ঢাকা ০৪:১৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের ব্যাংক নির্ভরতা

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৩:১৭:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
  • / 21

ঘনিয়ে আসছে আরও একটি অর্থ বছর। নতুন বাজেট মানেই নতুন প্রত্যাশা, তবে অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে বড় দুশ্চিন্তার নাম ‘বাজেট ঘাটতি’। আর এই ঘাটতি মেটাতে সরকারের প্রধান ভরসা ব্যাংক খাত। প্রশ্ন উঠেছে, সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো কি পারবে সরকারের ঋণের এই বিশাল বোঝা আর সইতে?

প্রতিবারের মতো এবারও বড় দুশ্চিন্তার জায়গা—বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের ব্যাংক নির্ভরতা। বিগত পাঁচ বছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে লাগামহীনভাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানের তারল্য সংকটের এই সময়ে সরকার যদি আবারও ব্যাংক থেকেই বড় অঙ্কের ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা করে, তবে নতুন করে সংকটে পড়বে দেশের বেসরকারি খাত, নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপরে।

বিগত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান বলছে, ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। ২০২০-২১ অর্থ বছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা। পরের বছর তা কিছুটা কমলেও ২০২২-২৩ অর্থ বছরে প্রথমবারের মতো ১ লাখ কোটি টাকার ঘর ছাড়িয়ে যায়।

আর ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে তা গিয়ে ঠেকেছে রেকর্ড ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানে সরকারের ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৬২ শতাংশ। যদিও চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কিছুটা লাগাম টেনে ধরেছিলো অন্তর্বর্তী সরকার।

ব্যাংক থেকে সরকারের এই বাড়তি ঋণ নেয়া কেবল বেসরকারি বিনিয়োগই কমায় না, বরং এটি বাজারে মুদ্রাস্ফীতি উস্কে দেয়। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলছেন, সরকার যখন ব্যাংক থেকে টাকা নেয়, তখন বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সরকার যদি বড় করতে থাকে, তাহলে দেখা যাবে ব্যাংকের কোর ইনকাম আর থাকছে না। ইনকাম মার্জিন এখন কিন্তু আর তেমন নেই। সব ব্যাংকগুলো কিন্তু এখন প্রফিট করার চেষ্টা করছে। সেটা সরকারের নিরাপত্তার মাধ্যমে বা কোনো কোনো সময় যদি ফরেন অ্যাকসেস ভলাটিলিটি আসে, সেখান থেকে। তাই কোর রেভিনিউ নেই যেখানে, সেখানে ব্যাংকগুলোর সাস্টেইনেবিলিটি প্রশ্নের মুখে।’

ইতিহাস বলছে, বছর শেষে সরকার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ঋণ নিয়ে ফেলে। যেমন গত অর্থ বছরেও সংশোধিত বাজেটে ঋণের পরিমাণ অনেক বাড়ানো হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার সেই পথে হাঁটলে ভেঙে পড়তে পারে অনেক দুর্বল ব্যাংকের মেরুদণ্ড।

অর্থনীতিবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহাদৎ হোসাইন সিদ্দিকী বলেন, ‘যে কয়েকটা সবল ব্যাংক আছে, তাদের কাছ থেকেও রাষ্ট্র ইচ্ছা করলেই সংগ্রহ করতে পারে। সেটা যদি করে, তাহলে তো প্রকৃতপক্ষে বেসরকারি বিনিয়োগ যেটা তলানিতে রয়েছে, সেখানে দীর্ঘ ১৮-১৯ বছর পেছনে চলে যাচ্ছি। অতএব, সেই জায়গায় আমি মনে করি, রাষ্ট্রের সমষ্টিক অর্থনীতির অব্যবস্থপনার কারণে, এখন সৃষ্ট সমস্যা, সেই সমস্যার সমাধানে আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মারবে।’

বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘যেই ডেফিসিট থাকে, সেটা আপনি ব্যাংকের কাছ থেকে বড় না করে, বরং সিকিউরিটি মার্কেটে এই বন্ডগুলো ছাড়েন। সেখানে সাধারণ জনগণের কাছ থেকে আপনি টাকাগুলো বড় করেন। এতে ফাইনান্সিয়াল মার্কেটটা বড় হবে।’

দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড বলা হয় ব্যাংক খাতকে। তবে সেই হৃৎপিণ্ড যদি নিজেই অক্সিজেন সংকটে ভোগে, তবে পুরো অর্থনীতিই ঝুঁকির মুখে পড়বে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের ব্যাংক নির্ভরতা

আপডেট সময় : ০৩:১৭:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬

ঘনিয়ে আসছে আরও একটি অর্থ বছর। নতুন বাজেট মানেই নতুন প্রত্যাশা, তবে অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে বড় দুশ্চিন্তার নাম ‘বাজেট ঘাটতি’। আর এই ঘাটতি মেটাতে সরকারের প্রধান ভরসা ব্যাংক খাত। প্রশ্ন উঠেছে, সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো কি পারবে সরকারের ঋণের এই বিশাল বোঝা আর সইতে?

প্রতিবারের মতো এবারও বড় দুশ্চিন্তার জায়গা—বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের ব্যাংক নির্ভরতা। বিগত পাঁচ বছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে লাগামহীনভাবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানের তারল্য সংকটের এই সময়ে সরকার যদি আবারও ব্যাংক থেকেই বড় অঙ্কের ঋণ নেয়ার পরিকল্পনা করে, তবে নতুন করে সংকটে পড়বে দেশের বেসরকারি খাত, নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপরে।

বিগত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান বলছে, ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। ২০২০-২১ অর্থ বছরে লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা। পরের বছর তা কিছুটা কমলেও ২০২২-২৩ অর্থ বছরে প্রথমবারের মতো ১ লাখ কোটি টাকার ঘর ছাড়িয়ে যায়।

আর ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে তা গিয়ে ঠেকেছে রেকর্ড ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানে সরকারের ব্যাংক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৬২ শতাংশ। যদিও চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কিছুটা লাগাম টেনে ধরেছিলো অন্তর্বর্তী সরকার।

ব্যাংক থেকে সরকারের এই বাড়তি ঋণ নেয়া কেবল বেসরকারি বিনিয়োগই কমায় না, বরং এটি বাজারে মুদ্রাস্ফীতি উস্কে দেয়। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলছেন, সরকার যখন ব্যাংক থেকে টাকা নেয়, তখন বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘সরকার যদি বড় করতে থাকে, তাহলে দেখা যাবে ব্যাংকের কোর ইনকাম আর থাকছে না। ইনকাম মার্জিন এখন কিন্তু আর তেমন নেই। সব ব্যাংকগুলো কিন্তু এখন প্রফিট করার চেষ্টা করছে। সেটা সরকারের নিরাপত্তার মাধ্যমে বা কোনো কোনো সময় যদি ফরেন অ্যাকসেস ভলাটিলিটি আসে, সেখান থেকে। তাই কোর রেভিনিউ নেই যেখানে, সেখানে ব্যাংকগুলোর সাস্টেইনেবিলিটি প্রশ্নের মুখে।’

ইতিহাস বলছে, বছর শেষে সরকার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ঋণ নিয়ে ফেলে। যেমন গত অর্থ বছরেও সংশোধিত বাজেটে ঋণের পরিমাণ অনেক বাড়ানো হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার সেই পথে হাঁটলে ভেঙে পড়তে পারে অনেক দুর্বল ব্যাংকের মেরুদণ্ড।

অর্থনীতিবিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শাহাদৎ হোসাইন সিদ্দিকী বলেন, ‘যে কয়েকটা সবল ব্যাংক আছে, তাদের কাছ থেকেও রাষ্ট্র ইচ্ছা করলেই সংগ্রহ করতে পারে। সেটা যদি করে, তাহলে তো প্রকৃতপক্ষে বেসরকারি বিনিয়োগ যেটা তলানিতে রয়েছে, সেখানে দীর্ঘ ১৮-১৯ বছর পেছনে চলে যাচ্ছি। অতএব, সেই জায়গায় আমি মনে করি, রাষ্ট্রের সমষ্টিক অর্থনীতির অব্যবস্থপনার কারণে, এখন সৃষ্ট সমস্যা, সেই সমস্যার সমাধানে আরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছুড়ে মারবে।’

বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘যেই ডেফিসিট থাকে, সেটা আপনি ব্যাংকের কাছ থেকে বড় না করে, বরং সিকিউরিটি মার্কেটে এই বন্ডগুলো ছাড়েন। সেখানে সাধারণ জনগণের কাছ থেকে আপনি টাকাগুলো বড় করেন। এতে ফাইনান্সিয়াল মার্কেটটা বড় হবে।’

দেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড বলা হয় ব্যাংক খাতকে। তবে সেই হৃৎপিণ্ড যদি নিজেই অক্সিজেন সংকটে ভোগে, তবে পুরো অর্থনীতিই ঝুঁকির মুখে পড়বে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।