ঢাকা ০৯:১৮ পূর্বাহ্ন, রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানযুদ্ধ থামাতে ব্যাকুল ট্রাম্প, সুযোগ দেবে না ইরান!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৪:০৭:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬
  • / 67

গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে থমকে থাকা যুদ্ধাবস্থায় আর ফিরে না যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই। দুই দেশের মধ্যে চলমান পারস্পরিক সামরিক হামলা সত্ত্বেও পাকিস্তান, কাতার ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরিচালিত শান্তি আলোচনা এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী নৌ ও বিমানবাহিনী ইরানের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। ইরানও তাদের বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রেখে যুদ্ধবিরতির এই সময়টাকে ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার কাজে ব্যবহার করছে। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের এই সশস্ত্র উত্তেজনা দুই পক্ষের মধ্যেই যেকোনো সময় বড় ধরনের ভুল হিসাব-নিকাশের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র কাছাকাছি অবস্থান করে তাদের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে তেহরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ইরানিরাও তাদের প্রতিরোধের দৃঢ়তা বজায় রেখে মার্কিন ঘাঁটি এবং আরব উপসাগরের অবকাঠামোতে পাল্টা আঘাতের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বড় চুক্তিতে পৌঁছানোর দীর্ঘ ও কঠিন পথের প্রথম লক্ষ্য হলো বর্তমান যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং পরবর্তী আলোচনার এজেন্ডা নির্ধারণে একটি ‘সমঝোতা স্মারক’ তৈরি করা। তবে লেবাননের বৈরুতে পুনরায় বোমাবর্ষণের বিষয়ে ইসরায়েলের ঘোষণা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পথকে আরও সংকীর্ণ করে দিয়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তিকে ব্যাহত করতে মোটেও দ্বিধাবোধ করছেন না, কারণ তিনি শুরু থেকেই এই যুদ্ধবিরতির বিপক্ষে ছিলেন। তাঁর মতে আমেরিকার সাথে ইরানের যেকোনো চুক্তিই একটি খারাপ চুক্তি।

ইরান তাদের মিত্র হিজবুল্লাহকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে এবং স্পষ্ট জানিয়েছে যে মার্কিন চুক্তিতে ইসরায়েলি অভিযানের অবসান অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আপাতত ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন।

এদিকে, হরমুজ প্রণালী পুনর্খোলার বিষয়ে আলোচনার প্রাথমিক শর্ত হিসেবে ইরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা তাদের জব্দকৃত সম্পদ ছাড় দেওয়ার মতো বড় মূল্য দাবি করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি বন্ধ করে দেয়, যার ফলে বর্তমানে সেখান দিয়ে নামমাত্র বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করছে।

সৌদি আরব তাদের লোহিত সাগরের বন্দর দিয়ে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ওমান উপসাগরের উপকূলীয় টার্মিনাল দিয়ে কিছু তেল সরবরাহ করছে। তা সত্ত্বেও বিশ্ববাজার ইতিমধ্যে তাদের স্বাভাবিক তেল ও গ্যাসের ২০ শতাংশ সরবরাহ হারিয়েছে।

এই প্রণালী বন্ধ থাকা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি উপসাগরীয় তেলের ওপর নির্ভরশীল নয়, তবুও তাদের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের ওপরই নির্ধারিত হয়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন এক বড় উভ সংকটের মুখোমুখি। সহজে জয়লাভের ভুল ধারণা থেকে শুরু করা এই যুদ্ধের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে তাঁকে। ট্রাম্প এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র নেতানিয়াহু মারাত্মকভাবে অবমূল্যায়ন করেছিলেন যে, ইসলামি এই শাসনব্যবস্থা কতটা শক্তভাবে তাদের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে সক্ষম।

প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে টিকে থাকা এই ইরান সরকারকে শুধু বিমান হামলা দিয়ে উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়, তা এখন স্পষ্ট। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ এখন অত্যন্ত অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং নতুন করে উত্তেজনা বাড়লে তা ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান আরও দুর্বল করবে।

কিন্তু হরমুজ প্রণালী খোলার জন্য ইরানকে যে ছাড় দিতে হবে, তা ট্রাম্পের নিজের রিপাবলিকান পার্টির কট্টরপন্থীরা মেনে নিতে রাজী নয়। আবার ট্রাম্প নিজেও কোনো চুক্তিতে ২০১৫ সালের ওবামা প্রশাসনের পারমাণবিক চুক্তির চেয়ে নিজেকে ছোট করে দেখাতে চান না।

এই যুদ্ধের ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের ধনী আরব দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তাদের ব্যবসা ও উন্নয়নের মডেল মূলত এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল, যা এই যুদ্ধের কারণে বড় ধাক্কা খেয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে কাতার ও পাকিস্তান মধ্যস্থতা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করে তাদের দেশে ‘আয়রন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে।

পাশাপাশি সৌদি আরবও ইরানের হামলার জবাবে পাল্টা আঘাত হানলেও তারা তেহরানকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা মার্কিন-ইসরায়েল জোটের অংশ হয়ে নয়, বরং স্বাধীনভাবে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। দিনশেষে, বিমান শক্তি দিয়ে ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে ফেলার যে ভুল হিসাব নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প করেছিলেন, তার খেসারত এখন দুই দেশসহ পুরো বিশ্বকে দিতে হচ্ছে। সূত্র: বিবিসি

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

ইরানযুদ্ধ থামাতে ব্যাকুল ট্রাম্প, সুযোগ দেবে না ইরান!

আপডেট সময় : ০৪:০৭:৩৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২ জুন ২০২৬

গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে থমকে থাকা যুদ্ধাবস্থায় আর ফিরে না যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই। দুই দেশের মধ্যে চলমান পারস্পরিক সামরিক হামলা সত্ত্বেও পাকিস্তান, কাতার ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরিচালিত শান্তি আলোচনা এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী নৌ ও বিমানবাহিনী ইরানের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। ইরানও তাদের বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রেখে যুদ্ধবিরতির এই সময়টাকে ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার কাজে ব্যবহার করছে। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলের এই সশস্ত্র উত্তেজনা দুই পক্ষের মধ্যেই যেকোনো সময় বড় ধরনের ভুল হিসাব-নিকাশের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র কাছাকাছি অবস্থান করে তাদের ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে তেহরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ইরানিরাও তাদের প্রতিরোধের দৃঢ়তা বজায় রেখে মার্কিন ঘাঁটি এবং আরব উপসাগরের অবকাঠামোতে পাল্টা আঘাতের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি বড় চুক্তিতে পৌঁছানোর দীর্ঘ ও কঠিন পথের প্রথম লক্ষ্য হলো বর্তমান যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং পরবর্তী আলোচনার এজেন্ডা নির্ধারণে একটি ‘সমঝোতা স্মারক’ তৈরি করা। তবে লেবাননের বৈরুতে পুনরায় বোমাবর্ষণের বিষয়ে ইসরায়েলের ঘোষণা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পথকে আরও সংকীর্ণ করে দিয়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই চুক্তিকে ব্যাহত করতে মোটেও দ্বিধাবোধ করছেন না, কারণ তিনি শুরু থেকেই এই যুদ্ধবিরতির বিপক্ষে ছিলেন। তাঁর মতে আমেরিকার সাথে ইরানের যেকোনো চুক্তিই একটি খারাপ চুক্তি।

ইরান তাদের মিত্র হিজবুল্লাহকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে এবং স্পষ্ট জানিয়েছে যে মার্কিন চুক্তিতে ইসরায়েলি অভিযানের অবসান অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আপাতত ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছেন।

এদিকে, হরমুজ প্রণালী পুনর্খোলার বিষয়ে আলোচনার প্রাথমিক শর্ত হিসেবে ইরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা তাদের জব্দকৃত সম্পদ ছাড় দেওয়ার মতো বড় মূল্য দাবি করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি বন্ধ করে দেয়, যার ফলে বর্তমানে সেখান দিয়ে নামমাত্র বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করছে।

সৌদি আরব তাদের লোহিত সাগরের বন্দর দিয়ে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) ওমান উপসাগরের উপকূলীয় টার্মিনাল দিয়ে কিছু তেল সরবরাহ করছে। তা সত্ত্বেও বিশ্ববাজার ইতিমধ্যে তাদের স্বাভাবিক তেল ও গ্যাসের ২০ শতাংশ সরবরাহ হারিয়েছে।

এই প্রণালী বন্ধ থাকা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বিপর্যয় ডেকে আনছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি উপসাগরীয় তেলের ওপর নির্ভরশীল নয়, তবুও তাদের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের ওপরই নির্ধারিত হয়।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন এক বড় উভ সংকটের মুখোমুখি। সহজে জয়লাভের ভুল ধারণা থেকে শুরু করা এই যুদ্ধের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে তাঁকে। ট্রাম্প এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র নেতানিয়াহু মারাত্মকভাবে অবমূল্যায়ন করেছিলেন যে, ইসলামি এই শাসনব্যবস্থা কতটা শক্তভাবে তাদের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে সক্ষম।

প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে টিকে থাকা এই ইরান সরকারকে শুধু বিমান হামলা দিয়ে উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়, তা এখন স্পষ্ট। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ এখন অত্যন্ত অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এবং নতুন করে উত্তেজনা বাড়লে তা ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান আরও দুর্বল করবে।

কিন্তু হরমুজ প্রণালী খোলার জন্য ইরানকে যে ছাড় দিতে হবে, তা ট্রাম্পের নিজের রিপাবলিকান পার্টির কট্টরপন্থীরা মেনে নিতে রাজী নয়। আবার ট্রাম্প নিজেও কোনো চুক্তিতে ২০১৫ সালের ওবামা প্রশাসনের পারমাণবিক চুক্তির চেয়ে নিজেকে ছোট করে দেখাতে চান না।

এই যুদ্ধের ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের ধনী আরব দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। তাদের ব্যবসা ও উন্নয়নের মডেল মূলত এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল, যা এই যুদ্ধের কারণে বড় ধাক্কা খেয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে কাতার ও পাকিস্তান মধ্যস্থতা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করে তাদের দেশে ‘আয়রন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে।

পাশাপাশি সৌদি আরবও ইরানের হামলার জবাবে পাল্টা আঘাত হানলেও তারা তেহরানকে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা মার্কিন-ইসরায়েল জোটের অংশ হয়ে নয়, বরং স্বাধীনভাবে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। দিনশেষে, বিমান শক্তি দিয়ে ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে ফেলার যে ভুল হিসাব নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প করেছিলেন, তার খেসারত এখন দুই দেশসহ পুরো বিশ্বকে দিতে হচ্ছে। সূত্র: বিবিসি