৬৯ বছর পর মুসল্লিশূন্য আল-আকসা মসজিদ!

- আপডেট সময় : ১১:৪৫:১৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ ২০২৬
- / 61
রমজানের শেষ দশ দিন মানেই আল-আকসা মসজিদের সেই চিরচেনা রূপ, হাজারো মানুষের পদচারণা আর ইবাদতের গুঞ্জন। কিন্তু ২০২৬ সালের এই রমজান যেন এক বিষণ্ণ ইতিহাস বহন করছে। ১৯৬৭ সালে পূর্ব জেরুজালেম দখলের পর এই প্রথম জেরুজালেমের পুরনো শহর আর আল-আকসা চত্বর এমন নিঃস্তব্ধ ও জনমানবহীন হয়ে পড়েছে। মসজিদের করিডোরগুলোতে নেই হকারদের হাঁকডাক, নেই ইবাদতকারীদের সেই চেনা ভিড়। ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত যে আঙিনা লোকে লোকারণ্য থাকার কথা, সেখানে এখন কেবল শূন্যতা বিরাজ করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান এবং ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধের অজুহাতে পবিত্র এই স্থানটিকে কার্যত একটি অবরুদ্ধ দুর্গে পরিণত করা হয়েছে।
রমজান মাসে আল-আকসা মসজিদ বন্ধ রাখায় ইসরায়েলের প্রতি তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কাতার, জর্ডান, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, পাকিস্তান, সৌদি আরব, মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। খবর আল-জাজিরার।
বুধবার (১১ মার্চ) প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে আটটি আরব ও মুসলিম দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলেন, জেরুজালেমের পুরোনো শহর ও সেখানে অবস্থিত উপাসনালয়ে ফিলিস্তিনিদের প্রবেশে ইসরায়েলের বিধিনিষেধ আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং উপাসনালয়ে অবাধ প্রবেশাধিকারের নীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন।
বিবৃতিতে বলা হয়, ‘(৮ দেশের) পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এই অবৈধ ও অযৌক্তিক পদক্ষেপের প্রতি তাদের সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান ও নিন্দা জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে আল-হারাম ও আল-শরিফ-এ ইসরায়েলের উসকানিমূলক কার্যক্রম এবং মুসল্লিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপেরও নিন্দা জানানো হচ্ছে।’
যুদ্ধ বন্ধে ৩ শর্ত দিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট
আল-আকসার ৪৬ বছরের প্রবীণ এক ইমামের কণ্ঠে সেই হাহাকার ফুটে ওঠে। নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, আল-আকসা আজ বড্ড একা। গত কয়েক দশকের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় এমন দৃশ্য তিনি কখনো দেখেননি। যেখানে হাজার হাজার মানুষ ইতিকাফ করত, সেখানে আজ বড়জোর চার-পাঁচজন মুসল্লি নিয়ে তাদের নামাজ পড়তে হচ্ছে। বাইরের স্পিকারগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় আজানের সুর আজ সীমানা ছাড়িয়ে যেতে পারে না। যখন তিনি নিজের ঘরের পাশের স্থানীয় মসজিদে নামাজ পড়াতে যান, তখন সাধারণ মানুষ তাকে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তারা করুণ সুরে প্রশ্ন করেন, হে শায়খ, আল-আকসা আমাদের জন্য কবে খুলবে? ইমামের কাছে কোনো উত্তর থাকে না, কেবল বুক ফেটে কান্না আসে।
পেশায় দন্তচিকিৎসক কিন্তু গত ১৫ বছর ধরে আল-আকসায় স্বেচ্ছায় আজান ও কোরআন তিলাওয়াত করেন মাজদ আল-হাদমি। তিনি এই বর্তমান পরিস্থিতিকে দেখছেন এক গভীর রাজনৈতিক চাল হিসেবে। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার অভাব বা মরণাস্ত্রের হামলার ভয় দেখানো হলেও মাজদ তা মানতে নারাজ। তার মতে, আল-আকসার ঐতিহাসিক দেয়ালগুলো যেকোনো আধুনিক বাঙ্কারের চেয়ে শক্তিশালী। তিনি মনে করেন, গত ১১ মাস ধরে জেরুজালেমের মুসলিম পরিচয় মুছে ফেলার যে প্রক্রিয়া চলছে, এই অবরোধ তারই একটি সুপরিকল্পিত অংশ।
জেরুজালেম গভর্নরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালের পর এ পর্যন্ত মাত্র পাঁচবার আল-আকসায় জুমার নামাজ বন্ধ করা হয়েছে। তবে চলতি বছরের ৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই বর্তমান অবরোধটি অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে দীর্ঘ এবং কঠোর। যে পবিত্র ভূমি একসময় ঐক্যের প্রতীক ছিল, আজ তা এক অদৃশ্য প্রাচীরে বন্দি হয়ে তার সন্তানদের ফেরার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
জেরুজালেম গভর্নরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালের পর এ নিয়ে মাত্র পাঁচবার আল-আকসায় জুমার নামাজ বন্ধ করা হয়েছে। যার মধ্যে চলতি বছরের ৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া এই অবরোধটি সবচেয়ে দীর্ঘ এবং কঠোর।






















