ফ্রান্সে দাঙ্গা ঠেকাতে কারফিউ, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উত্তাল ইউরোপ

- আপডেট সময় : ১২:১০:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
- / 1
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট ও সরকারি সেবার অবনতির প্রতিবাদে চলমান বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেওয়ায় ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে রাতের কারফিউ জারি করা হয়েছে। রাজধানী প্যারিসের কয়েকটি এলাকা ছাড়াও নিস, লিল ও মার্সেইয়ে জনসমাগম ও বিক্ষোভের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। গত সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের সময় দোকানপাটে লুটপাট, সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে ফরাসি সরকার। একই সময়ে ইতালিসহ ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু সোমবার জরুরি বৈঠকের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার অঙ্গীকার করেন। তাঁর আহ্বানের পর কয়েকটি শহরে রাতের কারফিউ এবং জনসমাগমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। লিল, দুয়ে, ওয়াতিনিয়ে ও দেনাঁ শহরে স্থানীয় মেয়রদের সম্মতিতে কারফিউ জারি করা হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের সূত্র জানিয়েছে। নিসে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রাতের কারফিউ কার্যকর করা হয়েছে। মার্সেইয়ে বিক্ষোভ ও জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্যারিসের কয়েকটি এলাকায় রাত ৮টা থেকে বিক্ষোভের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং প্লাস দ্য লা রিপুবলিক ও লে আল এলাকায় রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়েছে। তবে পুরো প্যারিসে একযোগে কারফিউ জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
ফ্রান্সের বিচারমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ জানিয়েছেন, সহিংসতা, লুটপাট এবং সরকারি স্থাপনা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করতে মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তি, অবস্থান নির্ণয়ের তথ্য এবং টেলিফোনে আড়িপাতার মতো তদন্তপদ্ধতি ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ হেফাজতের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টা পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু বলেছেন, আপাতত পুরো দেশে জরুরি অবস্থা জারির পরিবর্তে নির্দিষ্ট এলাকায় বিধিনিষেধ আরোপ করাই বেশি উপযুক্ত। তাঁর অভিযোগ, উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোর কেউ কেউ রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
গত শনিবারের বিক্ষোভে ফ্রান্সজুড়ে দুই হাজারের বেশি মানুষ গ্রেপ্তার হন এবং প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য আহত হন বলে দ্য ইনডিপেনডেন্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজধানীতে বিক্ষোভ চলাকালে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়। মার্সেইয়ের মেয়র বেনোয়া পায়ান পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, শহরের বিভিন্ন এলাকায় দোকানের কাচ ভাঙা হয়েছে এবং বহু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট চালানো হয়েছে। প্যারিসের বিলাসবহুল দোকানপাটের এলাকাতেও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ডিওর, রোলেক্স, লুই ভুইতো, রালফ লরেন ও গুচির কয়েকটি দোকানের সামনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।
ফ্রান্সে চলমান আন্দোলন শুরু হয়েছিল মূলত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকস্বল্পতা, শ্রেণিকক্ষের দুরবস্থা ও শিক্ষা খাতে সংকটের প্রতিবাদ থেকে। পরে জীবনযাত্রার ব্যয়, আয় ও ব্যয়ের অসামঞ্জস্য এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ এতে যুক্ত হয়। আন্দোলনকারীদের আয়োজকেরা আগামী শনিবার নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, গত সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে প্রায় আট লাখ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন এবং তাঁরা প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর পদত্যাগও দাবি করছেন। তবে ফরাসি কর্তৃপক্ষের হিসাবে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার। আন্দোলনের মধ্যে মাখোঁর মধ্যপ্রাচ্য সফর নিয়েও সমালোচনা হয়েছে।
ইতালিতেও বিক্ষোভের পর নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। মিলানে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি সেবার অবনতির প্রতিবাদে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ এবং দোকানপাটে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির সরকার অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের অনুমোদন দিয়েছে। ইতালির উপপ্রধানমন্ত্রী মাত্তেও সালভিনি মিলানে ৫০০ সেনা পাঠানোর কথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের জমায়েত নিষিদ্ধ করা, অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে প্রতিরোধমূলক আটক বাড়ানো এবং সম্পত্তির ক্ষতিসাধনে জড়িতদের পরে গ্রেপ্তারের মতো ব্যবস্থা বিবেচনা করা হচ্ছে।
ফ্রান্স ও ইতালির বাইরে পর্তুগাল, স্পেন ও আলবেনিয়াতেও বিভিন্ন দাবিতে বিক্ষোভ চলছে। পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে গত শনিবার কয়েক দশ হাজার মানুষ মিছিল করেন। স্পেনে আবাসন সংকট ও ভাড়া বৃদ্ধির প্রতিবাদে কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন চলছে। আলবেনিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, উচ্চ শিক্ষাব্যয় ও দুর্নীতির অভিযোগে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। সার্বিয়াতেও শিক্ষার্থী আন্দোলনকারীদের নেতৃত্বে বড় সমাবেশের প্রস্তুতি চলছে। এসব দেশে আন্দোলনের কারণ ভিন্ন হলেও মূল্যস্ফীতি, আবাসনের ব্যয়, শিক্ষা ও সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ একটি সাধারণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
এদিকে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর ফ্রান্সের সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, দেশটিতে একই ধরনের ঘটনা ঘটলে জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও সম্পদ রয়েছে। সরকারের বক্তব্য, গণতন্ত্রে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা সহিংসতা বা ভাঙচুরের বৈধতা দেয় না। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নতুন বিক্ষোভের ডাক আসায় পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, এখন সেদিকেই নজর রাখছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সূত্র: দ্য ইনডিপেনডেন্ট, রয়টার্স।





















