ঢাকা ০২:৩১ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬, ৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতিসংঘের মহাসচিবের দৌড়ে এগিয়ে গ্রিনস্প্যান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০১:৪২:৫৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬
  • / 4

যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক চাপ ও সংস্কারের দাবির মধ্যে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের লড়াই জমে উঠেছে। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উত্তরসূরি হতে প্রতিযোগিতায় রয়েছেন আটজন। প্রথম অনানুষ্ঠানিক ভোটে সবচেয়ে বেশি সমর্থন পেয়েছেন কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান।

গুতেরেসের দ্বিতীয় পাঁচ বছরের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হবে। এরপর নতুন মহাসচিব দায়িত্ব নেবেন।

আট প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজন নারী ও তিনজন পুরুষ। লাতিন আমেরিকার প্রার্থীদের সংখ্যাই বেশি। প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন—কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান, আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রসি, চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল বাচেলেত, ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা, গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যারোলিন রড্রিগেস-বির্কেট, ইকুয়েডরের ইভোনে এ-বাকি, সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল এবং উগান্ডার ওলার ওতুন্নু।

প্রথম ভোটে এগিয়ে গ্রিনস্প্যান
প্রার্থীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন রেবেকা গ্রিনস্প্যান। তিনি জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা ইউএন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ইউএনট্রেড) প্রধান। এর আগে কোস্টারিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

জুলাইয়ের শেষ দিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের প্রথম অনানুষ্ঠানিক ‘স্ট্র পোল’-এ সবচেয়ে বেশি সমর্থন পান গ্রিনস্প্যান। তার পরে ছিলেন গায়ানার ক্যারোলিন রড্রিগেস-বির্কেট ও আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রসি। তবে এখনো কোনো প্রার্থী চূড়ান্তভাবে এগিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থান তৈরি করতে পারেননি।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেনের খাদ্যশস্য এবং রাশিয়ার খাদ্য ও সার রপ্তানি স্বাভাবিক রাখতে জাতিসংঘের উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন গ্রিনস্প্যান। এতে তার আন্তর্জাতিক পরিচিতি আরও বাড়ে।

গ্রসির পরমাণু কূটনীতি
আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রসি বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং ইউক্রেনের জাপোরিঝিয়া পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার ভূমিকা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, পরমাণু ঝুঁকি ও সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক যোগাযোগের অভিজ্ঞতা তার বড় শক্তি। প্রথম অনানুষ্ঠানিক ভোটেও তিনি শীর্ষ তিনে ছিলেন।

বাচেলেতের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা
চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল বাচেলেতও গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী। তিনি দুই মেয়াদে চিলির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। পরে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন।

মানবাধিকার বিষয়ে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তার অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও রয়েছে। বিশেষ করে চীনের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশের পর বেইজিংয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল।

এসপিনোসার সংস্কারের পরিকল্পনা
ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাবেক সভাপতি মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করার পক্ষে।

সংঘাত ও সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘকে আরও সক্রিয় করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। সংঘাতের সম্ভাব্য লক্ষণ আগেভাগে শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও বলেছেন এসপিনোসা।

রড্রিগেস-বির্কেটও আলোচনায়
গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘে দেশটির রাষ্ট্রদূত ক্যারোলিন রড্রিগেস-বির্কেট প্রথম অনানুষ্ঠানিক ভোটে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন।

জাতিসংঘের শান্তি ও নিরাপত্তার পাশাপাশি উন্নয়ন ও মানবাধিকারকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করাও তার প্রচারণার অন্যতম বিষয়।

নতুন প্রার্থী ইভোনে এ-বাকি
ইভোনে এ-বাকি প্রতিযোগিতার সবচেয়ে নতুন মুখ। ১৭ আগস্ট টোঙ্গার মনোনয়নে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতায় যুক্ত হন। ফলে ইকুয়েডর থেকে এখন দুজন প্রার্থী রয়েছেন।

এ-বাকি ইকুয়েডরের সাবেক মন্ত্রী। তিনি ফ্রান্স, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতিসংঘকে যুদ্ধ প্রতিরোধে আরও সক্রিয় ও ফলাফলভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

লেবাননে গৃহযুদ্ধের সময় সেখানে থাকার অভিজ্ঞতাও রয়েছে এ-বাকির। সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি সংঘাত শুরু হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধে জাতিসংঘের আরও সক্রিয় ভূমিকার পক্ষে মত দিয়েছেন।

আফ্রিকার একমাত্র প্রার্থী ম্যাকি সাল
সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল আট প্রার্থীর মধ্যে একমাত্র আফ্রিকান প্রার্থী। তিনি শান্তি ও উন্নয়নকে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় হিসেবে দেখেন।

তবে সেনেগালে তার শাসনামলে রাজনৈতিক বিক্ষোভ মোকাবিলায় সরকারের কঠোর অবস্থান নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। ফলে তার রাজনৈতিক অতীতও প্রার্থিতার ক্ষেত্রে আলোচনায় আসতে পারে।

ওতুন্নুর জাতিসংঘ অভিজ্ঞতা
উগান্ডার কূটনীতিক ওলার ওতুন্নুর জাতিসংঘে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। সাবেক মহাসচিব কফি আনানের সময়ে তিনি শিশু ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি জেনারেল ও বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বর্তমানে ৭৫ বছর বয়সী ওতুন্নু জাতিসংঘের সংস্কার ও নৈতিক নেতৃত্বের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। সম্প্রতি এক সংলাপে তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি আগের মতোই চলতে থাকলে এর ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

নিরাপত্তা পরিষদের ভোট কেন গুরুত্বপূর্ণ
জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনে নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীকে সুপারিশ করবে। এরপর সাধারণ পরিষদ তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ দেবে।

একজন প্রার্থীকে নিরাপত্তা পরিষদের অন্তত নয়টি ভোট পেতে হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স—এই পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কোনো একটি দেশ ভেটো দিলে তার প্রার্থিতা আটকে যেতে পারে।

তাই প্রথম অনানুষ্ঠানিক ভোটে কে কত ভোট পেয়েছেন, তার চেয়ে বড় বিষয় হলো কোন প্রার্থী বড় শক্তিগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারেন।

দ্বিতীয় ভোটে কী হতে পারে
প্রথম ভোটে গ্রিনস্প্যান এগিয়ে থাকলেও প্রতিযোগিতা এখনো উন্মুক্ত। ২১ আগস্ট নিরাপত্তা পরিষদে দ্বিতীয় অনানুষ্ঠানিক ভোট হওয়ার কথা ছিল। নতুন প্রার্থী এ-বাকি প্রথম ভোটে ছিলেন না। ফলে দ্বিতীয় দফার ভোটে তার অবস্থান নিয়েও আগ্রহ রয়েছে।

কূটনীতিকদের ধারণা, একাধিক দফায় ভোট হতে পারে এবং প্রক্রিয়া সেপ্টেম্বরের শেষ বা অক্টোবর পর্যন্ত গড়াতে পারে। কোনো প্রার্থীকে নিয়ে ঐকমত্য তৈরি না হলে সময় আরও বাড়তে পারে।

প্রথম নারী মহাসচিবের সম্ভাবনা
এবারের প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারী প্রার্থীদের সংখ্যা। আট প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজন নারী। জাতিসংঘের ইতিহাসে এখনো কোনো নারী মহাসচিব হননি।

এবার সেই ইতিহাস বদলের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে নারী প্রার্থী হওয়াই যথেষ্ট নয়। তাকে নিরাপত্তা পরিষদের প্রয়োজনীয় সমর্থনের পাশাপাশি পাঁচ স্থায়ী সদস্যের গ্রহণযোগ্যতাও অর্জন করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত কে হবেন
এই মুহূর্তে রেবেকা গ্রিনস্প্যানকে প্রাথমিকভাবে এগিয়ে থাকা প্রার্থী বলা যায়। তবে নিরাপত্তা পরিষদের ভোটে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।

গ্রসির আন্তর্জাতিক পরিচিতি, রড্রিগেস-বির্কেটের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা, বাচেলেতের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার অভিজ্ঞতা এবং নতুন প্রার্থী এ-বাকির সম্ভাব্য সমর্থন—সব মিলিয়ে প্রতিযোগিতাটি এখনো উন্মুক্ত।

গুতেরেসের উত্তরসূরিকে এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিতে হবে, যখন জাতিসংঘ যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, ভূরাজনৈতিক বিভাজন ও সংস্কারের চাপের মুখে রয়েছে। তাই নতুন মহাসচিবের জন্য বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রেখে শান্তি, মানবাধিকার ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হবে। সূত্র: ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর

নিউজটি শেয়ার করুন

জাতিসংঘের মহাসচিবের দৌড়ে এগিয়ে গ্রিনস্প্যান

আপডেট সময় : ০১:৪২:৫৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬

যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক চাপ ও সংস্কারের দাবির মধ্যে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের লড়াই জমে উঠেছে। বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উত্তরসূরি হতে প্রতিযোগিতায় রয়েছেন আটজন। প্রথম অনানুষ্ঠানিক ভোটে সবচেয়ে বেশি সমর্থন পেয়েছেন কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান।

গুতেরেসের দ্বিতীয় পাঁচ বছরের মেয়াদ চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষ হবে। এরপর নতুন মহাসচিব দায়িত্ব নেবেন।

আট প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজন নারী ও তিনজন পুরুষ। লাতিন আমেরিকার প্রার্থীদের সংখ্যাই বেশি। প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন—কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান, আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রসি, চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল বাচেলেত, ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা, গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যারোলিন রড্রিগেস-বির্কেট, ইকুয়েডরের ইভোনে এ-বাকি, সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল এবং উগান্ডার ওলার ওতুন্নু।

প্রথম ভোটে এগিয়ে গ্রিনস্প্যান
প্রার্থীদের মধ্যে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন রেবেকা গ্রিনস্প্যান। তিনি জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা ইউএন ট্রেড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ইউএনট্রেড) প্রধান। এর আগে কোস্টারিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট ও অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।

জুলাইয়ের শেষ দিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের প্রথম অনানুষ্ঠানিক ‘স্ট্র পোল’-এ সবচেয়ে বেশি সমর্থন পান গ্রিনস্প্যান। তার পরে ছিলেন গায়ানার ক্যারোলিন রড্রিগেস-বির্কেট ও আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রসি। তবে এখনো কোনো প্রার্থী চূড়ান্তভাবে এগিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থান তৈরি করতে পারেননি।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় কৃষ্ণসাগর দিয়ে ইউক্রেনের খাদ্যশস্য এবং রাশিয়ার খাদ্য ও সার রপ্তানি স্বাভাবিক রাখতে জাতিসংঘের উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন গ্রিনস্প্যান। এতে তার আন্তর্জাতিক পরিচিতি আরও বাড়ে।

গ্রসির পরমাণু কূটনীতি
আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রসি বর্তমানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং ইউক্রেনের জাপোরিঝিয়া পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার ভূমিকা রয়েছে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, পরমাণু ঝুঁকি ও সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক যোগাযোগের অভিজ্ঞতা তার বড় শক্তি। প্রথম অনানুষ্ঠানিক ভোটেও তিনি শীর্ষ তিনে ছিলেন।

বাচেলেতের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা
চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল বাচেলেতও গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী। তিনি দুই মেয়াদে চিলির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। পরে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব পালন করেন।

মানবাধিকার বিষয়ে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তার অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও রয়েছে। বিশেষ করে চীনের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশের পর বেইজিংয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল।

এসপিনোসার সংস্কারের পরিকল্পনা
ইকুয়েডরের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাবেক সভাপতি মারিয়া ফার্নান্দা এসপিনোসা জাতিসংঘকে আরও কার্যকর করার পক্ষে।

সংঘাত ও সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘকে আরও সক্রিয় করার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। সংঘাতের সম্ভাব্য লক্ষণ আগেভাগে শনাক্ত করার সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও বলেছেন এসপিনোসা।

রড্রিগেস-বির্কেটও আলোচনায়
গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসংঘে দেশটির রাষ্ট্রদূত ক্যারোলিন রড্রিগেস-বির্কেট প্রথম অনানুষ্ঠানিক ভোটে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন।

জাতিসংঘের শান্তি ও নিরাপত্তার পাশাপাশি উন্নয়ন ও মানবাধিকারকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসংঘের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করাও তার প্রচারণার অন্যতম বিষয়।

নতুন প্রার্থী ইভোনে এ-বাকি
ইভোনে এ-বাকি প্রতিযোগিতার সবচেয়ে নতুন মুখ। ১৭ আগস্ট টোঙ্গার মনোনয়নে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতায় যুক্ত হন। ফলে ইকুয়েডর থেকে এখন দুজন প্রার্থী রয়েছেন।

এ-বাকি ইকুয়েডরের সাবেক মন্ত্রী। তিনি ফ্রান্স, কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতিসংঘকে যুদ্ধ প্রতিরোধে আরও সক্রিয় ও ফলাফলভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

লেবাননে গৃহযুদ্ধের সময় সেখানে থাকার অভিজ্ঞতাও রয়েছে এ-বাকির। সেই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি সংঘাত শুরু হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধে জাতিসংঘের আরও সক্রিয় ভূমিকার পক্ষে মত দিয়েছেন।

আফ্রিকার একমাত্র প্রার্থী ম্যাকি সাল
সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি সাল আট প্রার্থীর মধ্যে একমাত্র আফ্রিকান প্রার্থী। তিনি শান্তি ও উন্নয়নকে পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয় হিসেবে দেখেন।

তবে সেনেগালে তার শাসনামলে রাজনৈতিক বিক্ষোভ মোকাবিলায় সরকারের কঠোর অবস্থান নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল। ফলে তার রাজনৈতিক অতীতও প্রার্থিতার ক্ষেত্রে আলোচনায় আসতে পারে।

ওতুন্নুর জাতিসংঘ অভিজ্ঞতা
উগান্ডার কূটনীতিক ওলার ওতুন্নুর জাতিসংঘে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। সাবেক মহাসচিব কফি আনানের সময়ে তিনি শিশু ও সশস্ত্র সংঘাতবিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি জেনারেল ও বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

বর্তমানে ৭৫ বছর বয়সী ওতুন্নু জাতিসংঘের সংস্কার ও নৈতিক নেতৃত্বের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। সম্প্রতি এক সংলাপে তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি আগের মতোই চলতে থাকলে এর ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

নিরাপত্তা পরিষদের ভোট কেন গুরুত্বপূর্ণ
জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচনে নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ একজন প্রার্থীকে সুপারিশ করবে। এরপর সাধারণ পরিষদ তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব হিসেবে নিয়োগ দেবে।

একজন প্রার্থীকে নিরাপত্তা পরিষদের অন্তত নয়টি ভোট পেতে হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স—এই পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কোনো একটি দেশ ভেটো দিলে তার প্রার্থিতা আটকে যেতে পারে।

তাই প্রথম অনানুষ্ঠানিক ভোটে কে কত ভোট পেয়েছেন, তার চেয়ে বড় বিষয় হলো কোন প্রার্থী বড় শক্তিগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারেন।

দ্বিতীয় ভোটে কী হতে পারে
প্রথম ভোটে গ্রিনস্প্যান এগিয়ে থাকলেও প্রতিযোগিতা এখনো উন্মুক্ত। ২১ আগস্ট নিরাপত্তা পরিষদে দ্বিতীয় অনানুষ্ঠানিক ভোট হওয়ার কথা ছিল। নতুন প্রার্থী এ-বাকি প্রথম ভোটে ছিলেন না। ফলে দ্বিতীয় দফার ভোটে তার অবস্থান নিয়েও আগ্রহ রয়েছে।

কূটনীতিকদের ধারণা, একাধিক দফায় ভোট হতে পারে এবং প্রক্রিয়া সেপ্টেম্বরের শেষ বা অক্টোবর পর্যন্ত গড়াতে পারে। কোনো প্রার্থীকে নিয়ে ঐকমত্য তৈরি না হলে সময় আরও বাড়তে পারে।

প্রথম নারী মহাসচিবের সম্ভাবনা
এবারের প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারী প্রার্থীদের সংখ্যা। আট প্রার্থীর মধ্যে পাঁচজন নারী। জাতিসংঘের ইতিহাসে এখনো কোনো নারী মহাসচিব হননি।

এবার সেই ইতিহাস বদলের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে নারী প্রার্থী হওয়াই যথেষ্ট নয়। তাকে নিরাপত্তা পরিষদের প্রয়োজনীয় সমর্থনের পাশাপাশি পাঁচ স্থায়ী সদস্যের গ্রহণযোগ্যতাও অর্জন করতে হবে।

শেষ পর্যন্ত কে হবেন
এই মুহূর্তে রেবেকা গ্রিনস্প্যানকে প্রাথমিকভাবে এগিয়ে থাকা প্রার্থী বলা যায়। তবে নিরাপত্তা পরিষদের ভোটে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে।

গ্রসির আন্তর্জাতিক পরিচিতি, রড্রিগেস-বির্কেটের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা, বাচেলেতের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার অভিজ্ঞতা এবং নতুন প্রার্থী এ-বাকির সম্ভাব্য সমর্থন—সব মিলিয়ে প্রতিযোগিতাটি এখনো উন্মুক্ত।

গুতেরেসের উত্তরসূরিকে এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিতে হবে, যখন জাতিসংঘ যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট, ভূরাজনৈতিক বিভাজন ও সংস্কারের চাপের মুখে রয়েছে। তাই নতুন মহাসচিবের জন্য বিশ্বশক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য রেখে শান্তি, মানবাধিকার ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হবে। সূত্র: ফ্রান্স টুয়েন্টিফোর