নিকোলাস মাদুরোর অবিশ্বাস্য উত্থানের গল্প

- আপডেট সময় : ০১:৪৬:৫১ অপরাহ্ন, রোববার, ৪ জানুয়ারী ২০২৬
- / 134
ভেনেজুয়েলার রাজনীতিতে নিকোলাস মাদুরো এক রহস্যময় এবং শক্তিশালী চরিত্র। অধিকাংশ রাষ্ট্রনেতা যখন উচ্চশিক্ষা বা আভিজাত্যের পথ ধরে ক্ষমতায় আসেন, মাদুরো সেখানে এক ব্যতিক্রমী নাম। এক সময়ের সাধারণ বাস চালক থেকে আজ তিনি বিশ্ব রাজনীতির এক প্রবল প্রতিপক্ষ। বামপন্থী নেতা হুগো শ্যাভেজের (Hugo Chavez) হাত ধরে রাজনীতিতে আসা এই নেতা এখন আটলান্টিক মহাসাগরের পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত শক্তিধর প্রতিবেশী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল মাথাব্যথার কারণ। তার জীবন শুরু হয়েছিল কারাকাসের রাস্তায় বাস চালানোর মধ্য দিয়ে, আর শেষ পর্যন্ত তিনি আসীন হন দেশটির প্রেসিডেন্সিয়াল প্যালেসে।
একনজরে মাদুরোর যাত্রা
জন্ম: ১৯৬২ (কারাকাস, ভেনেজুয়েলা)।
১৯৯০-এর দশক: কারাকাস মেট্রোর বাস চালক।
২০০০-২০০৬: জাতীয় পরিষদের স্পিকার এবং শ্রমিক নেতা।
২০০৬-২০১২: ভেনেজুয়েলার সফল পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
২০১৩-২০২৬: ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট।
সংকট: মুদ্রাস্ফীতি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও মানবিক বিপর্যয়।
পতন: ৩ জানুয়ারি, ২০২৬ (মার্কিন অভিযানে আটক)।
বর্তমান অবস্থান: নিউ ইয়র্কের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে।
১৯৬২ সালে কারাকাসে এক শ্রমজীবী পরিবারে জন্ম নেওয়া মাদুরো কখনোই প্রচলিত অর্থে ‘এলিট’ ছিলেন না। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তিনি কারাকাস মেট্রো কোম্পানিতে একজন সাধারণ বাস চালক (Bus driver) হিসেবে কাজ শুরু করেন। প্রতিদিন স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে সাধারণ মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার সময়ই তিনি শিখছিলেন মানুষের অভাব-অভিযোগ আর সংগ্রামের ভাষা। তৎকালীন সময়ে স্টিয়ারিং হাতে সাধারণ মানুষের সাথে মিশে চলাই ছিল তার কাজ। সাধারণ মানুষের অভাব-অনটন এবং রাজপথের রাজনীতি তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন।
ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট
মাদুরোর ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে বড় স্তম্ভ তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস (Cilia Flores)। পেশায় একজন আইনজীবী সিলিয়াকে ভেনেজুয়েলায় ‘ফার্স্ট কমব্যাট্যান্ট’ বলা হয়। সিলিয়া ও মাদুরো দুজনেই চাভেজের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন এবং দেশের কঠিন অর্থনৈতিক সংকটেও তারা একে অপরের ছায়া হয়ে পাশে ছিলেন। তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারির শুরুতে একটি নাটকীয় মার্কিন অভিযানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার দাবি বিশ্বজুড়ে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে।
বাস চালক থাকাকালীনই মাদুরো শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হন। রাজনীতির প্রতি অনুরাগ তাকে ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃত্বে নিয়ে আসে। তিনি গঠন করেন একটি শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়ন (Trade union leader)। সেখানে তিনি একজন তুখোড় শ্রমিক নেতা (Labor union leader) হিসেবে পরিচিতি পান। শ্রমিক নেতা হিসেবে তার সেই সাংগঠনিক দক্ষতাই তাকে রাজনীতির মূল ধারায় নিয়ে আসে। ১৯৮৩ সালে তিনি প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হোসে ভিসেন্টে রাঙ্গেলের বডিগার্ড হিসেবেও কাজ করেছিলেন, যা তাকে রাজনীতির ভেতরের দৃশ্য দেখার সুযোগ করে দেয়। সেখান থেকেই তিনি ক্ষমতা এবং নিরাপত্তার মারপ্যাঁচ শিখতে শুরু করেন।
মাদুরোর জীবনের মোড় ঘুরে যায় ১৯৯২ সালে। যখন সেনা কর্মকর্তা হুগো চাভেজ (Hugo Chavez) এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর কারাগারে ছিলেন, মাদুরো তার মুক্তির জন্য রাজপথে আন্দোলন গড়ে তোলেন। চাভেজের কারাবাসকালে তার স্ত্রী এবং আইনজীবীদের সাথে মাদুরোর ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। চাভেজ যখন মুক্তি পেলেন, মাদুরো হয়ে উঠলেন তার ‘ডান হাত’। চাভেজ ক্ষমতায় আসার পর মাদুরোর উত্থান ছিল চোখে পড়ার মতো। পররাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে ভাইস প্রেসিডেন্ট—সব ধাপ পেরিয়ে ২০১৩ সালে চাভেজের মৃত্যুর পর তিনি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট (President of Venezuela) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
চাভেজ ক্ষমতায় আসার পর মাদুরোর উত্থান ছিল উল্কার মতো। প্রথমে সংসদ সদস্য, এরপর জাতীয় পরিষদের স্পিকার এবং ২০০৬ সালে ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রমন্ত্রী (Foreign Minister) নিযুক্ত হন। সবশেষে ২০১২ সালে তিনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হন। ২০১৩ সালে চাভেজের মৃত্যুর আগে তিনি প্রকাশ্যে মাদুরোকেই তার উত্তরসূরি ঘোষণা করে যান। একজন বাস চালক থেকে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট (President of Venezuela) হওয়ার যাত্রা এভাবেই পূর্ণতা পায়।
মাদুরোকে নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় ২০১৮ সালে। যখন তার দেশের মানুষ মুদ্রাস্ফীতির কারণে ক্ষুধার্ত থাকতো, তখন তাকে তুরস্কের এক দামী রেস্তোরাঁয় বিখ্যাত শেফ ‘সল্ট বে’ (Salt Bae)-এর হাতে দামী স্টেক খেতে দেখা যায়। এই ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় ওঠে, যা তার ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
মাদুরোর ক্ষমতা দখলের যাত্রা শুরু হয় ২০১৩ সালের এপ্রিলে। এরপর ২০১৮ সালের মে মাসে এক চরম বিতর্কিত নির্বাচনের (Disputed election) মাধ্যমে তিনি দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হন, যেখানে তিনি দাবি করেন ৬৮ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। এরপর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতা দখল করে এক যুগের রাজত্ব পূর্ণ করেন তিনি। প্রতিটি নির্বাচনের পরই বিরোধীরা কারচুপির অভিযোগ তুললেও মাদুরো তার ক্ষমতা ধরে রাখতে সমর্থ হন।
২০১৭ সালের আগস্টে মাদুরো একটি জাতীয় সাংবিধানিক পরিষদ (National Constituent Assembly) গঠন করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেন। বিরোধীদের অভিযোগ, এটি ছিল স্রেফ নিজের ক্ষমতা আরও সুসংহত করার কৌশল। গত ১২ বছরে যখনই মানুষ রাজপথে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে, মাদুরো কঠোর হাতে তা দমন করেছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এখন তাকে সরাসরি ‘স্বৈরশাসক’ (Dictator) হিসেবে অভিহিত করতে কুণ্ঠা বোধ করছে না।
আটলান্টিক মহাসাগরের পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে মাদুরোর সম্পর্ক সবসময়ই যুদ্ধকালীন উত্তেজনার মতো। আমেরিকার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা (Economic sanctions), তেল বাণিজ্যে অবরোধ (Oil embargo), এবং সমুদ্রপথে নৌযানে হামলার মতো রাজনৈতিক চাপের মুখেও মাদুরো নতিস্বীকার করেননি। মার্কিন রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাশিয়ার মতো পরাশক্তির সমর্থনে তিনি আজও ক্ষমতার কেন্দ্রে টিকে আছেন।
প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বিশেষ করে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) আমলে মাদুরো হয়ে ওঠেন হোয়াইট হাউসের প্রধান লক্ষ্য। মাদুরো নিজেকে ভেনেজুয়েলার সমাজতান্ত্রিক প্রকল্পের রক্ষক হিসেবে দাবি করলেও, ওয়াশিংটন তার ওপর অসংখ্য অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা (US sanctions on Venezuela) জারি করে। মাদুরোর অভিযোগ, আমেরিকা মাদক যুদ্ধের বাহানায় আসলে ভেনেজুয়েলার তেলের খনি (Venezuela’s oil fields) দখল করতে চায়।
২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর ২০১৯ সালে মাদুরোর বিরুদ্ধে জোর করে ক্ষমতা দখলের অভিযোগ ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রসহ ৫০টিরও বেশি দেশ তাকে বৈধ রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মানতে নারাজ। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের নির্বাচনেও বিরোধীদের দাবি নাকচ করে মাদুরো জয়ী হন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী প্রার্থী এডমুন্ডো গঞ্জালেজকে (Edmundo Gonzalez) ‘নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু সেনাবাহিনী ও পুলিশের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকায় মাদুরো তার গদি ছাড়েননি।
যুক্তরাষ্ট্রের গুরুতর অভিযোগ হলো, মাদুরো তার দেশের জেলখানা আর পাগলা গারদ খালি করে অপরাধীদের আমেরিকায় পাঠিয়ে দিচ্ছেন। ট্রাম্পের দাবি, ভেনেজুয়েলার অপরাধী দলগুলোর নেতা খোদ মাদুরো। বিশেষ করে ফেন্টানিল ও কোকেন (Fentanyl and Cocaine smuggling) পাচার নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা চরমে। মাদুরো অবশ্য এই ‘নার্কো-টেরোরিজম’ বা মাদক সন্ত্রাসের অভিযোগ বরাবরের মতোই অস্বীকার করে আসছেন।
























