ঢাকা ০৬:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬, ৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো ক্ষেপণাস্ত্র নেই যুক্তরাষ্ট্রের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৩:১০:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
  • / 7

ইরানের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফের জড়ানোর মতো পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই। এমন সতর্কবার্তাই দিয়েছেন মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা। যদিও মধ্যপ্রাচ্যে আরও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করার পাশাপাশি ইরানের ওপর টানা দশম রাতের মতো হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। অবশ্য উভয় পক্ষই পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে।

প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ বলছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের বিরুদ্ধে আরও বিস্তৃত সামরিক অভিযান চালানোর বিভিন্ন অপশন বিবেচনা করছেন। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে আরও মার্কিন যুদ্ধবিমানও মোতায়েন করা হচ্ছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনা সম্পর্কে অবগত ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যাওয়ায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান সীমিত রাখতে হতে পারে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে তিনি বলেন, ‘নিরাপদভাবে দীর্ঘ সময় অভিযান চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র আমাদের নেই। আমার মনে হয়, হোয়াইট হাউস এ বাস্তবতা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নয়।’

এর মধ্যেই টানা দশম রাতের মতো ইরানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এই হামলা পুরো অঞ্চলটিকে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে মার্কিন হামলার জবাবে ইরানও সমগ্র অঞ্চলজুড়ে হামলা অব্যাহত রেখেছে। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা বাহরাইন, কুয়েতের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তেহরান আবারও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়েছে এবং ওয়াশিংটনকে এর পরিণতি মেনে নিতে হবে।

তবে এ উত্তেজনার মধ্যেও উভয় পক্ষই পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে। সোমবার (২০ জুলাই) ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, তেহরান মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রস্তাব পেয়েছে। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে হামলা চললেও ‘কূটনীতি তার দায়িত্ব পালন করছে এবং কোনও প্রচেষ্টাই বাদ দেয়া হচ্ছে না।’

এর আগে গত রোববার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ওয়াশিংটন আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, ‘আমরা একাধিকবার ইরানের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করেছি এবং ভবিষ্যতেও করব। আলোচনার দরজা খুললে আমরা তা স্বাগত জানাব।’

মূলত গত সপ্তাহে ইরানের হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনার জবাব হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র এই হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে সোমবার নিহত দুই মার্কিন সেনার পরিচয় প্রকাশ করা হয়। তারা হলেন হাওয়াইয়ের ইওয়া বিচের ২৫ বছর বয়সী ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট টাইলার জেমস ফিহান এবং টেক্সাসের ক্যারলটনের ১৯ বছর বয়সী প্রাইভেট ইসাবেলা গনজালেস।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানঘাঁটিতে ইরানের ছোড়া তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে সেনাদের আবাসন, একটি জিমনেসিয়াম এবং একটি খালি বিমান হ্যাঙ্গারে আঘাত হানে।

হামলার সময় ফিহান ও গনজালেস তাদের আবাসনে ছিলেন কি না, নাকি আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে নিহত হয়েছেন—তা স্পষ্ট নয়। ফিহানের কয়েক সপ্তাহ পর সাউদার্ন ইউটাহ ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ ডিগ্রি পাওয়ার কথা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাকে মরণোত্তর ডিগ্রি দেয়া হবে।

একইদিন রাতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, জর্ডানের ওই বিমানঘাঁটি থেকে মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সেটি নিখোঁজ তৃতীয় সেনার কি না, তা তখনও নিশ্চিত করা হয়নি। যদিও পরে ট্রাম্প বলেন, জর্ডানে নিহতের সংখ্যা ‘সম্ভবত’ তিনে পৌঁছেছে।

এর আগে গত সপ্তাহে জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ইরানের অন্য হামলাগুলোতে আরও কয়েক ডজন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, যুদ্ধ সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করার সরকারি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও ইরানের হামলায় আহত সেনাদের সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রকাশ করেনি পেন্টাগন।

এদিকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা নিয়েও দেশের ভেতরে ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ বাড়ছে। সর্বশেষ জনমত জরিপে দেখা গেছে, তার জনপ্রিয়তার হার ৩৭ শতাংশে স্থির রয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের জেরে দাম বাড়লেও অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন না যে জ্বালানির দাম শিগগিরই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে।

এমন অবস্থায় সোমবার ভোরে ইরানের বন্দর মাহশাহর, বন্দর ইমাম খোমেনি, তাবরিজ, চাবাহার ও কোনারাকে বিস্ফোরণের খবর প্রকাশ করে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। সেন্টকম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের ওপর হামলা চালানোর সক্ষমতা কমিয়ে দিতেই এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এ হামলার সময় পেন্টাগনের কর্মকর্তারা সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে কীভাবে প্রস্তুতি নেয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা করছিলেন বলে জানা গেছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, জার্মানি থেকে মার্কিন এফ-১৬ এবং যুক্তরাজ্য থেকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানও মোতায়েন করা হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জর্ডানে ইরানের হামলার আগেই এসব সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। এর আগে ট্রাম্প সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা জোরদারের পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতির পাশাপাশি ইরানের ভেতরে স্থল অভিযান চালানোর জন্যও যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত নয়। যদিও স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে ওয়াশিংটনের মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। মঙ্গলবার (২১ জুলাই) কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ও দেশটির সেনাবাহিনী। তাদের দাবি, রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন হ্যাঙ্গারসহ বিভিন্ন সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো এসব হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটির একটি এমকিউ-৯ ড্রোন হ্যাঙ্গারেও হামলা চালানো হয়েছে। এতে কয়েকটি ড্রোন ধ্বংস হয়েছে অথবা গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আইআরজিসি পরে দ্বিতীয় একটি বিবৃতি দিয়ে কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি করে। তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে বলা হয়, আহমেদ আল-জাবের ঘাঁটিতে আগাম সতর্কীকরণ রাডার, একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার ব্যবস্থা, একটি এফপিএস-১১৭ রাডার, একটি প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং একটি আকাশ প্রতিরক্ষা স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে।

এর আগে রোববার ইরানের কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করে, দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দারখোভিনে নির্মাণাধীন একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, তারা এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো খতিয়ে দেখছে।

সংস্থাটির মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি বলেন, এ ঘটনায় তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে না। একই সঙ্গে তিনি পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর আশপাশে সামরিক সংযম বজায় রাখার আহ্বানও পুনর্ব্যক্ত করেন।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার মতো ক্ষেপণাস্ত্র নেই যুক্তরাষ্ট্রের

আপডেট সময় : ০৩:১০:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

ইরানের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে ফের জড়ানোর মতো পর্যাপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে নেই। এমন সতর্কবার্তাই দিয়েছেন মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা। যদিও মধ্যপ্রাচ্যে আরও যুদ্ধবিমান মোতায়েন করার পাশাপাশি ইরানের ওপর টানা দশম রাতের মতো হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। অবশ্য উভয় পক্ষই পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে।

প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম টেলিগ্রাফ বলছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তেহরানের বিরুদ্ধে আরও বিস্তৃত সামরিক অভিযান চালানোর বিভিন্ন অপশন বিবেচনা করছেন। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে আরও মার্কিন যুদ্ধবিমানও মোতায়েন করা হচ্ছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনা সম্পর্কে অবগত ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দ্রুত কমে যাওয়ায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান সীমিত রাখতে হতে পারে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে তিনি বলেন, ‘নিরাপদভাবে দীর্ঘ সময় অভিযান চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত অস্ত্র আমাদের নেই। আমার মনে হয়, হোয়াইট হাউস এ বাস্তবতা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নয়।’

এর মধ্যেই টানা দশম রাতের মতো ইরানে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর এই হামলা পুরো অঞ্চলটিকে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের আরও কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে মার্কিন হামলার জবাবে ইরানও সমগ্র অঞ্চলজুড়ে হামলা অব্যাহত রেখেছে। দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা বাহরাইন, কুয়েতের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, তেহরান আবারও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়েছে এবং ওয়াশিংটনকে এর পরিণতি মেনে নিতে হবে।

তবে এ উত্তেজনার মধ্যেও উভয় পক্ষই পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত দিয়েছে। সোমবার (২০ জুলাই) ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, তেহরান মধ্যস্থতাকারীদের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রস্তাব পেয়েছে। এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে হামলা চললেও ‘কূটনীতি তার দায়িত্ব পালন করছে এবং কোনও প্রচেষ্টাই বাদ দেয়া হচ্ছে না।’

এর আগে গত রোববার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ওয়াশিংটন আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, ‘আমরা একাধিকবার ইরানের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করেছি এবং ভবিষ্যতেও করব। আলোচনার দরজা খুললে আমরা তা স্বাগত জানাব।’

মূলত গত সপ্তাহে ইরানের হামলায় তিন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনার জবাব হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র এই হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে সোমবার নিহত দুই মার্কিন সেনার পরিচয় প্রকাশ করা হয়। তারা হলেন হাওয়াইয়ের ইওয়া বিচের ২৫ বছর বয়সী ফার্স্ট লেফটেন্যান্ট টাইলার জেমস ফিহান এবং টেক্সাসের ক্যারলটনের ১৯ বছর বয়সী প্রাইভেট ইসাবেলা গনজালেস।

দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানঘাঁটিতে ইরানের ছোড়া তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে সেনাদের আবাসন, একটি জিমনেসিয়াম এবং একটি খালি বিমান হ্যাঙ্গারে আঘাত হানে।

হামলার সময় ফিহান ও গনজালেস তাদের আবাসনে ছিলেন কি না, নাকি আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে নিহত হয়েছেন—তা স্পষ্ট নয়। ফিহানের কয়েক সপ্তাহ পর সাউদার্ন ইউটাহ ইউনিভার্সিটি থেকে এমবিএ ডিগ্রি পাওয়ার কথা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাকে মরণোত্তর ডিগ্রি দেয়া হবে।

একইদিন রাতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, জর্ডানের ওই বিমানঘাঁটি থেকে মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সেটি নিখোঁজ তৃতীয় সেনার কি না, তা তখনও নিশ্চিত করা হয়নি। যদিও পরে ট্রাম্প বলেন, জর্ডানে নিহতের সংখ্যা ‘সম্ভবত’ তিনে পৌঁছেছে।

এর আগে গত সপ্তাহে জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে ইরানের অন্য হামলাগুলোতে আরও কয়েক ডজন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, যুদ্ধ সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করার সরকারি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও ইরানের হামলায় আহত সেনাদের সংখ্যা এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রকাশ করেনি পেন্টাগন।

এদিকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা নিয়েও দেশের ভেতরে ট্রাম্পের প্রতি অসন্তোষ বাড়ছে। সর্বশেষ জনমত জরিপে দেখা গেছে, তার জনপ্রিয়তার হার ৩৭ শতাংশে স্থির রয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের জেরে দাম বাড়লেও অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন না যে জ্বালানির দাম শিগগিরই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে।

এমন অবস্থায় সোমবার ভোরে ইরানের বন্দর মাহশাহর, বন্দর ইমাম খোমেনি, তাবরিজ, চাবাহার ও কোনারাকে বিস্ফোরণের খবর প্রকাশ করে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। সেন্টকম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের ওপর হামলা চালানোর সক্ষমতা কমিয়ে দিতেই এ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলা এ হামলার সময় পেন্টাগনের কর্মকর্তারা সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে কীভাবে প্রস্তুতি নেয়া হবে, তা নিয়ে আলোচনা করছিলেন বলে জানা গেছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, জার্মানি থেকে মার্কিন এফ-১৬ এবং যুক্তরাজ্য থেকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হচ্ছে। পাশাপাশি আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানও মোতায়েন করা হচ্ছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জর্ডানে ইরানের হামলার আগেই এসব সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। এর আগে ট্রাম্প সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা জোরদারের পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতির পাশাপাশি ইরানের ভেতরে স্থল অভিযান চালানোর জন্যও যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত নয়। যদিও স্থল অভিযান চালানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেননি ট্রাম্প।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর হামলার জবাবে উপসাগরীয় অঞ্চলে ওয়াশিংটনের মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। মঙ্গলবার (২১ জুলাই) কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ও দেশটির সেনাবাহিনী। তাদের দাবি, রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন হ্যাঙ্গারসহ বিভিন্ন সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো এসব হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটির একটি এমকিউ-৯ ড্রোন হ্যাঙ্গারেও হামলা চালানো হয়েছে। এতে কয়েকটি ড্রোন ধ্বংস হয়েছে অথবা গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আইআরজিসি পরে দ্বিতীয় একটি বিবৃতি দিয়ে কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি করে। তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে বলা হয়, আহমেদ আল-জাবের ঘাঁটিতে আগাম সতর্কীকরণ রাডার, একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার ব্যবস্থা, একটি এফপিএস-১১৭ রাডার, একটি প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং একটি আকাশ প্রতিরক্ষা স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে।

এর আগে রোববার ইরানের কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করে, দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দারখোভিনে নির্মাণাধীন একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালিয়েছে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, তারা এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনগুলো খতিয়ে দেখছে।

সংস্থাটির মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি বলেন, এ ঘটনায় তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে না। একই সঙ্গে তিনি পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর আশপাশে সামরিক সংযম বজায় রাখার আহ্বানও পুনর্ব্যক্ত করেন।