ঢাকা ০১:৫৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬, ১২ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাড়ে তিন বছরে বন্ধ ২৮৭ পোশাক কারখানা, কর্মহীন পৌনে ২ লাখ

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০১:৩১:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬
  • / 2

বাড়তি উৎপাদন ব্যয়, অর্থায়ন সংকট, কমে যাওয়া ক্রয়াদেশ এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তায় সংকটে পড়েছে দেশের তৈরি পোশাক খাত। গত সাড়ে তিন বছরে দেশের ২৮৭টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে কর্মহীন হয়েছেন প্রায় পৌনে দুই লাখ শ্রমিক।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ২৭টি কারখানা বন্ধ হয়ে ৮ হাজার ৯২০ শ্রমিক চাকরি হারান। ২০২৪ সালে বন্ধ হয় আরও ৬১টি কারখানা। ওই বছর কর্মহীন হন ৩৯ হাজার ৪৭০ শ্রমিক।

তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২০২৫ সালে। ওই বছর ১৬৮টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৭৫ শতাংশ বেশি। এসব কারখানায় কর্মরত ১ লাখ ৮ হাজারের বেশি শ্রমিক চাকরি হারান।

পরিসংখ্যান বলছে, শুধু কারখানা বন্ধের সংখ্যাই নয়, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর আকারও বাড়ছে। ২০২৩ সালে বন্ধ হওয়া একটি কারখানায় গড়ে প্রায় ৩৩০ শ্রমিক কাজ করতেন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬৫০ জনে।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের দামের চাপের বিপরীতে দেশে উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় পোশাক কারখানাগুলোর মুনাফার পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে ব্যাংকঋণ পাওয়া কঠিন হওয়া এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে অনেক কারখানার উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, পোশাক খাতের বর্তমান সংকট কাটাতে সক্ষম কিন্তু আর্থিক সমস্যায় পড়া কারখানাগুলোকে পুনরায় অর্থায়নের আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসার ব্যয় কমানোর উদ্যোগও জরুরি।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, কাঁচামাল ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে অর্থায়নের সংকট, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে বর্তমান পরিস্থিতি। বিশেষ করে জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সময়মতো রপ্তানি পণ্য সরবরাহ নিয়েও চাপ তৈরি হচ্ছে।

চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত আরও ৩১টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে চাকরি হারিয়েছেন ১৬ হাজার ৭০০ শ্রমিক। অবশ্য একই সময়ে ৪০ উদ্যোক্তা নতুন কারখানা স্থাপন করেছেন বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাময়িক আর্থিক সংকটে বন্ধ হয়ে যাওয়া সক্ষম কারখানাগুলোকে পুনরায় চালু করতে নীতিগত সহায়তার পাশাপাশি সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। সুদহার, ঋণপ্রাপ্তি, জ্বালানি সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যয়ে স্থিতিশীলতা না এলে নতুন বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্ধ হয়ে যাওয়া সক্ষম কারখানা পুনরুজ্জীবনের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ও টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। উৎপাদন ব্যয় কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপরও জোর দিতে হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, পোশাক খাতের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাতের ঋণঝুঁকি ও শিল্প বিনিয়োগেও পড়তে পারে। তাই কারখানা চালু রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

সাড়ে তিন বছরে বন্ধ ২৮৭ পোশাক কারখানা, কর্মহীন পৌনে ২ লাখ

আপডেট সময় : ০১:৩১:১৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ অগাস্ট ২০২৬

বাড়তি উৎপাদন ব্যয়, অর্থায়ন সংকট, কমে যাওয়া ক্রয়াদেশ এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তায় সংকটে পড়েছে দেশের তৈরি পোশাক খাত। গত সাড়ে তিন বছরে দেশের ২৮৭টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে কর্মহীন হয়েছেন প্রায় পৌনে দুই লাখ শ্রমিক।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ২৭টি কারখানা বন্ধ হয়ে ৮ হাজার ৯২০ শ্রমিক চাকরি হারান। ২০২৪ সালে বন্ধ হয় আরও ৬১টি কারখানা। ওই বছর কর্মহীন হন ৩৯ হাজার ৪৭০ শ্রমিক।

তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ২০২৫ সালে। ওই বছর ১৬৮টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৭৫ শতাংশ বেশি। এসব কারখানায় কর্মরত ১ লাখ ৮ হাজারের বেশি শ্রমিক চাকরি হারান।

পরিসংখ্যান বলছে, শুধু কারখানা বন্ধের সংখ্যাই নয়, বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর আকারও বাড়ছে। ২০২৩ সালে বন্ধ হওয়া একটি কারখানায় গড়ে প্রায় ৩৩০ শ্রমিক কাজ করতেন। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬৫০ জনে।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের দামের চাপের বিপরীতে দেশে উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় পোশাক কারখানাগুলোর মুনাফার পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এর সঙ্গে ব্যাংকঋণ পাওয়া কঠিন হওয়া এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা যুক্ত হয়ে অনেক কারখানার উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, পোশাক খাতের বর্তমান সংকট কাটাতে সক্ষম কিন্তু আর্থিক সমস্যায় পড়া কারখানাগুলোকে পুনরায় অর্থায়নের আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহে স্থিতিশীলতা এবং ব্যবসার ব্যয় কমানোর উদ্যোগও জরুরি।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, কাঁচামাল ও উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতে অর্থায়নের সংকট, ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া এবং গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে বর্তমান পরিস্থিতি। বিশেষ করে জ্বালানি সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সময়মতো রপ্তানি পণ্য সরবরাহ নিয়েও চাপ তৈরি হচ্ছে।

চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত আরও ৩১টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে চাকরি হারিয়েছেন ১৬ হাজার ৭০০ শ্রমিক। অবশ্য একই সময়ে ৪০ উদ্যোক্তা নতুন কারখানা স্থাপন করেছেন বলে জানিয়েছে বিজিএমইএ।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাময়িক আর্থিক সংকটে বন্ধ হয়ে যাওয়া সক্ষম কারখানাগুলোকে পুনরায় চালু করতে নীতিগত সহায়তার পাশাপাশি সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। সুদহার, ঋণপ্রাপ্তি, জ্বালানি সরবরাহ ও উৎপাদন ব্যয়ে স্থিতিশীলতা না এলে নতুন বিনিয়োগও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্ধ হয়ে যাওয়া সক্ষম কারখানা পুনরুজ্জীবনের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ ও টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করা জরুরি। উৎপাদন ব্যয় কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির ওপরও জোর দিতে হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, পোশাক খাতের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাতের ঋণঝুঁকি ও শিল্প বিনিয়োগেও পড়তে পারে। তাই কারখানা চালু রাখার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।