আমদানিকারকদের তথ্যেও এলপিজির কৃত্রিম সংকট!

- আপডেট সময় : ১২:২৪:২৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
- / 5
বিক্রি কমিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। গোয়েন্দা রিপোর্টের পর খোদ আমদানিকারকদের দেওয়া এলপি গ্যাসের হিসাবেও গরমিল পাওয়া গেছে। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে স্বাভাবিক সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া, কোম্পানিভেদে বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) দাখিলকৃত এলপিজি বিক্রির পরিসংখ্যানে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। বিক্রির তথ্য মোটেই সন্তোষজনক নয় বলে মনে করছে বিইআরসির একাধিক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেছেন, যে ডাটা পাওয়া গেছে তাতে বিক্রি কমিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে।
বিক্রি কমিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে সেপ্টেম্বর মাসে এলপিজির বেচাকেনার তথ্য চেয়ে ১২ আমদানিকারককে চিঠি দেয় বিইআরসি।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেছেন, নির্ধারিত সময় ৪ অক্টোবরের মধ্যে ১১টি কোম্পানির তথ্য পাওয়া গেছে। আমরা তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করছি। তথ্যে কোন গরমিল কিংবা সন্দেহজনক কিছু পাওয়া গেলে সে বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির কোন তথ্য পাওয়া গেছে কি-না! এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, বিষয়টি এখনই বলার মতো সময় হয়নি, আমরা যাচাই-বাছাই করছি। তার আগে কোন মন্তব্য করা ঠিক হবে না। যদি কারো তথ্যে সন্দেহ হয়, তাহলে সরেজমিন ভিজিটসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
তবে বিইআরসির একটি সুত্র জানিয়েছে, যমুনা এলপিজি, ওমেরা এলপিজি, টিএমএসএস এবং বিএম এলপিজিসহ কয়েকটি কোম্পানির তথ্যে ব্যাপক গরমিল দেখা গেছে। যমুনা স্প্রেসটেক জেভি মাসের প্রথম দিকে দৈনিক ১ হাজার টন থেকে ১৬০০ টন পর্যন্ত সরবরাহ দিলেও ২২ সেপ্টেম্বর থেকে কমিয়ে দেয়। ২৮ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৪০ টন সরবরাহ দিয়েছে। টিএমএসএস এলপিজিও তাদের সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়ে এনেছে। কোম্পানিটি ১৭ সেপ্টেম্বর ২৪১ টন সরবরাহ দিলেও ২৭ সেপ্টেম্বর সরবরাহ দিয়েছে মাত্র ৪৬ টন।
কোম্পানিগুলোর দেওয়া ওই তথ্যও যথাযথ নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা দাবি করেছেন, বিইআরসিকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য গোজামিল দিয়ে হিসাব দিয়েছে। সরেজমিন তদন্ত, তাদের বিক্রির লেজার এবং ব্যাংকের তথ্য পরীক্ষা করলেই জালিয়াতির বিষয়টি ধরা পড়বে।
সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে এলপি গ্যাসের সংকটের সুত্রপাত। রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা বাহিনীর রিপোর্টে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজার ঊর্ধমূখী (টনপ্রতি ৬৪ ডলার) দেখে ৫টি কোম্পানি ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বিক্রি প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। নতুন দামে বিক্রি করার জন্য হাজার হাজার টন এলপিজি ধরে রেখেছে। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, আগস্টে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন, আর সেপ্টেম্বর মাসে এসেছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন। সে কারণে বাজারে ঘাটতি হওয়ার কোন সুযোগ নেই।
শুধু সরবরাহ কমানো নয়, সেপ্টেম্বর মাসে বিইআরসি ঘোষিত দরের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির লিখিত অভিযোগ করেছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। সংগঠনটি ২১ সেপ্টেম্বর বিইআরসি চেয়ারম্যান বরাবরে দেওয়া অভিযোগে বলেছে, পরিবেশকদের জন্য বিইআরসি নির্ধারিত দর (১২ কেজি) ১৪৭৫ টাকা হলেও ১৫৫০ টাকা থেকে ১৭২০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। যে কারণে বিইআরসি নির্ধারিত দর ১৫৮৫ টাকা দরে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
পরিবেশক, খুচরা বিক্রেতা এমনকি গোয়েন্দা তথ্যেও এলপিজি অবৈধ মজুদের বিষয়টি সামনে এলেও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এমনকি জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ঘোষণা দিলেও সুফল দৃশ্যমান নয়। আমদানিকারকরা গা-বাঁচিয়ে অক্টোবরে পৌঁছে গেছে। আর যথারীতি ৪ অক্টোবর ১২ কেজিতে ২৫২ টাকা দাম বাড়িয়ে দিয়েছে বিইআরসি।
কিন্তু তারপরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে না। অটোগ্যাস ফিলিং স্টেশনের একজন মালিক বলেছেন, তার বেশ কয়েকটি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। মাসে তার ১৫০ গাড়ির মতো প্রয়োজন হয়, সেপ্টেম্বর মাসে সরবরাহ পেয়েছে মাত্র ১৪ গাড়ি। আর ৪ অক্টোবর অনেক হাতে পায়ে ধরে ১ গাড়ি পেয়েছেন। তার কমপক্ষে ৬ গাড়ি অটোগ্যাস প্রয়োজন ছিল।
এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আজকে ১ গাড়ি দিয়েছে নাম প্রকাশ করলে দেখা যাবে আর গ্যাসই দিবে না। এখন তো পরিচালন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
অটোগ্যাস ফিলিং স্টেশন মালিক সমিতির সভাপতি সিরাজুল মওলা বলেছেন, এখনও চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশের মতো সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। তাও আবার অনেক কোম্পানি বাড়তি দাম আদায় করছে।
আওয়ামী লীগের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ধারাবাহিকতায় বিএনপি সরকারও উদার হস্তে তাদের সব চাওয়া পুরণ করে যাচ্ছে। নানা সুবিধা দিয়েও ব্যবসায়ীদের বাগে আনতে ব্যর্থ সরকারগুলো। অতীতে যখনই দাম ঊর্ধমূখী হয়েছে তখনই নানান কারসাজি করেছে।এবারও অক্টোবর মাসে দাম বাড়ার আভাস পেয়ে সরবরাহ কমিয়ে দিলে চরম সংকট দেখা দেয়। ১৫৮৫ টাকার এলপিজি ২২০০ থেকে ২৫০০ টাকায় বেচাকেনার খবর পাওয়া গেছে। অক্টোবরে দাম বাড়িয়ে ১৮৩৭ টাকা করা হলেও সেই দামে মিলছে না এলপিজি।























