ঢাকা ০২:৫৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকা-কক্সবাজারসহ ছয় রুটে বাড়ল ট্রেনের ভাড়া

অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০১:২৩:০৭ অপরাহ্ন, রোববার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / 280
305

সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী বাহন হিসেবে পরিচিত রেলে ভ্রমণের খরচ এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে গেল। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে যাতায়াতে যাত্রীদের পকেট থেকে এখন বাড়তি টাকা খসবে। গতকাল (শনিবার, ২০ ডিসেম্বর) থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-কক্সবাজারসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি রুটে ট্রেনের ভাড়া বৃদ্ধি (Train Fare Hike) কার্যকর হয়েছে। রেলওয়ের গত ১৩ বছরের ইতিহাসে এটি অন্তত পঞ্চম দফা ভাড়া বৃদ্ধির ঘটনা।

একনজরে: ট্রেনের নতুন ভাড়া ও বৃদ্ধির কারণ
কার্যকর: শনিবার (২০ ডিসেম্বর ২০২৫) থেকে নতুন ভাড়া কার্যকর হয়েছে।
বৃদ্ধির ধরণ: সরাসরি ভাড়া না বাড়িয়ে ‘পন্টেজ চার্জ’ (সেতুর মাশুল) আরোপের মাধ্যমে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।
হিসাবের পদ্ধতি: ১০০ মিটারের বেশি লম্বা সেতুর ক্ষেত্রে ১ কি.মি. সেতুকে ২৫ কি.মি. দূরত্ব হিসেবে গণনা করা হচ্ছে।
প্রভাবিত রুট: ঢাকা-কক্সবাজার, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, চট্টগ্রাম-সিলেট, চট্টগ্রাম-জামালপুর এবং ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ।
ভাড়া বৃদ্ধির পরিমাণ: আসন ও রুটভেদে সর্বনিম্ন ৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২২৬ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
ইতিহাস: গত ১৩ বছরে এ নিয়ে অন্তত ৫ বার ট্রেনের ভাড়া বাড়ানো হলো।
সর্বোচ্চ বৃদ্ধি: ঢাকা-কক্সবাজার রুটে এসি বার্থের ভাড়া ২,৪৩০ টাকা থেকে বেড়ে ২,৬৫৬ টাকা হয়েছে।
জনপ্রিয় ট্রেন: সুবর্ণ এক্সপ্রেসের স্নিগ্ধা সিটের ভাড়া ৮৫৫ টাকা থেকে বেড়ে ৯৪৩ টাকা হয়েছে।

পন্টেজ চার্জ: ভাড়া বাড়ার নতুন কৌশল
এবার সরাসরি টিকিটের দাম না বাড়িয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পন্টেজ চার্জ বা মাশুল (Pontage Charge/Bridge Toll) আরোপের মাধ্যমে ভাড়া বাড়িয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ১০০ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের রেলসেতু পার হলে প্রতি ১ কিলোমিটার সেতুকে ২৫ কিলোমিটার দূরত্ব হিসেবে গণনা করা হবে। এর ফলে কাগজের কলমে পথের দূরত্ব বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীদের পকেট থেকে বাড়তি ৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২২৬ টাকা পর্যন্ত খসবে।

ভাড়া বাড়ল যেসব রুটে (Affected Routes)
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের ১১টি সেতুর ওপর এই পন্টেজ চার্জ কার্যকর হওয়ায় নিচের রুটগুলোতে ভাড়া বেড়েছে:

১. ঢাকা-চট্টগ্রাম (Dhaka-Chittagong Train Fare)

২. ঢাকা-কক্সবাজার (Dhaka-Cox’s Bazar Train Fare)

৩. ঢাকা-সিলেট (Dhaka-Sylhet Train Fare)

৪. চট্টগ্রাম-সিলেট (Chittagong-Sylhet)

৫. চট্টগ্রাম-জামালপুর (Chittagong-Jamalpur)

৬. ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ (Dhaka-Dewanganj)

কোন ট্রেনের ভাড়া কত?
কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও পর্যটক এক্সপ্রেস: ঢাকা-কক্সবাজার রুটে এসি বার্থের ভাড়া ২২৬ টাকা বেড়ে এখন ২,৬৫৬ টাকা এবং স্নিগ্ধা আসনের ভাড়া ১,৩২২ টাকা থেকে বেড়ে ১,৪৪৯ টাকা হয়েছে।

সুবর্ণ ও সোনার বাংলা এক্সপ্রেস: ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বিরতিহীন ট্রেনের স্নিগ্ধা আসনের ভাড়া ৮৫৫ টাকা থেকে বেড়ে ৯৪৩ টাকা হয়েছে।

শোভন চেয়ার ও মেইল ট্রেন: ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে শোভন চেয়ারের ভাড়া এখন ৪৫০ টাকা এবং মেইল ট্রেনের ভাড়া ১৫ টাকা বেড়ে ১৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

১৩ বছরে ৫ বার ভাড়া বৃদ্ধি
২০১২ সালে একলাফে ৫০% ভাড়া বৃদ্ধির পর ২০১৬, ২০২২ (ভ্যাট আরোপ), এবং ২০২৪ সালে রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহারের মাধ্যমে দফায় দফায় ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। এবারের পন্টেজ চার্জ (Bridge Surcharge) যাত্রীদের ওপর নতুন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে রেলের দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করে আয় বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে।

সরাসরি দাম না বাড়িয়ে যে কৌশলে বারবার বাড়ানো হলো ট্রেনের ভাড়া
সরাসরি টিকিটের দাম না বাড়িয়েও গত ১৩ বছরে অন্তত ৫ বার ট্রেনের ভাড়া বৃদ্ধি করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ২০১২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত বিভিন্ন কৌশলে কিলোমিটার প্রতি ভাড়া বৃদ্ধি, ভ্যাট আরোপ, রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার এবং সবশেষ পন্টেজ চার্জ (Pontage Charge) বা বাড়তি মাশুল যুক্ত করে যাত্রীদের ওপর খরচের বোঝা বাড়ানো হয়েছে।

কিলোমিটার প্রতি ভিত্তি ভাড়া বৃদ্ধি (Base Fare Hike)
রেলওয়ের ভাড়ার মূল ভিত্তি ছিল কিলোমিটার প্রতি ৩৬ পয়সা। ২০১২ সালে দীর্ঘ ২০ বছর পর একলাফে ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল ৫০ শতাংশ। এরপর ২০১৬ সালে কিলোমিটারে ভাড়া আরও ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়, যার ফলে প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ৩৯ পয়সায় দাঁড়ায়।

এসি ও প্রথম শ্রেণিতে ভ্যাট আরোপ (VAT on Tickets)
২০২২ সাল থেকে কৌশলে ভাড়া বাড়ানো হয় কর আদায়ের মাধ্যমে। আগে শুধু এসিতে ভ্যাট থাকলেও, সে বছরের জুলাই থেকে নন-এসি প্রথম শ্রেণির টিকিটের ওপরও ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট (VAT on Rail Ticket) আরোপ করা হয়।

অতিরিক্ত বগির জন্য বাড়তি ভাড়া (Extra Coach Surcharge)
২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে চালু হয় এক নতুন নিয়ম। বিশেষ ছুটির দিনে ট্রেনের মূল বগির বাইরে বাড়তি যে কোচগুলো লাগানো হয়, তার টিকিটের জন্য যথাক্রমে ৩০ শতাংশ (এসি) ও ২০ শতাংশ (নন-এসি) বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের। অর্থাৎ একই গন্তব্যে একই ট্রেনে দুই ধরনের ভাড়া কার্যকর রয়েছে।

রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার (Rebate Withdrawal)
দূরপাল্লার যাত্রীদের আকৃষ্ট করতে রেলওয়ে দীর্ঘকাল ধরে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত রেয়াতি বা ছাড় সুবিধা দিয়ে আসছিল। তবে ২০২৪ সালের মে মাসে এই রেয়াতি সুবিধা (Railway Rebate Facility) পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়। এর ফলে দূরপাল্লার ট্রেনের ভাড়া সরাসরি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।

পন্টেজ চার্জ বা সেতুর মাশুল (Pontage Charge Surcharge)
সবশেষ কৌশল হিসেবে আজ থেকে কার্যকর হয়েছে পন্টেজ চার্জ। ১০০ মিটারের বেশি দীর্ঘ সেতু পারাপারে ১ কিলোমিটার সেতুকে ২৫ কিলোমিটার দূরত্ব হিসেবে গণনা করা হচ্ছে। এর ফলে ঢাকা-কক্সবাজার বা ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের দূরত্ব কাগজে-কলমে বেড়ে যাওয়ায় টিকিটের দামও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে।

সুবর্ণ এক্সপ্রেসের ভাড়া বাড়ল ১৩ বছরে ১৪০ থেকে ৩৫৮ টাকা: পন্টেজ চার্জের ধাক্কায় যাত্রীরা নাজেহাল
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের অন্যতম জনপ্রিয় বিরতিহীন ট্রেন সুবর্ণ এক্সপ্রেস (Subarna Express)। ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া এই ট্রেনের ভাড়া গত ১৩ বছরে দফায় দফায় বৃদ্ধি পেয়েছে। কখনো ভিত্তি ভাড়া বাড়ানো, কখনো রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার, আর সর্বশেষ পন্টেজ চার্জ (Pontage Charge) বা সেতুর মাশুল যুক্ত হয়ে এই ট্রেনের ভাড়া এখন সাধারণ যাত্রীদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

সুবর্ণ এক্সপ্রেসের ভাড়ার বিবর্তন (Fare Evolution of Subarna Express)
রেকর্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১২ সালে সুবর্ণ এক্সপ্রেসের এসি বা স্নিগ্ধা আসনের ভাড়া (Snigdha Seat Fare) ছিল মাত্র ৫৮৫ টাকা। ২০১৬ সালে প্রতি কিলোমিটারে ভিত্তি ভাড়া বাড়ানোর পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭২৫ টাকায়। ২০২৪ সালে দূরপাল্লার যাত্রীদের জন্য থাকা রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার (Withdrawal of Rebate Facility) করার পর ভাড়া একলাফে ৮৫৫ টাকা হয়ে যায়। আর আজ (শনিবার) থেকে পন্টেজ চার্জ কার্যকর হওয়ায় যাত্রীদের গুনতে হচ্ছে ৯৪৩ টাকা। অর্থাৎ ১৩ বছরে এসি টিকিটের দাম বেড়েছে ৩৫৮ টাকা। একইভাবে সাধারণ যাত্রীদের জন্য শোভন চেয়ারের ভাড়া (Shovon Chair Fare) ২০১২ সালে ছিল ৩৫৫ টাকা। বিভিন্ন ধাপে এটি বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ৪৯৫ টাকায়। গত ১৩ বছরে এই আসনে ভাড়া বেড়েছে ১৪০ টাকা।

কেন বাড়ছে ভাড়া?
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মূলত বড় বড় সেতু (১০০ মিটারের বেশি) রক্ষণাবেক্ষণ ও রেলের আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে এই বাড়তি মাশুল আরোপ করা হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে যাতায়াতে এখন আগের চেয়ে ৩৫ কিলোমিটার বেশি দূরত্ব ধরে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে, যার প্রভাব সরাসরি সুবর্ণ ও সোনার বাংলার মতো ট্রেনের টিকিটে পড়েছে।

একনজরে ছয় রুটে ট্রেনের নতুন ভাড়ার তালিকা (রুটে পন্টেজ চার্জসহ)

রুটের নামট্রেনের ধরণ/আসনআগের ভাড়া (টাকা)বর্তমান ভাড়া (টাকা)ভাড়া বেড়েছে (টাকা)
ঢাকা-চট্টগ্রামমেইল ট্রেন১৩৫১৫০১৫
—কমিউটার১৭০১৯০২০
—শোভন চেয়ার৪০৫৪৫০৪৫
—স্নিগ্ধা (আন্তঃনগর)৭৭৭৮৫৭৮০
—এসি সিট (আন্তঃনগর)৯৩২১,০৩০৯৮
—এসি বার্থ (আন্তঃনগর)১,৪৪৮১,৫৯১১৪৩
—স্নিগ্ধা (বিরতিহীন)৮৫৫৯৪৩৮৮
—এসি সিট (বিরতিহীন)১,৫৯০১,৭৪৬১৫৬
—প্রথম বার্থ (বিরতিহীন)১,০২৫১,১৩৩১০৮
ঢাকা-কক্সবাজারস্নিগ্ধা১,৩২২১,৪৪৯১২৭
—এসি সিট১,৫৯০১,৭৪০১৫০
—এসি বার্থ২,৪৩০২,৬৫৬২২৬
ঢাকা-সিলেটমেইল ট্রেন১২৫১৪০১৫
—শোভন চেয়ার৩৭৫৪১০৩৫
—স্নিগ্ধা৭১৯৭৮৮৬৯
—এসি সিট৮৬৩৯৪৩৮০
—এসি বার্থ১,৩৩৮১,৪৬৫১২৭
চট্টগ্রাম-সিলেটশোভন চেয়ার––২৫
—স্নিগ্ধা৮৫৭৯০৯৫২
—এসি সিট১,০৩০১,০৮৭৫৭
—এসি বার্থ১,৫৯১১,৬৭৮৮৭
চট্টগ্রাম-জামালপুরমেইল ট্রেন১৭৫১৮৫১০
—শোভন চেয়ার৫২৫৫৪৫২০
—স্নিগ্ধা১,০০৭১,০৪১৩৪
—এসি সিট১,২০৮১,২৫৪৪৬
—এসি বার্থ১,৮৫৬১,৯২৫৬৯
ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জমেইল ট্রেন–(ভাড়া বাড়েনি)০
—কমিউটার১০৫১১০৫
—শোভন চেয়ার২৫০২৫৫৫
—স্নিগ্ধা৪৭৮৪৮৯১১
—এসি বার্থ৯০৭৯২৪১৭

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি, বড় সেতুগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ মেটাতে এবং রেলের নিজস্ব আয় বাড়াতে এই পন্টেজ চার্জ বা বাড়তি মাশুল আরোপ করা হয়েছে। তবে সাধারণ যাত্রী ও ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সাশ্রয়ী বাহন হিসেবে রেলের ওপর মানুষের যে আস্থা ছিল, বারবার কৌশলে ভাড়া বাড়ানোর ফলে তা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে যাতায়াত খরচ বেড়ে যাওয়ায় স্বল্প আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভাড়া না বাড়িয়ে রেলের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম ও টিকেট কালোবাজারি বন্ধ করলে রেলওয়ে আরও বেশি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারতো।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

ঢাকা-কক্সবাজারসহ ছয় রুটে বাড়ল ট্রেনের ভাড়া

আপডেট সময় : ০১:২৩:০৭ অপরাহ্ন, রোববার, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫
305

সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী বাহন হিসেবে পরিচিত রেলে ভ্রমণের খরচ এক ধাক্কায় অনেকটা বেড়ে গেল। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে যাতায়াতে যাত্রীদের পকেট থেকে এখন বাড়তি টাকা খসবে। গতকাল (শনিবার, ২০ ডিসেম্বর) থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-কক্সবাজারসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ ছয়টি রুটে ট্রেনের ভাড়া বৃদ্ধি (Train Fare Hike) কার্যকর হয়েছে। রেলওয়ের গত ১৩ বছরের ইতিহাসে এটি অন্তত পঞ্চম দফা ভাড়া বৃদ্ধির ঘটনা।

একনজরে: ট্রেনের নতুন ভাড়া ও বৃদ্ধির কারণ
কার্যকর: শনিবার (২০ ডিসেম্বর ২০২৫) থেকে নতুন ভাড়া কার্যকর হয়েছে।
বৃদ্ধির ধরণ: সরাসরি ভাড়া না বাড়িয়ে ‘পন্টেজ চার্জ’ (সেতুর মাশুল) আরোপের মাধ্যমে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।
হিসাবের পদ্ধতি: ১০০ মিটারের বেশি লম্বা সেতুর ক্ষেত্রে ১ কি.মি. সেতুকে ২৫ কি.মি. দূরত্ব হিসেবে গণনা করা হচ্ছে।
প্রভাবিত রুট: ঢাকা-কক্সবাজার, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, চট্টগ্রাম-সিলেট, চট্টগ্রাম-জামালপুর এবং ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ।
ভাড়া বৃদ্ধির পরিমাণ: আসন ও রুটভেদে সর্বনিম্ন ৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২২৬ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
ইতিহাস: গত ১৩ বছরে এ নিয়ে অন্তত ৫ বার ট্রেনের ভাড়া বাড়ানো হলো।
সর্বোচ্চ বৃদ্ধি: ঢাকা-কক্সবাজার রুটে এসি বার্থের ভাড়া ২,৪৩০ টাকা থেকে বেড়ে ২,৬৫৬ টাকা হয়েছে।
জনপ্রিয় ট্রেন: সুবর্ণ এক্সপ্রেসের স্নিগ্ধা সিটের ভাড়া ৮৫৫ টাকা থেকে বেড়ে ৯৪৩ টাকা হয়েছে।

পন্টেজ চার্জ: ভাড়া বাড়ার নতুন কৌশল
এবার সরাসরি টিকিটের দাম না বাড়িয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পন্টেজ চার্জ বা মাশুল (Pontage Charge/Bridge Toll) আরোপের মাধ্যমে ভাড়া বাড়িয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ১০০ মিটারের বেশি দৈর্ঘ্যের রেলসেতু পার হলে প্রতি ১ কিলোমিটার সেতুকে ২৫ কিলোমিটার দূরত্ব হিসেবে গণনা করা হবে। এর ফলে কাগজের কলমে পথের দূরত্ব বেড়ে যাওয়ায় যাত্রীদের পকেট থেকে বাড়তি ৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২২৬ টাকা পর্যন্ত খসবে।

ভাড়া বাড়ল যেসব রুটে (Affected Routes)
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের ১১টি সেতুর ওপর এই পন্টেজ চার্জ কার্যকর হওয়ায় নিচের রুটগুলোতে ভাড়া বেড়েছে:

১. ঢাকা-চট্টগ্রাম (Dhaka-Chittagong Train Fare)

২. ঢাকা-কক্সবাজার (Dhaka-Cox’s Bazar Train Fare)

৩. ঢাকা-সিলেট (Dhaka-Sylhet Train Fare)

৪. চট্টগ্রাম-সিলেট (Chittagong-Sylhet)

৫. চট্টগ্রাম-জামালপুর (Chittagong-Jamalpur)

৬. ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জ (Dhaka-Dewanganj)

কোন ট্রেনের ভাড়া কত?
কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও পর্যটক এক্সপ্রেস: ঢাকা-কক্সবাজার রুটে এসি বার্থের ভাড়া ২২৬ টাকা বেড়ে এখন ২,৬৫৬ টাকা এবং স্নিগ্ধা আসনের ভাড়া ১,৩২২ টাকা থেকে বেড়ে ১,৪৪৯ টাকা হয়েছে।

সুবর্ণ ও সোনার বাংলা এক্সপ্রেস: ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বিরতিহীন ট্রেনের স্নিগ্ধা আসনের ভাড়া ৮৫৫ টাকা থেকে বেড়ে ৯৪৩ টাকা হয়েছে।

শোভন চেয়ার ও মেইল ট্রেন: ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে শোভন চেয়ারের ভাড়া এখন ৪৫০ টাকা এবং মেইল ট্রেনের ভাড়া ১৫ টাকা বেড়ে ১৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

১৩ বছরে ৫ বার ভাড়া বৃদ্ধি
২০১২ সালে একলাফে ৫০% ভাড়া বৃদ্ধির পর ২০১৬, ২০২২ (ভ্যাট আরোপ), এবং ২০২৪ সালে রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহারের মাধ্যমে দফায় দফায় ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। এবারের পন্টেজ চার্জ (Bridge Surcharge) যাত্রীদের ওপর নতুন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে রেলের দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করে আয় বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে।

সরাসরি দাম না বাড়িয়ে যে কৌশলে বারবার বাড়ানো হলো ট্রেনের ভাড়া
সরাসরি টিকিটের দাম না বাড়িয়েও গত ১৩ বছরে অন্তত ৫ বার ট্রেনের ভাড়া বৃদ্ধি করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ২০১২ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত বিভিন্ন কৌশলে কিলোমিটার প্রতি ভাড়া বৃদ্ধি, ভ্যাট আরোপ, রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার এবং সবশেষ পন্টেজ চার্জ (Pontage Charge) বা বাড়তি মাশুল যুক্ত করে যাত্রীদের ওপর খরচের বোঝা বাড়ানো হয়েছে।

কিলোমিটার প্রতি ভিত্তি ভাড়া বৃদ্ধি (Base Fare Hike)
রেলওয়ের ভাড়ার মূল ভিত্তি ছিল কিলোমিটার প্রতি ৩৬ পয়সা। ২০১২ সালে দীর্ঘ ২০ বছর পর একলাফে ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল ৫০ শতাংশ। এরপর ২০১৬ সালে কিলোমিটারে ভাড়া আরও ৭ দশমিক ২৩ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়, যার ফলে প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ৩৯ পয়সায় দাঁড়ায়।

এসি ও প্রথম শ্রেণিতে ভ্যাট আরোপ (VAT on Tickets)
২০২২ সাল থেকে কৌশলে ভাড়া বাড়ানো হয় কর আদায়ের মাধ্যমে। আগে শুধু এসিতে ভ্যাট থাকলেও, সে বছরের জুলাই থেকে নন-এসি প্রথম শ্রেণির টিকিটের ওপরও ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট (VAT on Rail Ticket) আরোপ করা হয়।

অতিরিক্ত বগির জন্য বাড়তি ভাড়া (Extra Coach Surcharge)
২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে চালু হয় এক নতুন নিয়ম। বিশেষ ছুটির দিনে ট্রেনের মূল বগির বাইরে বাড়তি যে কোচগুলো লাগানো হয়, তার টিকিটের জন্য যথাক্রমে ৩০ শতাংশ (এসি) ও ২০ শতাংশ (নন-এসি) বেশি টাকা গুনতে হচ্ছে যাত্রীদের। অর্থাৎ একই গন্তব্যে একই ট্রেনে দুই ধরনের ভাড়া কার্যকর রয়েছে।

রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার (Rebate Withdrawal)
দূরপাল্লার যাত্রীদের আকৃষ্ট করতে রেলওয়ে দীর্ঘকাল ধরে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত রেয়াতি বা ছাড় সুবিধা দিয়ে আসছিল। তবে ২০২৪ সালের মে মাসে এই রেয়াতি সুবিধা (Railway Rebate Facility) পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়। এর ফলে দূরপাল্লার ট্রেনের ভাড়া সরাসরি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।

পন্টেজ চার্জ বা সেতুর মাশুল (Pontage Charge Surcharge)
সবশেষ কৌশল হিসেবে আজ থেকে কার্যকর হয়েছে পন্টেজ চার্জ। ১০০ মিটারের বেশি দীর্ঘ সেতু পারাপারে ১ কিলোমিটার সেতুকে ২৫ কিলোমিটার দূরত্ব হিসেবে গণনা করা হচ্ছে। এর ফলে ঢাকা-কক্সবাজার বা ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের দূরত্ব কাগজে-কলমে বেড়ে যাওয়ায় টিকিটের দামও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে।

সুবর্ণ এক্সপ্রেসের ভাড়া বাড়ল ১৩ বছরে ১৪০ থেকে ৩৫৮ টাকা: পন্টেজ চার্জের ধাক্কায় যাত্রীরা নাজেহাল
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের অন্যতম জনপ্রিয় বিরতিহীন ট্রেন সুবর্ণ এক্সপ্রেস (Subarna Express)। ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া এই ট্রেনের ভাড়া গত ১৩ বছরে দফায় দফায় বৃদ্ধি পেয়েছে। কখনো ভিত্তি ভাড়া বাড়ানো, কখনো রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার, আর সর্বশেষ পন্টেজ চার্জ (Pontage Charge) বা সেতুর মাশুল যুক্ত হয়ে এই ট্রেনের ভাড়া এখন সাধারণ যাত্রীদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

সুবর্ণ এক্সপ্রেসের ভাড়ার বিবর্তন (Fare Evolution of Subarna Express)
রেকর্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১২ সালে সুবর্ণ এক্সপ্রেসের এসি বা স্নিগ্ধা আসনের ভাড়া (Snigdha Seat Fare) ছিল মাত্র ৫৮৫ টাকা। ২০১৬ সালে প্রতি কিলোমিটারে ভিত্তি ভাড়া বাড়ানোর পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭২৫ টাকায়। ২০২৪ সালে দূরপাল্লার যাত্রীদের জন্য থাকা রেয়াতি সুবিধা প্রত্যাহার (Withdrawal of Rebate Facility) করার পর ভাড়া একলাফে ৮৫৫ টাকা হয়ে যায়। আর আজ (শনিবার) থেকে পন্টেজ চার্জ কার্যকর হওয়ায় যাত্রীদের গুনতে হচ্ছে ৯৪৩ টাকা। অর্থাৎ ১৩ বছরে এসি টিকিটের দাম বেড়েছে ৩৫৮ টাকা। একইভাবে সাধারণ যাত্রীদের জন্য শোভন চেয়ারের ভাড়া (Shovon Chair Fare) ২০১২ সালে ছিল ৩৫৫ টাকা। বিভিন্ন ধাপে এটি বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে ৪৯৫ টাকায়। গত ১৩ বছরে এই আসনে ভাড়া বেড়েছে ১৪০ টাকা।

কেন বাড়ছে ভাড়া?
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মূলত বড় বড় সেতু (১০০ মিটারের বেশি) রক্ষণাবেক্ষণ ও রেলের আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে এই বাড়তি মাশুল আরোপ করা হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে যাতায়াতে এখন আগের চেয়ে ৩৫ কিলোমিটার বেশি দূরত্ব ধরে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে, যার প্রভাব সরাসরি সুবর্ণ ও সোনার বাংলার মতো ট্রেনের টিকিটে পড়েছে।

একনজরে ছয় রুটে ট্রেনের নতুন ভাড়ার তালিকা (রুটে পন্টেজ চার্জসহ)

রুটের নামট্রেনের ধরণ/আসনআগের ভাড়া (টাকা)বর্তমান ভাড়া (টাকা)ভাড়া বেড়েছে (টাকা)
ঢাকা-চট্টগ্রামমেইল ট্রেন১৩৫১৫০১৫
—কমিউটার১৭০১৯০২০
—শোভন চেয়ার৪০৫৪৫০৪৫
—স্নিগ্ধা (আন্তঃনগর)৭৭৭৮৫৭৮০
—এসি সিট (আন্তঃনগর)৯৩২১,০৩০৯৮
—এসি বার্থ (আন্তঃনগর)১,৪৪৮১,৫৯১১৪৩
—স্নিগ্ধা (বিরতিহীন)৮৫৫৯৪৩৮৮
—এসি সিট (বিরতিহীন)১,৫৯০১,৭৪৬১৫৬
—প্রথম বার্থ (বিরতিহীন)১,০২৫১,১৩৩১০৮
ঢাকা-কক্সবাজারস্নিগ্ধা১,৩২২১,৪৪৯১২৭
—এসি সিট১,৫৯০১,৭৪০১৫০
—এসি বার্থ২,৪৩০২,৬৫৬২২৬
ঢাকা-সিলেটমেইল ট্রেন১২৫১৪০১৫
—শোভন চেয়ার৩৭৫৪১০৩৫
—স্নিগ্ধা৭১৯৭৮৮৬৯
—এসি সিট৮৬৩৯৪৩৮০
—এসি বার্থ১,৩৩৮১,৪৬৫১২৭
চট্টগ্রাম-সিলেটশোভন চেয়ার––২৫
—স্নিগ্ধা৮৫৭৯০৯৫২
—এসি সিট১,০৩০১,০৮৭৫৭
—এসি বার্থ১,৫৯১১,৬৭৮৮৭
চট্টগ্রাম-জামালপুরমেইল ট্রেন১৭৫১৮৫১০
—শোভন চেয়ার৫২৫৫৪৫২০
—স্নিগ্ধা১,০০৭১,০৪১৩৪
—এসি সিট১,২০৮১,২৫৪৪৬
—এসি বার্থ১,৮৫৬১,৯২৫৬৯
ঢাকা-দেওয়ানগঞ্জমেইল ট্রেন–(ভাড়া বাড়েনি)০
—কমিউটার১০৫১১০৫
—শোভন চেয়ার২৫০২৫৫৫
—স্নিগ্ধা৪৭৮৪৮৯১১
—এসি বার্থ৯০৭৯২৪১৭

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের দাবি, বড় সেতুগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ মেটাতে এবং রেলের নিজস্ব আয় বাড়াতে এই পন্টেজ চার্জ বা বাড়তি মাশুল আরোপ করা হয়েছে। তবে সাধারণ যাত্রী ও ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর মতে, সাশ্রয়ী বাহন হিসেবে রেলের ওপর মানুষের যে আস্থা ছিল, বারবার কৌশলে ভাড়া বাড়ানোর ফলে তা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে যাতায়াত খরচ বেড়ে যাওয়ায় স্বল্প আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ভাড়া না বাড়িয়ে রেলের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম ও টিকেট কালোবাজারি বন্ধ করলে রেলওয়ে আরও বেশি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারতো।