তেলের মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় বড় ধরনের আর্থিক চাপে বিপিসি
- আপডেট সময় : ১০:০৭:৩৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
- / 6
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কায় বড় ধরনের আর্থিক চাপে পড়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। মার্চ থেকে জুন—এই চার মাসে সংস্থাটির লোকসান হয়েছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এ লোকসান পূরণে সমপরিমাণ ভর্তুকি চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি দিয়েছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের ২৮ জুলাইয়ের চিঠি অনুযায়ী, মার্চে বিপিসির লোকসান হয়েছে ২ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। এপ্রিলে লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। মে মাসে লোকসান হয়েছে ২ হাজার ৬২১ কোটি এবং জুনে ৫ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। চার মাসে মোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম, পরিবহন ব্যয়, জাহাজভাড়া, বীমা ও অন্যান্য আমদানি ব্যয়ের সঙ্গে দেশের বাজারে বিক্রয়মূল্যের পার্থক্যের ওপর মূলত বিপিসির লাভ-লোকসান নির্ভর করে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি পরিবহন ও যুদ্ধঝুঁকির বীমা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে।
মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও দেশের বাজারে একই হারে দাম সমন্বয় করা হয়নি। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত রাখা এবং ভোক্তাদের ওপর পুরো চাপ না দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছে। এ কারণে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত জ্বালানি তেল আমদানির বিপরীতে বিপিসিকে ১৮ হাজার ৬৯৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েছে তেলের দাম
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত তীব্র হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। যুদ্ধের প্রভাবে তেলের দামের পাশাপাশি পরিবহন ও যুদ্ধঝুঁকির বীমা ব্যয়ও বেড়ে যায়।
বিপিসির হিসাবে, সংঘাতের আগে প্রতি ব্যারেল ডিজেল আমদানির গড় দাম ছিল প্রায় ৮৬ মার্কিন ডলার। জুনে তা বেড়ে প্রায় ১২০ ডলারে দাঁড়ায়। একই সময়ে অকটেনের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৩ ডলার থেকে বেড়ে ১০৪ ডলারে ওঠে।
এদিকে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় তেল পরিবহনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এতে অপরিশোধিত তেলের মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি জাহাজভাড়া, বীমা ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে। মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর জ্বালানি আমদানির কারণে বাংলাদেশের ওপরও এর প্রভাব পড়ে।
লিটারপ্রতি ডিজেলে লোকসান ১০৪ টাকা
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সময় বিপিসি সরকারকে জানিয়েছিল, দেশে প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও তা আমদানিতে ব্যয় হচ্ছিল ২০৩ টাকা ৮৪ পয়সা। অর্থাৎ প্রতি লিটার ডিজেলে লোকসান দাঁড়াচ্ছিল ১০৩ টাকা ৮৪ পয়সা।
অকটেনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চাপ তৈরি হয়। প্রতি লিটার অকটেন ১২০ টাকায় বিক্রি করা হলেও আমদানিতে ব্যয় হচ্ছিল ১৫১ টাকা ৬১ পয়সা। ফলে প্রতি লিটারে লোকসান হচ্ছিল ৩১ টাকা ৬১ পয়সা।
ওই সময় দাম সমন্বয় না করা হলে বিপিসির সম্ভাব্য লোকসান ৩০ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিল সংস্থাটি। পরে ১৯ এপ্রিল সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় বিপিসির লোকসান থামেনি।
মুনাফা থেকে বড় লোকসানে বিপিসি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল ও কম থাকায় বিপিসি উল্লেখযোগ্য মুনাফা করেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জ্বালানি তেল বিক্রি করে সংস্থাটি ৪ হাজার ২১৬ কোটি টাকা নিট মুনাফা করে। এর আগের অর্থবছর ২০২৩-২৪ সালে মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৯৪৩ কোটি টাকা। এক বছরে মুনাফা বেড়েছিল ২৭৩ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি মোট ৬২ লাখ ১৫ হাজার ৯২৯ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে। এতে ব্যয় হয় ৫০ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৫ লাখ ১০ হাজার ৯৪৪ টন অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ব্যয় হয় ১০ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা।
এ ছাড়া ৪৭ লাখ ৪ হাজার ৯৮৫ টন পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানিতে খরচ হয় ৩৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। এর মধ্যে ডিজেল, অকটেন, জেট ফুয়েল ও কেরোসিন আমদানিতে ব্যয় হয় ৩৬ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। ফার্নেস অয়েল ও মেরিন ফুয়েল আমদানিতে ব্যয় হয় আরও ৩ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা।
ভর্তুকির চিঠির জবাব মেলেনি
বিপিসির অর্থ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ জানিয়েছেন, ভর্তুকির বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হলেও এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকার এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেবে।
বিপিসির সাম্প্রতিক মুনাফা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ শুরু হওয়ার পর যুদ্ধের আগ পর্যন্ত বিপিসি সরকারকে কর ও ভ্যাট বাবদ প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। পাশাপাশি সরকারের একটি তহবিলেও প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা জমা দেওয়া হয়েছে।
বিপিসির মুনাফার একটি বড় অংশ ভবিষ্যৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন ও দেশের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের সাম্প্রতিক অস্থিরতা তাই শুধু বিপিসির হিসাবেই চাপ তৈরি করেনি; সরকারের রাজস্ব, ভর্তুকি এবং দেশের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার ওপরও নতুন করে আর্থিক চাপ সৃষ্টি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।






















কারাগারে ইমরান খানের মৃত্যু নিয়ে যা জানাল পাকিস্তান