অক্টোবরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা

- আপডেট সময় : ১১:০৩:০৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
- / 0
বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আবারও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। সরকারি হিসাবে, চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ২৫৬ জনে পৌঁছেছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৮২ হাজার ৭০০।
গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এক হাজার ৬০৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শনিবার (৩ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোলরুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গুবিষয়ক এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এতথ্য জানানো হয়।
এতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মধ্যে বরিশাল বিভাগে ২৫ ১জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩১৯ জন, ঢাকা বিভাগে সিটি করপোরেশনের বাইরে ৩১৩ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৭১ জন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২২৩ জন, খুলনা বিভাগে ২৭৬ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ৭৯ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৩২ জন, রংপুর বিভাগে ৬২ জন রয়েছেন।
চলতি বছরের ৩ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮৪ হাজার ৩৬৯ জন। চলতি বছরে এ যাবত মোট ৭৮ হাজার ৪৮২ জন ডেঙ্গুরোগী হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন।
গত ২৪ ঘণ্টায় ছাড়পত্র পেয়েছে এক হাজার ৬২১ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরে এযাবৎ ডেঙ্গুতে সারাদেশে মোট ২৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ দুই হাজার ৮৬১ জন এবং ডেঙ্গুতে মোট ৪১৩ জনের মৃত্যু হয়।
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন এবং ডেঙ্গুতে মোট ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়।
২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট এক হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়। পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন মোট তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে সেপ্টেম্বরের পরিস্থিতি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুতে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন। বছরের অন্য মাসগুলোর তুলনায় সেপ্টেম্বরেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল।
চলতি বছরের শুরু থেকে মে মাস পর্যন্ত ডেঙ্গুতে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছিল। এরপর জুনে ১৩ জন, জুলাইয়ে ৩৬ জন এবং আগস্টে ৪৩ জন মারা যান। সেপ্টেম্বরে এক লাফে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪৮ জনে। এর ফলে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট ৮২ হাজার ৭৬১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৭৬ হাজার ৮৬২ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন আক্রান্তদের মধ্যে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
বিশেষ করে চট্টগ্রাম অঞ্চলেও ডেঙ্গুর চাপ রয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৩৩ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা ওই দিনের বিভাগভিত্তিক হিসাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো আবহাওয়া। সাম্প্রতিক বৃষ্টি ও পরিবর্তিত আবহাওয়ার কারণে এডিস মশার প্রজননের পরিবেশ দীর্ঘায়িত হতে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশারের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, পূর্বাভাস অনুযায়ী অক্টোবরেও ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি এডিস মশার প্রজননের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। বৃষ্টির পর মশার প্রজনন এবং মানুষের মধ্যে সংক্রমণ বাড়তে কিছুটা সময় লাগতে পারে। ফলে সেপ্টেম্বরের বৃষ্টির প্রভাব অক্টোবরেও ডেঙ্গুর সংক্রমণে দেখা যেতে পারে।
এডিস মশা শুধু বড় শহরকেন্দ্রিক সমস্যা নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় এর বিস্তার ঘটেছে বলেও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। তাই শুধু রাস্তা বা এলাকায় কীটনাশক ছিটানোর ওপর নির্ভর না করে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার ওপর জোর দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি দ্রুত সরিয়ে ফেলা, ফুলের টব, ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র ও অন্যান্য জায়গায় পানি জমতে না দেওয়া ডেঙ্গু প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একই সঙ্গে জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাসও পরিস্থিতির গুরুত্ব বোঝায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রেকর্ড অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল এবং ওই বছর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ৩ লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য খাতে নতুন করে সতর্কতা তৈরি হয়েছে।
তবে চলতি বছরের ২৫০ মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এটি ২ অক্টোবর পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সরকারি হিসাবে পাওয়া সংখ্যা। তাই পরবর্তী স্বাস্থ্য বুলেটিনে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা পরিবর্তিত হতে পারে।
এদিকে একই সময়ে বাংলাদেশে আরেকটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে হাম পরিস্থিতিও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করছে। রয়টার্স জানিয়েছে, চলতি বছরে হামের নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা ২১ হাজারের বেশি এবং সন্দেহভাজন বা হামসদৃশ অসুস্থতায় চিকিৎসা নেওয়া মানুষের সংখ্যা আরও অনেক বেশি। ফলে একই সময়ে একাধিক রোগের চাপ সামলাতে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
অক্টোবর বাংলাদেশের জন্য ডেঙ্গু মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ সময় হয়ে উঠেছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক পর্যায়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা এবং জ্বরসহ ডেঙ্গুর সম্ভাব্য উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়াই সংক্রমণ ও গুরুতর জটিলতা কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।





















