যুদ্ধের পর ইরানে জোরালো হচ্ছে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দাবি

- আপডেট সময় : ১২:৪৭:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
- / 2
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের পর ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। দেশটির কট্টরপন্থি রাজনীতিক ও শাসকগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা বলছেন, ভবিষ্যতে হামলা ঠেকাতে শুধু কূটনৈতিক আলোচনা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিরোধব্যবস্থা। আর এ জন্য পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার দাবিও উঠেছে।
প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ফিনান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর পারমাণবিক বোমা তৈরির পক্ষে সমর্থন প্রায় শূন্য থেকে বেড়ে ৫০ শতাংশের বেশি হয়েছে বলে দাবি করেছেন ইরানের এক কর্মকর্তা। এছাড়া দেশটির একাধিক রাজনীতিক ও কট্টরপন্থি নেতা এখন প্রকাশ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে কথা বলছেন।
তাদের কেউ কেউ পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) থেকে বেরিয়ে যাওয়ারও দাবি তুলেছেন। ইরানি কর্মকর্তাদের একাংশের মতে, ইরানে বারবার হামলা হলেও শুধু আলোচনার মাধ্যমে তা ঠেকানো সম্ভব হয়নি। তাই এখন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র হাসান ঘাশঘাভি বলেছেন, দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা চাইলে পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়ে নতুন ফতোয়া দিতে পারেন। ‘তাকে তা করা থেকে কেউ আটকাতে পারবে না’ বলেও জানান তিনি। ইরানের এক সরকার-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির দাবি, পারমাণবিক বোমা তৈরির পক্ষে সমর্থন ‘প্রায় শূন্য থেকে বেড়ে ৫০ শতাংশেরও বেশি’ হয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ চলতে থাকায় ইরানের রাজনীতিক ও কট্টরপন্থিদের মধ্যে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দাবি ক্রমেই বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে যে আশঙ্কা করে আসছিল, ইরানের রাজনীতিকেরা এখন প্রকাশ্যেই সেই অস্ত্র তৈরির আকাঙ্ক্ষার কথা বলছেন।
নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশটির জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা, বিশ্লেষক ও রাজনীতিকদের অনেকেই এখন আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে এসে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পূর্ণাঙ্গ উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধের সাত মাস পার হওয়ার পর এ দাবি আরও জোরালো হয়েছে।
চলতি মাসের শুরুর দিকে দাভুদ মোদাররেসিয়ান নামে ইরানের ডানপন্থিদের ঘনিষ্ঠ এক কর্মী লেখেন, ‘সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে, ইরানের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষা নয়; বরং রুটির চেয়েও বেশি জরুরি প্রয়োজন।’
এর আগে ২০০৫ সালে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি নিষিদ্ধ করে ফতোয়া দিয়েছিলেন। এরপর থেকে দেশটির নেতারা পারমাণবিক কর্মসূচির প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে সরাসরি কথা বলা বারবারই এড়িয়ে গেছেন।
ইরানি কর্মকর্তারা এত দিন বলে এসেছেন, দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বেসামরিক পারমাণবিক জ্বালানির প্রয়োজনে, অস্ত্র তৈরির জন্য নয়। তবে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নজরদারি সংস্থা এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতারা এ দাবি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন।
নিউইয়র্ক পোস্ট বলছে, যুদ্ধের শুরুতে সাবেক সর্বোচ্চ নেতা খামেনির মৃত্যুর পর ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে আহ্বান আরও বেড়েছে। তার উত্তরসূরি মোজতবা খামেনি এখনো প্রকাশ্যে জানাননি যে তিনি তার বাবার নীতি থেকে সরে আসবেন কি না। এছাড়া তিনি এখনো জনসমক্ষেও আসেননি।
হাসান ঘাশঘাভির দাবি, মোজতবা খামেনি যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে অবস্থান নেন, তাহলে ইরানের নেতাদেরও সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।
ইরানের কট্টরপন্থিদের কেউ কেউ ইরানকে ধ্বংস করে দেয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুমকিকেও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রয়োজনীয়তার পক্ষে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরছেন। তাদের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অস্তিত্বের জন্য হুমকি।
ক্রাইসিস গ্রুপের ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আলী ভায়েজ ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, ‘এই যুদ্ধ তাদের যুক্তিকে আরও জোরালো করেছে, যারা মনে করেন যে কোনো দেশ তার (ইরান) অস্তিত্ব হুমকির মুখে ফেললে আত্মরক্ষার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।’
অবশ্য ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা এখনো স্পষ্ট নয়। যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দেশটির পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালানোর পর ইরান জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষকদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বারবার দাবি করেছেন, ইরানের কাছে থাকা ৯০০ পাউন্ডের বেশি উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস হয়ে গেছে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে।























