আফ্রিকার একটির পিঁপড়ার দাম ২৮০০০ টাকা?

- আপডেট সময় : ১১:১১:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 172
কেনিয়ার নাইরোবির আদালত প্রাঙ্গণে সম্প্রতি জব্দ হওয়া পাঁচ হাজার জীবিত পিঁপড়ার চালান চমকের সৃষ্টি করেছে। ঘাসভূমিতে জন্মানো এই ‘জায়ান্ট হারভেস্টার অ্যান্ট’ (Giant Harvester Ant)—একটির দাম ২৮,০০০ টাকা (২৩৩ ডলারের বেশি)। হাতির দাঁত বা গন্ডারের শিংয়ের মতো প্রচলিত মূল্যবান সামগ্রী নয়, তবু আন্তর্জাতিক চোরাচালানের (International Smuggling) নতুন শিকারের মধ্যে এটি উঠে এসেছে।
গত বছরের এপ্রিলে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবি থেকে ইউরোপে পাচারের পথে ধরা পড়ে ২ হাজার ২৪৪টি টেস্টটিউবে ভরা এই পিঁপড়া। গ্রেপ্তার হন দুই বেলজিয়ান তরুণ, এক ভিয়েতনামি নাগরিক ও তাদের এক কেনিয়ান সহযোগী। স্থানীয় হিসাবে জব্দকৃত পিঁপড়ার দাম প্রায় ৯ হাজার ৩০০ ডলার হলেও ইউরোপের বাজারে পৌঁছালে এই চালানের মূল্য দাঁড়াতো প্রায় এক মিলিয়ন ডলারের (Million Dollar Shipment) কাছাকাছি বলে বিশেষজ্ঞ ধারণা করেছেন।
‘জায়ান্ট হারভেস্টার অ্যান্ট’ মূলত কেনিয়া ও পূর্ব আফ্রিকার কয়েকটি অঞ্চলে পাওয়া যায়। এরা পরিচিত ‘বীজ সংগ্রাহক’ হিসেবে পরিচিত। ঘাস ও শস্যের বীজ কুড়িয়ে এনে মাটির নিচে বিশাল বাসা তৈরি করে সংরক্ষণ করে। এই বীজ থেকেই তারা তৈরি করে বিশেষ খাদ্য, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন ‘অ্যান্ট ব্রেড’।
ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা: বেড়েছে স্বর্ণের দাম
এর মধ্যে সবচেয়ে মূল্যবান হলো রানী পিঁপড়া (Queen Ant)। একটি কলোনি গড়ে উঠতে রানী অপরিহার্য। এই রানী পিঁপড়া আয়ুষ্কাল (Lifespan) ১৫ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে। এই রানীই পুরো কলোনির জন্মদাত্রী হয়ে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে একেকটি রানীর পিঁপড়ার দাম ১৩০ থেকে ২৩৩ ডলার পর্যন্ত (২৮ হাজার টাকার বেশি)। ব্রিটেনে খুচরা বিক্রেতাদের গড় হিসাবে দাম ধরা হয় প্রায় ২৩৩ ডলার।
ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় ‘অ্যান্ট-কিপিং’ (Ant-keeping) এখন তাদের ‘নতুন শখ’ (New Hobby)। যার জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। স্বচ্ছ পাত্র বা ফর্মিকারিয়ামে (Formicarium) পিঁপড়ার বাসা বানিয়ে তাদের জীবনযাপন দেখেন শৌখিন সংগ্রাহকেরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণাগারেও (Research Labs) এই পিঁপড়ার কদর সম্প্রতিতে বেড়েছে। বড় আকার, চকচকে মেহগনি রঙ আর শক্তিশালী কর্মী পিঁপড়ার কারণে জায়ান্ট হারভেস্টার অ্যান্ট হয়ে উঠেছে প্রদর্শনযোগ্য প্রজাতি।
কিন্তু কেনিয়ার বন্যপ্রাণী আইনে (Wildlife Law) এই পিঁপড়া বেচাকেনা নিষিদ্ধ। ফলে বৈধ পথে রপ্তানি প্রায় অসম্ভব। নিষেধাজ্ঞাই উল্টো চোরাচালানকে আরও লাভজনক করে তুলেছে।
পাচার চক্রটি সাধারণত বর্ষার পর রাতে রানী পিঁপড়া ধরে। প্রতিটি রানী আলাদা টেস্টটিউবে ভরে সামান্য খাবার ও আর্দ্র তুলা দেয়া হয়। এরপর লাগেজে লুকিয়ে বিমানবন্দর পার করে কিংবা কুরিয়ারে ‘বৈজ্ঞানিক নমুনা’ (Scientific Samples) নামে পাঠানো হয়। ইউরোপে পৌঁছে অনলাইন ফোরাম ও স্পেশাল দোকানে বিক্রি হয় এসব পিঁপড়া। একটি চালানে খরচ পড়ে কয়েক হাজার ডলার, আর বিক্রি হলে লাভ হয় প্রায় দশ গুণের বেশি।
বিজ্ঞানীদের মতে, হাজার হাজার রানী পিঁপড়া তুলে নেয়া মানে একটি অঞ্চলের ভবিষ্যৎ কলোনির (Future Colony) সম্ভাবনা ধ্বংস করা। এতে বীজ ছড়ানোর প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়, মাটির উর্বরতা কমে এবং পুরো বাস্তুতন্ত্রে (Ecosystem) ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। দীর্ঘমেয়াদে প্রজাতির জিনগত বৈচিত্র্যও কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইন্টারপোল (Interpol) ও কনভেনশন অন ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইন এনডেঞ্জার্ড স্পিসিজ অব ওয়াইল্ড ফণা অ্যান্ড ফ্লোরা-সিআইটিইএস’র (CITES) মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে সহযোগিতা জোরদার করা না গেলে এ ধরনের অপরাধ ঠেকানো কঠিন হবে।
আকার ও ধরন: রানী ১৮-২০ মিমি এবং শ্রমিকরা ৫-১৪ মিমি (মেজররা ১৮ মিমি পর্যন্ত) হয়। Messor cephalotes বিশ্বের বৃহত্তম হারভেস্টার পিঁপড়াগুলোর মধ্যে একটি।
বাসস্থান: মরুভূমি বা শুষ্ক অঞ্চলে এরা মাটির নিচে গভীর বাসা তৈরি করে। বাসাগুলো ২-৪ মিটার চওড়া হতে পারে।
খাদ্যাভ্যাস: ৭০ শতাংশ খাবার হলো বীজ, এছাড়া শর্করাযুক্ত পানি এবং প্রোটিন হিসেবে ছোট পোকামাকড় খায়।
আচরণ ও হুল: এরা অত্যন্ত সংগঠিত এবং তাদের হুল অত্যন্ত বেদনাদায়ক হতে পারে। Maricopa harvester ants-এর হুল পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বিষাক্ত পোকামাকড়ের হুলের অন্যতম।
পেশাদার প্রতিপালন: এরা অ্যাক্রাইলিক বা প্রাকৃতিক নেস্টে (ants farm) থাকতে পছন্দ করে। তাপমাত্রা ২১-২৮°C এবং আর্দ্রতা ৫০-৭০%-এর মধ্যে রাখা প্রয়োজন।
এদিকে কেনিয়া সরকার পিঁপড়া পাচারকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে নতুন আইন প্রণয়নের চিন্তা করছে। পাশাপাশি বৈধ প্রজনন খামার (Legal Breeding Farms) গড়ে তোলার প্রস্তাব উঠেছে, যাতে নিয়ন্ত্রিতভাবে পিঁপড়া উৎপাদন করে রপ্তানি করা যায় এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী আর্থিকভাবে লাভবান হয়।
জায়ান্ট হারভেস্টার অ্যান্ট শুধু একটি পিঁপড়া নয়—এটি আফ্রিকার বাস্তুতন্ত্রের নীরব রক্ষক। বীজ সংগ্রহ, মাটি খনন আর জটিল সামাজিক কাঠামোর (Social Structure) মাধ্যমে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে তারা। কিন্তু মানুষের লোভ এই ক্ষুদ্র প্রাণীকেও আন্তর্জাতিক পাচারের শিকারে পরিণত করেছে।
প্রকৃতিতে কোনো প্রাণীই ছোট নয়। একটি রানী পিঁপড়া মানে একটি ভবিষ্যৎ কলোনি, একটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র। সেই বাস্তবতা ভুলে গেলে ক্ষতি হবে শুধু কেনিয়ার নয়, গোটা পৃথিবীর।






















