ভারতের পুনের যৌনপল্লি থেকে ৬ বাংলাদেশি নারী উদ্ধার

- আপডেট সময় : ১১:১১:৫৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬
- / 22
ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের পুনে শহরের একটি যৌনপল্লি থেকে ছয় বাংলাদেশি নারীকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাঁদের বাংলাদেশ থেকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার পর যৌনপল্লিতে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় মানবপাচার ও জোরপূর্বক যৌনকাজে বাধ্য করার অভিযোগে মামলা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজনকে আটক করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) ভোরে পুনের বুধওয়ার পেঠ এলাকার একাধিক যৌনপল্লিতে অভিযান চালিয়ে ওই নারীদের উদ্ধার করা হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এই অভিযানে পুনে পুলিশের তিনটি থানার সদস্যরা অংশ নেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া ও মিরর নাউয়ের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় চার মাস আগে ওই ছয় নারীকে বাংলাদেশ থেকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। মুম্বাইসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে ভালো বেতনের চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় তাঁদের। কিন্তু সীমান্ত পার হওয়ার পর প্রতিশ্রুত চাকরির পরিবর্তে তাঁদের পুনেতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে যৌনপল্লির পরিচালনাকারীদের কাছে তাঁদের বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
পুনে পুলিশের ডেপুটি কমিশনার কৃষিকেশ রাওয়ালের নির্দেশে ফারাসখানা, বিশ্রামবাগ ও খড়ক থানার পুলিশ সদস্যদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়। দলটি বুধওয়ার পেঠ এলাকার কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে অভিযান চালায়। উদ্ধার হওয়া নারীদের কাছে বৈধ পাসপোর্ট বা পরিচয়পত্র পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নারীরা জানিয়েছেন, দালালদের মাধ্যমে তাঁরা বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত পার হয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। তাঁদের বিশ্বাস করানো হয়েছিল, ভারতে পৌঁছানোর পর ভালো চাকরি ও আয়ের সুযোগ পাবেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁদের যৌনপল্লিতে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক যৌনকাজে নিয়োজিত করা হয়।
এ ঘটনায় ফারাসখানা থানায় চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে দুজনকে আটক করা হয়েছে। অন্য দুই অভিযুক্তকে শনাক্ত করা হলেও তাঁরা পলাতক রয়েছেন। তাঁদের খুঁজে বের করতে তদন্ত ও অভিযান চলছে। পাচারের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত রয়েছেন কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়।
বুধওয়ার পেঠ পুনে শহরের পরিচিত যৌনপল্লি এলাকা। এর আগেও সেখানে বাংলাদেশি নারীদের পাচার ও জোরপূর্বক যৌনকাজে নিয়োজিত করার অভিযোগে পুলিশ অভিযান চালিয়েছে। ফলে সাম্প্রতিক ঘটনাটি ওই এলাকায় নারী পাচার ও শোষণের অভিযোগকে নতুন করে সামনে এনেছে।
চলতি বছরের মার্চ মাসেও একই এলাকার একটি যৌনপল্লি থেকে চার বাংলাদেশি নারীকে উদ্ধার করেছিল পুনে সিটি পুলিশ। সে সময়ও তাঁদের ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে তাঁদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌনকাজে বাধ্য করা হয়েছিল বলে তদন্তে জানা যায়।
মার্চের ওই অভিযানে পুলিশ মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়। তদন্তে উঠে আসে, বিউটি পার্লার ও সেলাইয়ের কাজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নারীদের ভারতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত চাকরির পরিবর্তে তাঁদের যৌনপল্লিতে আটকে রেখে শোষণ করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
এ ছাড়া গত ফেব্রুয়ারিতেও বুধওয়ার পেঠ এলাকায় বড় ধরনের অভিযান চালায় পুনে পুলিশ। ওই সময় বিভিন্ন যৌনপল্লি থেকে ১১ বাংলাদেশি নারীকে উদ্ধার করা হয়। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনকে জোরপূর্বক যৌনকাজে বাধ্য করার অভিযোগ পাওয়া যায়। সেই অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট যৌনপল্লিগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছিল স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন।
ভারতে মানবপাচার ও জোরপূর্বক যৌনকাজে বাধ্য করার মতো অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষ আইন রয়েছে। দেশটির ইমমোরাল ট্রাফিক প্রিভেনশন অ্যাক্টের আওতায় মানবপাচার ও যৌন শোষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। পাশাপাশি ভারতীয় ন্যায় সংহিতাতেও মানবপাচারসংক্রান্ত অপরাধের শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।
তবে কোনো ব্যক্তির কাছে বৈধ ভ্রমণসংক্রান্ত কাগজপত্র না থাকা এবং মানবপাচারের শিকার হওয়া দুটি পৃথক বিষয়। পাচারের শিকার নারীদের ক্ষেত্রে তাঁদের কীভাবে সীমান্ত পার করানো হয়েছে, কারা প্রতারণা করেছে এবং কীভাবে শোষণের শিকার হয়েছেন, সেসব বিষয় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বশেষ ঘটনায় উদ্ধার হওয়া ছয় নারীর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তাঁদের বয়স, বাংলাদেশের কোন এলাকার বাসিন্দা এবং দেশে ফেরানোর বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সে সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরুর বিষয়ে নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য সামনে আসেনি।
পুনের এই ঘটনায় তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। অভিযুক্ত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে ভারতে নারীদের নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় কারা জড়িত ছিলেন, তা খতিয়ে দেখার বিষয়টি সামনে এসেছে। উদ্ধার হওয়া নারীদের বক্তব্য ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পাচারচক্রের কার্যক্রম সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানা যেতে পারে।























