জরিপ আছে, কার্যক্রম নেই—ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দুই সিটির সমন্বয়হীনতা

- আপডেট সময় : ১২:১৮:১০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ অক্টোবর ২০২৬
- / 0
মৃত্যু, আহাজারি, প্রিয়জন হারানোর আর্তনাদ। প্রতিবছর ডেঙ্গু ফিরে আসে এমন নির্মম রূপ নিয়ে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দায়সারা ভাব ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের। সমন্বয়হীনতা, মশক নিধন কার্যক্রমের ধীরগতি এবং কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। সেই সঙ্গে জরিপের নামে রয়েছে সময় ক্ষেপণের অভিযোগও। দুই সিটির মশক নিধন কার্যক্রমের আদ্যোপান্ত তুলে ধরা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।
কয়েক বছরের সরকারি হিসেব বলছে, প্রতিবছর গড়ে এক হাজারের ও বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে প্রাণ হারাচ্ছেন। আক্রান্ত হচ্ছেন গড়ে প্রায় দেড় লাখ মানুষ। এর প্রায় ৩০ শতাংশ রোগী রাজধানীর। মৃত্যুর মিছিলেও এই শহর সবার আগে। প্রশ্ন হচ্ছে, অনিবার্য এই মৃত্যুর হাত থেকে কি মুক্তি মিলবে না নগরবাসীর?
হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর একজন আত্মীয় বলেন, ‘মশার জন্য তেমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় নাই। কারণ আমরা একই ফ্যামিলির চারজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হইছি।’
এডিস মশা নিধনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কতটা সক্রিয়? মাঠপর্যায়ে প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মিলই বা কতটুকু? সরেজমিনে দুই সিটি করপোরেশনে মশা নিধনে বেশ কিছু অসঙ্গতির অভিযোগ মিলেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হচ্ছে, মশকনিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা।
ওয়ার্ড সচিবদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই ওয়ার্ড কীটনাশক সুপারভাইজার বা স্প্রে ম্যানদের। একটি ওয়ার্ডে কখন কোথায় কীটনাশক স্প্রে করছেন, সে তথ্য থাকে না সচিবদের কাছে। অথচ মশার উৎপাত নিয়ে স্থানীয়রা সবার আগে যোগাযোগ করে ওয়ার্ড কার্যালয়ে। কাউন্সিলরদের অনুপস্থিতিতে তদারকিতে রয়েছে উদাসীনতা।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ২১ নম্বর ওয়ার্ডের সচিব বেগম রাবেয়া আক্তার বলেন, ‘বিগত এক-দেড় বছর বছর যাবৎ মশকের যে পোর্শনটা, যেটা যেমন তারা কি মেডিসিন উঠাচ্ছে, কি দিচ্ছে বা কোথায় কি দিচ্ছে, এগুলোর সঙ্গে ওয়ার্ড সচিবের সঙ্গে কোনোরকম কানেক্ট নাই। কিন্তু পাবলিকের সঙ্গে কানেক্ট কিন্তু সরাসরি শুধু ওয়ার্ড সচিবই। তো এখন উনারা যে কোথায় কি করতেছে এটা তো আমাদের কাছে, মানে যেমন আজকে সে কোথায় কোথায় মশার ওষুধটা স্প্রে করবে এরকম কোনো তথ্য কিন্তু আমার কাছে নাই।’
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ৭১ নম্বর ওয়ার্ডের অফিস সহায়ক মো. তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘ট্যাঙ্কি ঘাড়ে, কিন্তু এদের অফিস নিয়েছে হলো আপনার ওই কদম আলীর ঝিলপার। ওখানে ওষুধপাতি রাখে, ওই জায়গায় ওরাই ওরা নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের কাছে আসে না। আমাদের কাছে আসে, সচিবের কাছে আসে শুধু সিগনেচার নেয়ার জন্য।”’
দুই সিটিতে সকালে টেমিফস দিয়ে লার্ভা নিধন, বিকেলে মেলাথিয়ন মিশিয়ে ফগিং করা হয়। সেই সঙ্গে ব্যবহার করা হয় ম্যালেরিয়া অয়েল বি ও নোভালুরন। এসব লার্ভিসাইড ও ফগিংয়ের কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে রয়েছে সংশয়। এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১২ দিনব্যাপী এডিস মশার লার্ভা জরিপেও আস্থা নেই নগরবাসীর। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১০০টি হটস্পট চিহ্নিত হলেও নেই ক্র্যাশ প্রোগ্রাম। স্থানীয়রা বলছেন, মাঝেমধ্যে স্প্রে ম্যানদের দেখা মিললেও তা অনিয়মিত।
স্থানীয়দের মধ্যে একজন বলেন, ‘আমাদের এখানে মশার ওষুধ ছিটায় ঠিকই, কিন্তু ওইরকমভাবে ছিটানোর পরও, তারপরও ডেঙ্গু জ্বর সবারই কমবেশি আছেই এলাকার ভেতরে। এক সপ্তাহ পরপর ছিটাইলে হয় না। রেগুলার দিলে পরে জিনিসটা ভালো হয়।’
অন্য একজন বলেন, ‘শুধু ধোঁয়া সৃষ্টি হয় আর গন্ধ হয়, কিন্তু কোনো মশা মরে না।’
ডিএসসিসি প্রশাসক বলছেন, কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার উদ্দেশেই চালানো হচ্ছে জরিপ। দ্রুত সময়ের মধ্যে হটস্পটে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, লার্ভিসাইড প্রয়োগ ও বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম জোরদার করা হবে।
ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, ‘আমরা যদি একটা জরিপ করতে পারি, তাইলে জরিপের মধ্যে দিয়ে বের হয়ে আসবে যে কোন কোন স্থানগুলোতে বেশি আছে। তাইলে সে স্থানগুলোতে মানে ট্রিটমেন্ট করা আমাদের জন্য সুবিধা হবে। এগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটি, ঢাকা ইউনিভার্সিটির এখান থেকে যেসব কীটতত্ত্ববিদ আছে, তাদের একটা বোর্ড আছে। তাদের ওইখান থেকেই এটার মানটা তারা যাচাই করে, তারা রিপোর্ট দেয়ার পরেই কিন্তু সেই, মানে ইয়েটা নেয়া হয়। এর বাইরে নেয়ার, নেয়ার বা ব্যবহার করার কোনো সুযোগই নাই।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এডিস মশা দমনে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগের। বৈজ্ঞানিক জরিপ ও তথ্যের ভিত্তিতে প্রজননস্থল ধ্বংস ও নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে হবে। সেই সঙ্গে বছরব্যাপী কর্মপরিকল্পনার বিকল্প নেই।
কীটতত্ত্ববীদ অধ্যাপত কবিরুল বাশার বলেন, ‘যদি আমরা এডিস মশাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাই, তাহলে এডিস মশার প্রজননস্থলে লার্ভিসাইড প্রয়োগ করতে হবে এবং আইজিআর প্রয়োগ করতে হবে। সেটি একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় নির্দিষ্ট সময় পর পর। যদি সেটি একটিও মেইনটেইন না করা হয় তার মধ্যে থেকে, তাহলে সেটি কার্যকরী হবে না। আবার যদি এরকম হয় যে, এই সার্ভেটা ১২ দিন হলো, আরও ১২ দিন লাগলো রিপোর্ট তৈরি করতে, এরই মধ্যে ডেঙ্গু হয়ে গেল, ডেঙ্গুতে অনেক মানুষ আক্রান্ত হলো, মারা গেল।’
নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিবি বলেন, ‘শুধু জনতুষ্টি, জবাবদিহিতাহীন কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে একটি নগরী তার জনস্বাস্থ্যগত উত্তরণ করতে পারে না। সিটি করপোরেশনের সমন্বিত কর্মধারা ছাড়া যেমনি করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্ভব না, তেমনি করে জনস্বাস্থ্যের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থাৎ ডেঙ্গু মশাবাহিত রোগ ছড়ানোর আস্তানাগুলোকে ধ্বংস করা সম্ভব না।’
এবছর সেপ্টেম্বরেই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ডেঙ্গু। এসময় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন প্রায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষ। প্রাণ গেছে ১৪৮ জনের।






















