ঢাকা ০৫:৩৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গ্যাস সংকটে ঘুরছে না চাকা, উৎপাদন কমেছে ৪০ শতাংশ

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৪:২৪:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬
  • / 4

গ্যাসের সংকটে নারায়ণগঞ্জের পোশাকশিল্পে নেমে এসেছে একের পর এক বিপর্যয়। ডাইং কারখানায় কাপড় রং করা যাচ্ছে না। ফলে সময়মতো কাপড় না পাওয়ায় থেমে যাচ্ছে কাটিং, সেলাই, ফিনিশিং ও প্যাকেজিংয়ের কাজ। ব্যাহত হচ্ছে পণ্য রপ্তানির সময়সূচিও।

নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠাতে না পারায় চুক্তি অনুযায়ী বিল থেকে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ কেটে রাখছেন ক্রেতারা। এতে একদিকে উদ্যোক্তাদের আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতি কমছে ক্রেতাদের আস্থা। সামনে নতুন অর্ডার পাওয়া নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

উৎপাদন ব্যাহত হলেও শ্রমিকদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, ব্যাংক ঋণের কিস্তি ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় ঠিকই বহন করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। ব্যবসায়ী সংগঠনের হিসাবে, চলমান জ্বালানি সংকটে দেশের তৈরি পোশাক খাত এরই মধ্যে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে।

সব মিলিয়ে দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জের প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০টি পোশাকশিল্প-সংশ্লিষ্ট কারখানা এখন বহুমুখী সংকটের মধ্যে পড়েছে।

৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে উৎপাদন
শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, গত কয়েক সপ্তাহে জেলার বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে ডাইং শিল্প। গ্যাসের অভাবে কাপড় রং ও শুকানোর কাজ ব্যাহত হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে গার্মেন্টসের পরবর্তী ধাপগুলোতেও। ডাইং থেকে কাপড় সরবরাহে দেরি হওয়ায় কাটিং, সেলাই ও ফিনিশিংয়ের কাজ ধীরগতির হয়ে পড়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে শিপমেন্ট দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এর প্রভাব শুধু কারখানার উৎপাদনে সীমাবদ্ধ থাকছে না; দেশের রপ্তানি আয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ডাইং বন্ধ হলে থেমে যায় পুরো উৎপাদন চেইন
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ২০০ পোশাকশিল্প-সংশ্লিষ্ট কারখানায় প্রায় ২০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। একটি পোশাক তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় ডাইং, নিটিং, অ্যাকসেসরিজ, কাটিং, সেলাই, ফিনিশিং ও প্যাকেজিং পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়ার একটি ধাপ ব্যাহত হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো চেইনে।

গ্যাস সংকটে জেলার দেড় শতাধিক ডাইং কারখানার উৎপাদন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

উদ্যোক্তারা জানান, কোনো কারখানায় দৈনিক ৩০ টন কাপড় রং করার সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে সেখানে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ১ থেকে ২ টনে। আগে কিছু প্রতিষ্ঠান সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস এনে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালিয়ে নিত। নতুন নির্দেশনার পর সেই সুযোগও বন্ধ হয়ে গেছে। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির পর জাতীয় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

এক দিনের বন্ধে বড় অঙ্কের ক্ষতি
গ্যাস সংকট, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং ছুটি সমন্বয়ের কারণে গত বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের বেশিরভাগ তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ রাখা হয়। শহরের পুলিশ লাইন্স এলাকার রহমান গার্মেন্টসসহ অনেক প্রতিষ্ঠান গত বুধবারের (৫ আগস্ট) সরকারি ছুটি ও শুক্রবারের সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে মাঝের দিনটিও ছুটি দিয়েছে। আগের শুক্রবার অতিরিক্ত কাজ করিয়ে এই ছুটি সমন্বয় করা হয়েছে। বিসিক শিল্পনগরীর অধিকাংশ গার্মেন্টসও ওই দিন বন্ধ ছিল। তবে বিদ্যুতের ওপর চাপ কম থাকায় ৪৬৫টি নিটিং কারখানায় গার্মেন্টসের জন্য প্রয়োজনীয় থান কাপড়ের উৎপাদন অব্যাহত রাখা হয়েছে।

বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, বিসিক শিল্পনগরীতে মোট ২৫৬টি গার্মেন্টস কারখানার মধ্যে গত দুই বছরে ১২২টি বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে চালু থাকা ১৩৪টি কারখানার অধিকাংশই বৃহস্পতিবার বন্ধ ছিল। বিসিকের বাইরের রপ্তানিমুখী ও সাব-কন্ট্রাক্টভিত্তিক অধিকাংশ কারখানাতেও একইভাবে ছুটি দেওয়া হয়।

বন্ধ হচ্ছে কারখানা, বাড়ছে উদ্বেগ
একসময় ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’ হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে এখন উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। গত এক বছরে জেলায় দুই ডজনের বেশি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। কর্মহীন হয়েছেন প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার শ্রমিক।

ব্যবসায়ীদের মতে, গ্যাস সংকটের সঙ্গে উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শ্রমিক অসন্তোষ এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মতো বিষয়গুলো একসঙ্গে শিল্প খাতকে কঠিন সময়ের মধ্যে ফেলেছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সিনিয়র সহসভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্যাস সংকটের কারণে জেলার বিভিন্ন কারখানায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ডাইং শিল্প।

তিনি বলেন, ডাইংয়ে উৎপাদন না থাকায় গার্মেন্টসে কাপড় পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। এর ফলে কাটিং, সেলাই ও ফিনিশিং ব্যাহত হচ্ছে এবং সময়মতো শিপমেন্ট দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বিদেশি ক্রেতাদের অর্থ কেটে রাখার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, চুক্তি অনুযায়ী বায়াররা ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ কেটে রাখছেন। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থাও কমছে। একই সঙ্গে সামনে নতুন অর্ডার পাওয়া নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মোর্শেদ সারোয়ার সোহেলের ভাষ্য, একটি বড় গার্মেন্টস কারখানা একদিন বন্ধ থাকলে প্রায় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। মাঝারি কারখানার ক্ষেত্রেও প্রতিদিন ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতন দিতে হচ্ছে। তবে এ মাসেই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে আশ্বাস পাওয়া গেছে।

৪৬৫ নিটিং কারখানায় চলছে উৎপাদন
ফতুল্লার পঞ্চবটীর বিসিক হোসিয়ারি পল্লি মালিক সমিতির পরিচালক শহীদুল ইসলাম বলেন, গার্মেন্টস কারখানার অধিকাংশ বন্ধ থাকলেও ৪৬৫টি নিটিং কারখানা চালু থাকবে। তার মতে, গার্মেন্টস বন্ধ থাকায় বিদ্যুতের ওপর চাপ কমবে। এই সুযোগে নিটিং কারখানাগুলোতে গার্মেন্টসের প্রয়োজনীয় থান কাপড় উৎপাদন করা হবে।

এক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যবসায়ী সংগঠনের হিসাবে চলমান জ্বালানি সংকটে দেশের তৈরি পোশাক খাত এরই মধ্যে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, সময়মতো উৎপাদন ও শিপমেন্ট দিতে না পারায় অনেক বিদেশি ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে নতুন অর্ডার দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন। ফলে এসব অর্ডার ধীরে ধীরে ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে।

মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির নিশ্চয়তা দেওয়া না গেলে একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বেকারত্ব বাড়বে, শিল্প খাতে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হবে এবং দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

গ্যাস সংকটে ঘুরছে না চাকা, উৎপাদন কমেছে ৪০ শতাংশ

আপডেট সময় : ০৪:২৪:২২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

গ্যাসের সংকটে নারায়ণগঞ্জের পোশাকশিল্পে নেমে এসেছে একের পর এক বিপর্যয়। ডাইং কারখানায় কাপড় রং করা যাচ্ছে না। ফলে সময়মতো কাপড় না পাওয়ায় থেমে যাচ্ছে কাটিং, সেলাই, ফিনিশিং ও প্যাকেজিংয়ের কাজ। ব্যাহত হচ্ছে পণ্য রপ্তানির সময়সূচিও।

নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠাতে না পারায় চুক্তি অনুযায়ী বিল থেকে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ কেটে রাখছেন ক্রেতারা। এতে একদিকে উদ্যোক্তাদের আর্থিক ক্ষতি বাড়ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতি কমছে ক্রেতাদের আস্থা। সামনে নতুন অর্ডার পাওয়া নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

উৎপাদন ব্যাহত হলেও শ্রমিকদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, ব্যাংক ঋণের কিস্তি ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় ঠিকই বহন করতে হচ্ছে উদ্যোক্তাদের। ব্যবসায়ী সংগঠনের হিসাবে, চলমান জ্বালানি সংকটে দেশের তৈরি পোশাক খাত এরই মধ্যে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে।

সব মিলিয়ে দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জের প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০টি পোশাকশিল্প-সংশ্লিষ্ট কারখানা এখন বহুমুখী সংকটের মধ্যে পড়েছে।

৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে উৎপাদন
শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, গত কয়েক সপ্তাহে জেলার বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে ডাইং শিল্প। গ্যাসের অভাবে কাপড় রং ও শুকানোর কাজ ব্যাহত হওয়ায় এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে গার্মেন্টসের পরবর্তী ধাপগুলোতেও। ডাইং থেকে কাপড় সরবরাহে দেরি হওয়ায় কাটিং, সেলাই ও ফিনিশিংয়ের কাজ ধীরগতির হয়ে পড়েছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে শিপমেন্ট দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, এর প্রভাব শুধু কারখানার উৎপাদনে সীমাবদ্ধ থাকছে না; দেশের রপ্তানি আয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

ডাইং বন্ধ হলে থেমে যায় পুরো উৎপাদন চেইন
শিল্পসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ২০০ পোশাকশিল্প-সংশ্লিষ্ট কারখানায় প্রায় ২০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। একটি পোশাক তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় ডাইং, নিটিং, অ্যাকসেসরিজ, কাটিং, সেলাই, ফিনিশিং ও প্যাকেজিং পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়ার একটি ধাপ ব্যাহত হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো চেইনে।

গ্যাস সংকটে জেলার দেড় শতাধিক ডাইং কারখানার উৎপাদন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

উদ্যোক্তারা জানান, কোনো কারখানায় দৈনিক ৩০ টন কাপড় রং করার সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে সেখানে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ১ থেকে ২ টনে। আগে কিছু প্রতিষ্ঠান সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস এনে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালিয়ে নিত। নতুন নির্দেশনার পর সেই সুযোগও বন্ধ হয়ে গেছে। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির পর জাতীয় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

এক দিনের বন্ধে বড় অঙ্কের ক্ষতি
গ্যাস সংকট, উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং ছুটি সমন্বয়ের কারণে গত বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের বেশিরভাগ তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ রাখা হয়। শহরের পুলিশ লাইন্স এলাকার রহমান গার্মেন্টসসহ অনেক প্রতিষ্ঠান গত বুধবারের (৫ আগস্ট) সরকারি ছুটি ও শুক্রবারের সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে মাঝের দিনটিও ছুটি দিয়েছে। আগের শুক্রবার অতিরিক্ত কাজ করিয়ে এই ছুটি সমন্বয় করা হয়েছে। বিসিক শিল্পনগরীর অধিকাংশ গার্মেন্টসও ওই দিন বন্ধ ছিল। তবে বিদ্যুতের ওপর চাপ কম থাকায় ৪৬৫টি নিটিং কারখানায় গার্মেন্টসের জন্য প্রয়োজনীয় থান কাপড়ের উৎপাদন অব্যাহত রাখা হয়েছে।

বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, বিসিক শিল্পনগরীতে মোট ২৫৬টি গার্মেন্টস কারখানার মধ্যে গত দুই বছরে ১২২টি বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে চালু থাকা ১৩৪টি কারখানার অধিকাংশই বৃহস্পতিবার বন্ধ ছিল। বিসিকের বাইরের রপ্তানিমুখী ও সাব-কন্ট্রাক্টভিত্তিক অধিকাংশ কারখানাতেও একইভাবে ছুটি দেওয়া হয়।

বন্ধ হচ্ছে কারখানা, বাড়ছে উদ্বেগ
একসময় ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’ হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে এখন উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। গত এক বছরে জেলায় দুই ডজনের বেশি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। কর্মহীন হয়েছেন প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার শ্রমিক।

ব্যবসায়ীদের মতে, গ্যাস সংকটের সঙ্গে উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শ্রমিক অসন্তোষ এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মতো বিষয়গুলো একসঙ্গে শিল্প খাতকে কঠিন সময়ের মধ্যে ফেলেছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সিনিয়র সহসভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্যাস সংকটের কারণে জেলার বিভিন্ন কারখানায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ডাইং শিল্প।

তিনি বলেন, ডাইংয়ে উৎপাদন না থাকায় গার্মেন্টসে কাপড় পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। এর ফলে কাটিং, সেলাই ও ফিনিশিং ব্যাহত হচ্ছে এবং সময়মতো শিপমেন্ট দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

বিদেশি ক্রেতাদের অর্থ কেটে রাখার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, চুক্তি অনুযায়ী বায়াররা ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ কেটে রাখছেন। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে আস্থাও কমছে। একই সঙ্গে সামনে নতুন অর্ডার পাওয়া নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মোর্শেদ সারোয়ার সোহেলের ভাষ্য, একটি বড় গার্মেন্টস কারখানা একদিন বন্ধ থাকলে প্রায় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। মাঝারি কারখানার ক্ষেত্রেও প্রতিদিন ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হয়। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতন দিতে হচ্ছে। তবে এ মাসেই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলে আশ্বাস পাওয়া গেছে।

৪৬৫ নিটিং কারখানায় চলছে উৎপাদন
ফতুল্লার পঞ্চবটীর বিসিক হোসিয়ারি পল্লি মালিক সমিতির পরিচালক শহীদুল ইসলাম বলেন, গার্মেন্টস কারখানার অধিকাংশ বন্ধ থাকলেও ৪৬৫টি নিটিং কারখানা চালু থাকবে। তার মতে, গার্মেন্টস বন্ধ থাকায় বিদ্যুতের ওপর চাপ কমবে। এই সুযোগে নিটিং কারখানাগুলোতে গার্মেন্টসের প্রয়োজনীয় থান কাপড় উৎপাদন করা হবে।

এক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি
বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ব্যবসায়ী সংগঠনের হিসাবে চলমান জ্বালানি সংকটে দেশের তৈরি পোশাক খাত এরই মধ্যে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে। তিনি বলেন, সময়মতো উৎপাদন ও শিপমেন্ট দিতে না পারায় অনেক বিদেশি ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে নতুন অর্ডার দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন। ফলে এসব অর্ডার ধীরে ধীরে ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে।

মোহাম্মদ হাতেম বলেন, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানির নিশ্চয়তা দেওয়া না গেলে একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বেকারত্ব বাড়বে, শিল্প খাতে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হবে এবং দেশের অর্থনীতি ভঙ্গুর অবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।