মাইক্রোপ্লাস্টিকের অদৃশ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি, কী বলছে গবেষণা?
- আপডেট সময় : ০১:৫২:৫২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬
- / 9
চোখে দেখা যায় না, স্পর্শেও বোঝা যায় না—এমন ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাই নীরবে প্রবেশ করছে মানুষের শরীরে। গবেষকদের ভাষায়, এসব কণার নাম মাইক্রোপ্লাস্টিক। খাবার, পানীয় ও শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত শরীরে প্রবেশ করা এই কণাগুলো রক্ত, ফুসফুস, হৃদ্যন্ত্র, এমনকি হাড় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় ইঙ্গিত মিলেছে, ভবিষ্যতে এটি বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের আকার ৫ মিলিমিটারের কম। এতটাই ক্ষুদ্র যে খালি চোখে দেখা যায় না। অনেক সময় এগুলো মাটি, পানি কিংবা খাবারের সঙ্গে মিশে থাকলেও সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।
লন্ডনের উত্তরের হার্টফোর্ডশায়ারে ১৮৪৩ সালে শুরু হয় বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন কৃষি গবেষণা। ভিক্টোরীয় জমিদার জন বেনেট লজেস গমের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এই গবেষণার সূচনা করেন। সে সময় সংগৃহীত গম, খড় ও মাটির নমুনা বোতলে সংরক্ষণ করা হয়েছিল, যা বর্তমানে হারপেনডেনের রথমস্টেড রিসার্চ কেন্দ্রে সংরক্ষিত রয়েছে।
১৮০ বছরের বেশি সময় ধরে সংরক্ষিত এসব নমুনা পৃথিবীর পরিবেশে মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাবের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করছে।
বর্তমানে গবেষণাগারের দায়িত্বে রয়েছেন অ্যান্ডি ম্যাকডোনাল্ড, যিনি ‘কিপার অব দ্য বটলস’ নামে পরিচিত। তিনি জানান, ১৯৪০ ও ১৯৫০-এর দশকের নমুনায় পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার কারণে তেজস্ক্রিয় উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। পাশাপাশি এসব নমুনাতেই প্রথমবারের মতো মাইক্রোপ্লাস্টিকের অস্তিত্বও শনাক্ত হয়।
একটি বহুল আলোচিত গবেষণায় বলা হয়েছে, একজন মানুষ বছরে গড়ে প্রায় ৫২ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গ্রহণ করেন। যদিও এ সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবে গবেষকদের মতে, মানুষের শরীরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এসব কণা খাবার, পানি ও বাতাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে এবং লালা, রক্ত, কফ, বুকের দুধ, যকৃত, কিডনি, প্লীহা, মস্তিষ্ক ও হাড়েও শনাক্ত হয়েছে।
প্লাস্টিক চ্যালেঞ্জ ট্রায়াল
২০২৫ সালের শুরুতে লন্ডনে আটজন স্বেচ্ছাসেবীকে নিয়ে প্রথমবারের মতো ‘প্লাস্টিক চ্যালেঞ্জ ট্রায়াল’ পরিচালনা করা হয়। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের গবেষক স্টেফানি রাইটের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা পরীক্ষামূলকভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক মিশ্রিত দ্রবণ পান করেন।
গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল, গরম পানি দিয়ে প্লাস্টিকের প্যাকেট বা বোতল ব্যবহারের ফলে মানবদেহে কী পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করে, তা নির্ণয় করা।
পরীক্ষার সময় প্রতি ঘণ্টায় অংশগ্রহণকারীদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হয়, যাতে রক্তপ্রবাহে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের মাত্রা নির্ধারণ করা যায়। গবেষণার ফলাফল ২০২৫ সালের শেষ দিকে প্রকাশের কথা রয়েছে।
স্টেফানি রাইট বলেন, প্লাস্টিকে মোড়ানো টি-ব্যাগে চা তৈরি করা কিংবা প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার গরম করার মতো দৈনন্দিন অভ্যাসও শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের অন্যতম উৎস। তার মতে, মানবদেহ এসব কণা ভাঙতে পারে না। ফলে এগুলো জমতে জমতে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ এবং বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য
২০২৪ সালে চীনের একটি গবেষণায় মানুষের হাড় ও পেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। গবেষকদের ধারণা, এটি হাড় ও পেশির কোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে এবং শারীরিক সক্ষমতাও কমিয়ে দিতে পারে।
ইতালির এক গবেষণায় হৃদ্যন্ত্রে রক্ত সরবরাহকারী ধমনীতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, যাদের ধমনীতে এসব কণা ছিল, তাদের হৃদরোগ, স্ট্রোক বা আকস্মিক মৃত্যুর ঝুঁকি ৪ দশমিক ৫ গুণ বেশি।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত এক গবেষণায় মৃত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়। যাদের ডিমেনশিয়া ছিল, তাদের মস্তিষ্কে অন্যদের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের গবেষক ম্যাথিউ ক্যাম্পেনের ধারণা, এসব কণা চর্বির সঙ্গে মিশে মস্তিষ্কে প্রবেশ করতে পারে, বিশেষ করে ডিমেনশিয়ায় আক্রান্তদের ক্ষেত্রে।
তবে গবেষকেরা এখনো মাইক্রোপ্লাস্টিককে ডিমেনশিয়া বা হৃদরোগের সরাসরি কারণ হিসেবে উল্লেখ করছেন না। তাদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে এসব কণা বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
নানা ধরনের প্রভাব
গবেষণায় দেখা গেছে, এক লিটার বোতলজাত পানিতে প্রায় দুই লাখ ৪০ হাজার পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা থাকতে পারে। এর মধ্যে নাইলন, পলিস্টাইরিনসহ বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক রয়েছে।
অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ভারেনা পিচলার বলেন, ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ শব্দটি এসব কণার জটিলতা পুরোপুরি বোঝাতে পারে না। কারণ প্রতিটি কণার রাসায়নিক গঠন আলাদা এবং শরীরের সঙ্গে প্রতিক্রিয়াও ভিন্ন।
তিনি জানান, মাইক্রোপ্লাস্টিকের চেয়েও ক্ষুদ্র ন্যানোপ্লাস্টিক কোষের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে এবং ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্তকারী রিঅ্যাক্টিভ অক্সিজেন স্পেসিস তৈরি করে কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে পারে।
রোগের সঙ্গে সম্পর্ক
ভারেনা পিচলারের মতে, দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। যদিও এ বিষয়ে সরাসরি সম্পর্ক এখনো গবেষণাধীন।
ইতালির গবেষক রাফায়েল মারফেলা মনে করেন, মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিক দেহে দ্রুত বার্ধক্য এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এ বিষয়ে তিনি মানব কোষ থেকে তৈরি কৃত্রিম রক্তনালী ব্যবহার করে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
গবেষকদের মতে, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাবে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। ক্যানসার রোগীদের ক্ষেত্রে এসব কণা ওষুধের কার্যকারিতাও কমিয়ে দিতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
যুক্তরাজ্যের গবেষক ফে কুসেইরো অ্যাজমা ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসযন্ত্রের রোগীদের নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি রোগীদের কফ ও ঘরের বাতাসের নমুনা সংগ্রহ করে খতিয়ে দেখছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক কীভাবে শ্বাসতন্ত্রে জমে রোগের প্রকোপ বাড়ায়।
গবেষকদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন বাতাস, পানি ও খাবারের মাধ্যমে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তাই প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে আরও নিরাপদ বিকল্প উদ্ভাবনের চেষ্টা চলছে, বিশেষ করে চিকিৎসা খাতে ব্যবহৃত প্লাস্টিক সামগ্রীর ক্ষেত্রে।
ফে কুসেইরো বলেন, নিরাপদ মাত্রা নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের জন্য একটি সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবেই বিবেচিত হবে।
গবেষকদের মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—প্রতিদিন আমাদের শরীরে প্রবেশ করা এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাগুলো দীর্ঘমেয়াদে কী ধরনের প্রভাব ফেলছে এবং সেসব ঝুঁকি কমাতে কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।


























সিএনজি স্টেশন বন্ধের কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছে মালিক সমিতি