ঢাকা ০৭:১১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাদাসিধে জীবন কাটাতেন নানা পাটেকার

বিনোদন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১১:৪৯:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
  • / 2

মাত্র ৩৫ টাকা মাসিক আয় আর দিনে একবেলা খাবার। এভাবেই কেটেছে নানা পাটেকরের জীবনের শুরুর দিনগুলো। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে উপার্জনে নামতে হয়েছিল তাকে। সিনেমার পোস্টার আঁকা থেকে শুরু করে কলেজজীবনে রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং আঁকা। যে কাজ পেয়েছেন, সেটিই করেছেন। সেই কঠিন দিনগুলোই পরবর্তী জীবনে তাকে অসহায় মানুষের কষ্ট বুঝতে শিখিয়েছিল।

সংগ্রাম পেরিয়ে রুপালি পর্দায়:
১৯৭৮ সালে ‘গমন’ সিনেমার মাধ্যমে অভিনয়ে অভিষেক হয় নানা পাটেকরের। এরপর ‘অঙ্কুশ’, ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘প্রহার’, ‘অগ্নিসাক্ষী’ ও ‘অব তাক ছাপ্পান’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন তিনি। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, শক্তিশালী সংলাপ আর চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা তাকে করে তোলে অন্যদের চেয়ে আলাদা।

এক অভিনেতা, বহু রূপ:
নানা পাটেকরকে কখনো দেখা গেছে কঠোর পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে, কখনো প্রতিবাদী মানুষের ভূমিকায়। আবার ‘ওয়েলকাম’ সিনেমার উদয় শেঠি হয়ে দর্শকদের হাসিয়েছেনও। অর্থাৎ গম্ভীর থেকে হাস্যরস। প্রায় সব ধরনের চরিত্রেই নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন এই অভিনেতা।

খ্যাতি পেয়েও জীবন ছিল সাদাসিধে:
তারকাখ্যাতি, অর্থ কিংবা পুরস্কার। কোনোটিই নানা পাটেকরের জীবনযাপন বদলে দিতে পারেনি। বিলাসবহুল বাড়ি কিংবা দামি গাড়ির চেয়ে সাধারণ জীবনই ছিল তার পছন্দ। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, এক কোটি টাকা দিয়ে গাড়ি কেনার চেয়ে সেই অর্থ দিয়ে কোনো কৃষকের মুখে হাসি ফোটানো তার কাছে বেশি মূল্যবান।

আয়ের বড় অংশ মানুষের জন্য:
২০১৬ সালের কয়েকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, নানা পাটেকর নিজের আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ দাতব্য কাজে ব্যয় করতেন। যদিও এই হিসাবের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক নথি প্রকাশ্যে নেই, অসহায় মানুষের জন্য তার কাজ ছিল বাস্তব এবং দীর্ঘস্থায়ী। নিজের ভালো কাজের প্রচার করতেও পছন্দ করতেন না তিনি।

দুর্দিনে কৃষকদের পাশে:
২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রে ভয়াবহ খরার সময় কৃষকদের দুর্দশা দেখে গভীরভাবে নাড়া খান নানা। আত্মহত্যা করা কৃষকদের ৬২টি পরিবারকে তিনি অর্থসহায়তা দেন। পরে লাতুর ও ওসমানাবাদের আরও ১১৩টি পরিবারকে সহায়তা করেন। শুধু অর্থ দিয়েই থেমে থাকেননি, পরিবারগুলোর সঙ্গে সরাসরি দেখা করে তাদের সমস্যাও শুনেছেন।

‘নাম ফাউন্ডেশন’এর যাত্রা:
এককালীন অর্থসহায়তায় কৃষকদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। এই উপলব্ধি থেকেই মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে ২০১৫ সালে ‘নাম ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন নানা পাটেকর। পানি সংরক্ষণ, জলাধার পুনরুদ্ধার, নদী পুনরুজ্জীবন, কৃষকদের সহায়তা এবং গ্রামীণ উন্নয়নে কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি।

মানুষের পাশে থাকাই ছিল আনন্দ:
নানা পাটেকরের কাছে দান ছিল প্রচারের বিষয় নয়। তিনি মনে করতেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই আসল আনন্দ। কৃষকদের শুধু অর্থ নয়, মানসিক ও সামাজিক সমর্থন দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বারবার বলেছেন তিনি।

শেষ হলো এক বর্ণিল অধ্যায়:
৮ অক্টোবর ২০২৬, ৭৫ বছর বয়সে গোয়ার নিজ বাসভবনে হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান নানা পাটেকর। হাসপাতালে নেওয়ার পর প্রায় ৪৫ মিনিট চিকিৎসকেরা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেও সফল হননি।

মাত্র ৩৫ টাকা আয় করা এক কিশোর থেকে জাতীয় পুরস্কারজয়ী কিংবদন্তি, নানা পাটেকরের জীবন ছিল অবিশ্বাস্য এক সংগ্রামের গল্প। পর্দায় তার অভিনয় যেমন মানুষ মনে রাখবে, তেমনি অসহায় কৃষক ও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো তার মানবিক পরিচয়ও তাকে বাঁচিয়ে রাখবে বহুদিন।

নিউজটি শেয়ার করুন

সাদাসিধে জীবন কাটাতেন নানা পাটেকার

আপডেট সময় : ১১:৪৯:২৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

মাত্র ৩৫ টাকা মাসিক আয় আর দিনে একবেলা খাবার। এভাবেই কেটেছে নানা পাটেকরের জীবনের শুরুর দিনগুলো। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে উপার্জনে নামতে হয়েছিল তাকে। সিনেমার পোস্টার আঁকা থেকে শুরু করে কলেজজীবনে রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং আঁকা। যে কাজ পেয়েছেন, সেটিই করেছেন। সেই কঠিন দিনগুলোই পরবর্তী জীবনে তাকে অসহায় মানুষের কষ্ট বুঝতে শিখিয়েছিল।

সংগ্রাম পেরিয়ে রুপালি পর্দায়:
১৯৭৮ সালে ‘গমন’ সিনেমার মাধ্যমে অভিনয়ে অভিষেক হয় নানা পাটেকরের। এরপর ‘অঙ্কুশ’, ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘প্রহার’, ‘অগ্নিসাক্ষী’ ও ‘অব তাক ছাপ্পান’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন তিনি। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, শক্তিশালী সংলাপ আর চরিত্রের ভেতরে ঢুকে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা তাকে করে তোলে অন্যদের চেয়ে আলাদা।

এক অভিনেতা, বহু রূপ:
নানা পাটেকরকে কখনো দেখা গেছে কঠোর পুলিশ কর্মকর্তার চরিত্রে, কখনো প্রতিবাদী মানুষের ভূমিকায়। আবার ‘ওয়েলকাম’ সিনেমার উদয় শেঠি হয়ে দর্শকদের হাসিয়েছেনও। অর্থাৎ গম্ভীর থেকে হাস্যরস। প্রায় সব ধরনের চরিত্রেই নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন এই অভিনেতা।

খ্যাতি পেয়েও জীবন ছিল সাদাসিধে:
তারকাখ্যাতি, অর্থ কিংবা পুরস্কার। কোনোটিই নানা পাটেকরের জীবনযাপন বদলে দিতে পারেনি। বিলাসবহুল বাড়ি কিংবা দামি গাড়ির চেয়ে সাধারণ জীবনই ছিল তার পছন্দ। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, এক কোটি টাকা দিয়ে গাড়ি কেনার চেয়ে সেই অর্থ দিয়ে কোনো কৃষকের মুখে হাসি ফোটানো তার কাছে বেশি মূল্যবান।

আয়ের বড় অংশ মানুষের জন্য:
২০১৬ সালের কয়েকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, নানা পাটেকর নিজের আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ দাতব্য কাজে ব্যয় করতেন। যদিও এই হিসাবের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক নথি প্রকাশ্যে নেই, অসহায় মানুষের জন্য তার কাজ ছিল বাস্তব এবং দীর্ঘস্থায়ী। নিজের ভালো কাজের প্রচার করতেও পছন্দ করতেন না তিনি।

দুর্দিনে কৃষকদের পাশে:
২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রে ভয়াবহ খরার সময় কৃষকদের দুর্দশা দেখে গভীরভাবে নাড়া খান নানা। আত্মহত্যা করা কৃষকদের ৬২টি পরিবারকে তিনি অর্থসহায়তা দেন। পরে লাতুর ও ওসমানাবাদের আরও ১১৩টি পরিবারকে সহায়তা করেন। শুধু অর্থ দিয়েই থেমে থাকেননি, পরিবারগুলোর সঙ্গে সরাসরি দেখা করে তাদের সমস্যাও শুনেছেন।

‘নাম ফাউন্ডেশন’এর যাত্রা:
এককালীন অর্থসহায়তায় কৃষকদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। এই উপলব্ধি থেকেই মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে ২০১৫ সালে ‘নাম ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন নানা পাটেকর। পানি সংরক্ষণ, জলাধার পুনরুদ্ধার, নদী পুনরুজ্জীবন, কৃষকদের সহায়তা এবং গ্রামীণ উন্নয়নে কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি।

মানুষের পাশে থাকাই ছিল আনন্দ:
নানা পাটেকরের কাছে দান ছিল প্রচারের বিষয় নয়। তিনি মনে করতেন, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই আসল আনন্দ। কৃষকদের শুধু অর্থ নয়, মানসিক ও সামাজিক সমর্থন দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বারবার বলেছেন তিনি।

শেষ হলো এক বর্ণিল অধ্যায়:
৮ অক্টোবর ২০২৬, ৭৫ বছর বয়সে গোয়ার নিজ বাসভবনে হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান নানা পাটেকর। হাসপাতালে নেওয়ার পর প্রায় ৪৫ মিনিট চিকিৎসকেরা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেও সফল হননি।

মাত্র ৩৫ টাকা আয় করা এক কিশোর থেকে জাতীয় পুরস্কারজয়ী কিংবদন্তি, নানা পাটেকরের জীবন ছিল অবিশ্বাস্য এক সংগ্রামের গল্প। পর্দায় তার অভিনয় যেমন মানুষ মনে রাখবে, তেমনি অসহায় কৃষক ও সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো তার মানবিক পরিচয়ও তাকে বাঁচিয়ে রাখবে বহুদিন।