নিক উপাদানের বিনিময় হয়ে থাকতে পারে। এর ফলে পৃথিবীর আদিম উপাদানের কিছু অংশ এখনও ওপরের স্তরগুলোর দিকে আগাতে পারে।
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে হাইড্রোজেনের দুটি আইসোটোপ সাধারণ হাইড্রোজেন ও ডিউটেরিয়ামের অনুপাত বিশ্লেষণ করেছেন। ডিউটেরিয়াম হলো হাইড্রোজেনের তুলনামূলক ভারী একটি আইসোটোপ। এই দুই ধরনের হাইড্রোজেনের অনুপাত থেকে পৃথিবীর অভ্যন্তরে উপাদান চলাচলের ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
গবেষকেরা পৃথিবীর গভীর অভ্যন্তরের মতো প্রচণ্ড চাপ ও তাপমাত্রায় হাইড্রোজেন কীভাবে আচরণ করে, তা কম্পিউটার মডেলের মাধ্যমে পরীক্ষা করেন। তাদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, পৃথিবীর প্রাথমিক গলিত অবস্থার সমুদ্রের মতো স্তর বা ম্যাগমা ওশান স্ফটিকায়িত হওয়ার সময় ম্যান্টলে হাইড্রোজেনের আইসোটোপ অনুপাত মোটামুটি একই রকম থাকার কথা।
কিন্তু বর্তমানে পৃথিবীর গভীর অভ্যন্তর থেকে পাওয়া কিছু নমুনায় যে আইসোটোপের বৈচিত্র্য দেখা যায়, তা কেবল পৃথিবীর জন্মের সময়কার পরিস্থিতি দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। গবেষকদের ধারণা, পরবর্তী সময়ে কেন্দ্র ও ম্যান্টলের মধ্যে পদার্থের আদান-প্রদান এই বৈচিত্র্য তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
পৃথিবীর গভীর অভ্যন্তর সম্পর্কে জানার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো আগ্নেয় শিলা বিশ্লেষণ। বিশেষ করে, মহাসাগরীয় দ্বীপে পাওয়া ব্যাসল্ট শিলা (গভীর থেকে উঠে আসা উত্তপ্ত পদার্থ ঠান্ডা হয়ে তৈরি হয়) বিজ্ঞানীদের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়।
আইসল্যান্ড ও কানাডার বাফিন দ্বীপে পাওয়া কিছু আগ্নেয় শিলায় অস্বাভাবিক রাসায়নিক ও আইসোটোপিক বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা হয়েছে। এসব শিলায় ডিউটেরিয়াম ও হাইড্রোজেনের অনুপাত তুলনামূলক কম। গবেষকদের মতে, এই বৈশিষ্ট্য পৃথিবীর আদিম ইতিহাসের হাইড্রোজেন থাকার ইঙ্গিত দিতে পারে।
একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে হাইড্রোজেন ম্যান্টলে প্রবেশ করেছে এবং পরবর্তী সময়ে আগ্নেয় কার্যকলাপের মাধ্যমে তার কিছু অংশ ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে এই ব্যাখ্যা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
পৃথিবীর গভীর অভ্যন্তরের ইতিহাস অনুসন্ধানে হিলিয়ামের দুটি আইসোটোপও গুরুত্বপূর্ণ। হিলিয়াম-৩ একটি আদিম আইসোটোপ, যা সৌরজগৎ গঠনের সময়কার পদার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে, হিলিয়াম-৪ পৃথিবীতে বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় মৌলের ক্ষয়ের ফলে ক্রমাগত তৈরি হয়।
আগ্নেয় শিলায় হিলিয়াম-৩ ও হিলিয়াম-৪-এর অস্বাভাবিক অনুপাত থেকে পৃথিবীর গভীরে সংরক্ষিত প্রাচীন পদার্থের উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। গবেষকদের মতে, সংকেতের কিছু অংশ পৃথিবীর কেন্দ্রের কাছাকাছি থাকা কিছু প্রাচীন পদার্থ ম্যান্টলে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা দেয়।
নতুন গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পৃথিবীর কেন্দ্র ও ম্যান্টলকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন দুটি স্তর হিসেবে দেখার ধারণাটি আবার ভাবার প্রয়োজন হতে পারে। গবেষণার ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, পৃথিবীর জন্মের সময়কার কিছু উপাদান দীর্ঘ সময় ধরে অভ্যন্তরীণ স্তরগুলোর মধ্যে চলাচল করে থাকতে পারে।


























