নিনো আবারও সক্রিয়, বাড়তে পারে বৈশ্বিক দুর্যোগ

- আপডেট সময় : ০২:১৮:৫৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
- / 72
বিশ্বব্যাপী আবহাওয়া ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম জলবায়ুগত ঘটনা এল নিনো আবারও সক্রিয় হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) নতুন এল নিনোর সূচনার ঘোষণা দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবারের এল নিনো অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ, দাবানল ও খাদ্যসংকটের ঝুঁকি আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, পূর্বাভাস অনুযায়ী এল নিনো শক্তিশালী রূপ নিলে এটি গত ৭৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এল নিনোতে পরিণত হতে পারে। বিশেষ করে আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং এশিয়ার কিছু এলাকায় খরা ও বন্যা পরিস্থিতি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।
এল নিনো নামটির উৎপত্তি বহু বছর আগে পেরুর জেলেদের পর্যবেক্ষণ থেকে। তারা লক্ষ্য করেছিলেন, কয়েক বছর পরপর বড়দিনের সময় প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে অ্যাঙ্কোভি মাছের সংখ্যা হঠাৎ কমে যায়। এ ঘটনাকেই তারা ‘এল নিনো’ নামে অভিহিত করেন, যার অর্থ ‘শিশু যিশু’।
বর্তমানে এল নিনোকে বৈশ্বিক জলবায়ুগত চক্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বায়ুর গতিপথে পরিবর্তনের ফলে এটি সৃষ্টি হয়। এর প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বৃদ্ধি পায় এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়ার ধরন বদলে যায়।
সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কতটা বৃদ্ধি পেয়েছে তার ওপর এল নিনোর শক্তি নির্ধারিত হয়। সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় তাপমাত্রা দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বেড়ে গেলে সেটিকে শক্তিশালী এল নিনো হিসেবে ধরা হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আবহাওয়া মডেলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বাকি সময় এবং ২০২৭ সালের শুরুতে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা গড়ে ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি, এমনকি ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসও অতিক্রম করতে পারে।
এখন পর্যন্ত সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো ছিল ১৯৮২-৮৩ সালে, যখন তাপমাত্রা ২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছিল। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এবারের এল নিনো সেই রেকর্ডও ভেঙে দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনো সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি না হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে মিলিত হয়ে এর প্রভাব আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৯৭-৯৮ সালের শক্তিশালী এল নিনোর পর ১৯৯৮ সাল সে সময়ের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ড গড়েছিল। একইভাবে ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর পর ২০১৬ সালেও নতুন তাপমাত্রার রেকর্ড তৈরি হয়।
বর্তমানে ২০২৪ সাল সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ডধারী। ওই বছর বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। জলবায়ু মডেলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সাল আরও উষ্ণ হতে পারে।
এল নিনোর প্রভাব সব অঞ্চলে সমানভাবে পড়ে না। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দেয়, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঘটনা ঘটে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) গত ৯ জুন সতর্ক করে জানিয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকা ও সাহেল অঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এর আগে ২০২৩-২৪ সালের এল নিনোর সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ খরা দেখা গিয়েছিল।
এফএওর তথ্য অনুযায়ী, সোমালিয়ায় অক্টোবর পর্যন্ত খরা অব্যাহত থাকতে পারে। এরপর ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে দীর্ঘ খরার পর অতিবৃষ্টি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। কারণ শুকিয়ে যাওয়া মাটি বৃষ্টির পানি দ্রুত শোষণ করতে না পারায় আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং এশিয়ার বিভিন্ন এলাকাও খরার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের অনেক অঞ্চল ইতোমধ্যে যুদ্ধ, খাদ্যসংকট ও অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি। এমন পরিস্থিতিতে শক্তিশালী এল নিনো সংকটকে আরও গভীর করতে পারে।
ইরানকে ঘিরে সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জটিলতার কারণে সার সরবরাহেও চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যা কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইউরোপীয় কমিশন সতর্ক করেছে, সুদান, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, চাদ, ইকুয়েডর, ভেনেজুয়েলা ও হাইতির মতো দেশগুলো মানবিক সংকটের মুখে পড়তে পারে।
বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী জলবায়ুগত ঘটনা হিসেবে পরিচিত এল নিনো অতীতেও বহু অঞ্চলে খরা, বন্যা ও খাদ্যসংকটের কারণ হয়েছে। ১৯৯৭-৯৮ এবং ২০১৫-১৬ সালের শক্তিশালী এল নিনোর অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতাই তুলে ধরে। এবারও বিজ্ঞানীরা একই ধরনের ঝুঁকির কথা বলছেন।
পূর্বাভাস সত্যি হলে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড গড়তে পারে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা ও খরার পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর প্রভাব পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব না হলেও আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায়। খরাসহিষ্ণু বীজ ব্যবহার, গবাদিপশুর জন্য খাদ্য ও পানি সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।




















