ঢাকা ১২:৫০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২২ অগাস্ট ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন

স্পোর্টস ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৪:২৯:০৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
  • / 24

ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ১৬ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন। নির্ধারিত সময় গোলশূন্য হওয়ায় অতিরিক্ত সময়ে গড়ায় ম্যাচ। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেস গোল করলে ১-০ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে লা রোজারা।

বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে টানা সবচেয়ে বেশি ম্যাচ অপরাজিত থাকার বিশ্ব রেকর্ড গড়ল স্পেন। এ নিয়ে টানা ৩৮ ম্যাচ ধরে অপরাজিত লা রোজারা। এর আগে টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড ছিল ইতালির।

রোববার (১৯ জুলাই) বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক-নিউজার্সি স্টেডিয়ামে লা রোজাদের মুখোমুখি হয় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা।

প্রথমার্ধে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে বেশ চাপের মুখেই রেখেছিল ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ রেখে আক্রমণ চালাতে থাকে লা রোজারা। প্রথমার্ধে ৬৪ শতাংশ বলের নিয়ন্ত্রণ রেখেছিল তারা।

ম্যাচের হাফটাইমে গোলের উদ্দেশ্যে তিনটি শট নিয়েছে স্পেন, যার মধ্যে লক্ষ্যে শট ছিল দুটি। এর একটি ছিল লামিন ইয়ামালের সংকীর্ণ কোণ থেকে নেওয়া শট, আরেকটি বক্সের বাইরে থেকে প্রথম ছোঁয়ায় মিকেল ওয়ারজাবালের জোরালো শট।

অন্যদিকে, প্রথমার্ধে একটিও শট নিতে পারেনি ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিন। এছাড়া বলের দখলেও পিছিয়ে ছিল আলবিসেলেস্তেরা। তারা বল পজিশন ছিল মাত্র ৩৬ শতাংশ।

হাফটাইমের আগে ৬৫ শতাংশ বল পজেশনে রেখেছিল স্পেন। মাত্র ৩৫ শতাংশ আর্জেন্টিনা। লক্ষ্যে লা রোজারা শট রেখেছে দুটি। পাসেও দ্বিগুণ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল স্পেন। আর্জেন্টিনার ১৫৫ নিখুঁত পাসের বিপরীতে তাদের ৩১৩! পুরোটা সময় লক্ষ্যে তো বটেই, কোনো শট নিতে পারেনি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। স্পেনের গোলকিপার উনাই সিমন দুইবার ক্লিয়ার সুইপ করে তাদের প্রচেষ্টা নষ্ট করে দেন। স্পেন ফাইনাল থার্ডে ৩৫ বার ‍ঢুকেছে, যেখানে আর্জেন্টিনা মাত্র ১৮ বার।

দ্বিতীয়ার্ধে লিওনেল স্কালোনি পরিবর্তন আনেন দলে। প্রথমবার শুরুর একাদশে সুযোগ পাওয়া নিকো গঞ্জালেজকে উঠিয়ে নামান লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে। দ্বিতীয়ার্ধের দ্বিতীয় মিনিটে স্পেন ভালো সুযোগ তৈরি করেছিল। ওয়ারজাবালের পাস ধরে বায়েনা শট নেন। তার দুর্বল শট মাটিতে লাফিয়ে মার্টিনেজের হাতে পড়ে।

বিরতির পর মাঠে নামার পর থেকেই পারদেসের জন্য এই বিশ্বকাপ ফাইনালের শুরুটা যেন একটি দুঃস্বপ্নের মতো হয়েছে! তিনি অযথাই রদ্রিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেন এবং এই ঘটনার জন্য তাকে হলুদ কার্ড দেখানো হয়। এই সিদ্ধান্তের পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা রেফারিকে ঘিরে ধরেন এবং শেষ পর্যন্ত ওলমো মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

৫৫ মিনিটে ওতামেন্দির শেষ মুহূর্তের ট্যাকল! স্পেন ফাবিয়ানের মাধ্যমে পেছন থেকে পাল্টা আক্রমণ করে। বলটি ওয়ারজাবালের কাছে পৌঁছালে তিনি ফাবিয়ানকে পাস দেন। তিনি শট নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে বলটি পেছনে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ওতামেন্দি এগিয়ে এসে বলটি বিপদমুক্ত করেন!

পরের মিনিটে আক্রমণে গোলের সুযোগ তৈরি করেছিল স্পেন। আর্জেন্টিনার বক্সের ডানপ্রান্ত থেকে ওলমোর ব্যাকপাস গোলপোস্টের সামনে কুকুরেয়ার পায়ে পড়ার আগেই গঞ্জালো মন্তিয়েল ক্লিয়ার করেন। দুই মিনিট পর নাহুয়েল মলিনাকে তার বদলি মাঠে নামান স্কালোনি।

৬২ মিনিটে স্পেন দুটি পরিবর্তন আনে। ফাবিয়ানের জায়গায় পেদ্রি এবং ওয়ারজাবালের পরিবর্তে ফেরান তোরেস মাঠে নামেন। দুই মিনিট পর ওলমোর বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া শট রুখে দেন মার্টিনেজ। তিনি বল ধরে রাখতে না পারলেও মাঠের বাইরে যায়।

আর্জেন্টিনার ডানপ্রান্ত থেকে ইয়ামাল দারুণ একটা সুযোগ তৈরি করে দেন। আলভারেজ ও ম্যাকঅ্যালিস্টারকে পেছনে ফেলে বাইলাইন থেকে বার্সা তারকার বাঁ পায়ের ক্রস। তোরেস নিচু হেড করেন। কিন্তু মার্টিনেজের হাতে পড়ে বল।

৭০ মিনিটে আর্জেন্টিনা দুটি পরিবর্তন আনেন। মিডফিল্ডার রদ্রিগো দে পলকে তুলে নিয়ে ফরোয়ার্ড জিউলিয়ানো সিমিওনেকে নামায় তারা। আর ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর বদলে ডিফেন্সে জায়গা পান ফাকুন্দো মেদিনা। ৭৫ মিনিটে স্পেন দুটি পরিবর্তন আনে। ওলমোর জায়গায় মিকেল মেরিনো ও বায়েনার জায়গায় নিকো উইলিয়ামস আসেন।

দুই মিনিট পর গোল করার মতো জায়গা থেকে পেদ্রির শট মার্টিনেজের কারণে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। কয়েক মুহূর্ত পর ইয়ামালের দারুণ এক প্রচেষ্টা মেদিনা ব্লক করেন। তবে বল পড়ে কুবারসির পায়ে। দূর থেকে তার নেওয়া শট দুর্ভাগ্যজনকভাবে মার্টিনেজের গায়ে লেগে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ৮০ মিনিটে উইলিয়ামসের ক্রসে ব্যাকপোস্টে আইমেরিক লাপোর্তের দুর্বল হেড তিনি রুখে দেন। ৮৭ মিনিটে তোরেসের একটি শট গোলবারের পাশ দিয়ে যায়।

ইনজুরি সময়ের তৃতীয় মিনিটে উইলিয়ামসের একটি শক্তিশালী শট রুখে দেন আর্জেন্টিনা কিপার। কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন এনজো ফার্নান্দেজ। কুবার্সিকে ফাউল করেন তিনি। শেষ ‍মুহূর্তে পারেদেসের ফাউলের শিকার হন ইয়ামাল। বক্সের সামনে থেকে তার নেওয়া ফ্রি কিক দারুণভাবে রুখে দিয়ে আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে রাখেন মার্টিনেজ।

অতিরিক্ত সময়ে প্রথমবার আর্জেন্টিনার জাল কাঁপায় স্পেন। নিকো উইলিয়ামস গোল করেন। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে গোলটি বাতিল হয়ে যায়। ৯৬ মিনিটে স্পেন ভেবেছিল তারা এই বিশ্বকাপ ফাইনালে এগিয়ে গিয়েছে! বল স্পর্শ করার জন্য ইয়ামালের প্রচেষ্টা মেরিনোর কাছে পৌঁছায়। তিনি ওতামেন্দির চ্যালেঞ্জকে প্রতিহত করে শট নেন। কিন্তু মার্টিনেজ তা ব্লক করেন!

উইলিয়ামস আলগা বলটি লুফে নিয়ে জালে জড়ান। কিন্তু রেফারি ওতামেন্দির ওপর মেরিনোর ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল করে দেন! অবশ্যই ভিএআর এটি পরীক্ষা করে দেখে গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। এর কিছুক্ষণ পর দারুণ এক গোলে স্পেনকে এগিয়ে দিলেন তোরেস। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের ২৭ সেকেন্ডে পেদ্রো পোরোর ক্রসে উইলিয়ামসের শট পোস্টে লেগে ফিরে এলে তিনি জালে বল জড়িয়ে দেন। ফাইনালে পঞ্চম বদলি খেলোয়াড় হিসেবে গোল করলেন তোরেস। সবশেষ ২০১৪ সালে জার্মানির গোৎসের গোলে হার দেখেছিল আর্জেন্টিনা।

আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন

আর্জেন্টিনা ও লিওনেল মেসিকে কাঁদিয়ে বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে নিলো স্পেন। ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে ২০১০ সালের পর আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পরল লা রোখারা।

এই শিরোপা কেবল একটি জয় নয়, এটি স্প্যানিশ ফুটবলের টিপিক্যাল ‘তিকি-তাকা’ ও আধুনিক গতিশীল ফুটবলের মিশেলের চূড়ান্ত বিজয়। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের পরিকল্পনায় শুরু থেকেই স্পেন ম্যাচে যে দাপট দেখিয়েছে, তা ছিল ফুটবলীয় দর্শনের এক অনন্য প্রদর্শনী। তাদের ৬৮ শতাংশ বলের দখল এবং পুরো ম্যাচজুড়ে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগে তৈরি করা চাপ বুঝিয়ে দিয়েছে কেন তারা এই শিরোপার যোগ্য দাবিদার।

আর্জেন্টিনা এই ম্যাচে যেন নিজেদের ছায়া হয়ে ছিল। প্রথমার্ধে একটিও শট নিতে না পারা এবং পুরো ম্যাচে মাত্র ৩২ শতাংশ বলের দখল থাকা ছিল বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের জন্য এক করুণ চিত্র। মেসিকে সারাক্ষণ দুই-তিনজন স্প্যানিশ ডিফেন্ডার পাহারায় রেখেছিল, যা তাকে স্বাভাবিক ফুটবল খেলা থেকে বঞ্চিত করেছে।

আর্জেন্টিনাকে লড়াইয়ে টিকিয়ে রেখেছিলেন কেবল গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। ম্যাচের পুরো সময়ে ১০টি দুর্দান্ত সেভ করে তিনি আর্জেন্টিনার হারের ব্যবধান বাড়তে দেননি। কিন্তু ৯০ মিনিটের পর ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া এবং অতিরিক্ত সময়ে ক্লান্ত আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ অবশেষে ভেঙে পড়ে।

অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধেও গোল পায়নি স্পেন। ৯৬ মিনিটে নিকো উইলিয়ামস বল জালে পাঠালেও মিকেল মেরিনোর ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল করেন রেফারি। ভিডিও সহকারী রেফারির পরীক্ষাতেও সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।

১০ জনের আর্জেন্টিনার ওপর একের পর এক আক্রমণ চালিয়েছে স্পেন। চাপ সামলাতে ১০২ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেসকে তুলে আরেক ডিফেন্ডার মার্কোস সেনেসিকে নামান লিওনেল স্কালোনি।

১০৬ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় ফেরান তোরেসের গোলটিই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। নিকো উইলিয়ামসের নিখুঁত ক্রস থেকে তার ঠান্ডা মাথার ফিনিশিং মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্প্যানিশ সমর্থকদের উল্লাসে ভাসায়। তবে ম্যাচে উত্তেজনা ছিল শেষ পর্যন্ত; ১১৩ মিনিটে তোরেসের দ্বিতীয় গোলটি অফসাইডের কারণে বাতিল হওয়ায় আর্জেন্টিনার সামনে সমতায় ফেরার এক ক্ষীণ আশা ছিল, কিন্তু স্পেনের ইস্পাত-দৃঢ় রক্ষণভাগ তা আর হতে দেয়নি।

স্পেন একাদশ: উনাই সিমন, পেদ্রো পোরো, পাউ কুবারসি, আইমেরিক লাপোর্তে, কুকুরেয়া, রদ্রি, ফাবিয়ান রুইস, দানি অলমো, লামিনে ইয়ামাল, আলেক্স বায়েনা ও মিকেল ওইয়ারসাবাল।

আর্জেন্টিনার একাদশ: গোলরক্ষক: এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, ডিফেন্ডার: গঞ্জালো মন্টিয়েল, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো, মিডফিল্ডার: রদ্রিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, নিকোলাস গনজালেজ, ফরোয়ার্ড: লিওনেল মেসি (অধিনায়ক), জুলিয়ান আলভারেজ।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন

আপডেট সময় : ০৪:২৯:০৩ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে ১৬ বছর পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন। নির্ধারিত সময় গোলশূন্য হওয়ায় অতিরিক্ত সময়ে গড়ায় ম্যাচ। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে ফেরান তোরেস গোল করলে ১-০ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে লা রোজারা।

বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে টানা সবচেয়ে বেশি ম্যাচ অপরাজিত থাকার বিশ্ব রেকর্ড গড়ল স্পেন। এ নিয়ে টানা ৩৮ ম্যাচ ধরে অপরাজিত লা রোজারা। এর আগে টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড ছিল ইতালির।

রোববার (১৯ জুলাই) বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক-নিউজার্সি স্টেডিয়ামে লা রোজাদের মুখোমুখি হয় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়নরা।

প্রথমার্ধে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে বেশ চাপের মুখেই রেখেছিল ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন। শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ রেখে আক্রমণ চালাতে থাকে লা রোজারা। প্রথমার্ধে ৬৪ শতাংশ বলের নিয়ন্ত্রণ রেখেছিল তারা।

ম্যাচের হাফটাইমে গোলের উদ্দেশ্যে তিনটি শট নিয়েছে স্পেন, যার মধ্যে লক্ষ্যে শট ছিল দুটি। এর একটি ছিল লামিন ইয়ামালের সংকীর্ণ কোণ থেকে নেওয়া শট, আরেকটি বক্সের বাইরে থেকে প্রথম ছোঁয়ায় মিকেল ওয়ারজাবালের জোরালো শট।

অন্যদিকে, প্রথমার্ধে একটিও শট নিতে পারেনি ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিন। এছাড়া বলের দখলেও পিছিয়ে ছিল আলবিসেলেস্তেরা। তারা বল পজিশন ছিল মাত্র ৩৬ শতাংশ।

হাফটাইমের আগে ৬৫ শতাংশ বল পজেশনে রেখেছিল স্পেন। মাত্র ৩৫ শতাংশ আর্জেন্টিনা। লক্ষ্যে লা রোজারা শট রেখেছে দুটি। পাসেও দ্বিগুণ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল স্পেন। আর্জেন্টিনার ১৫৫ নিখুঁত পাসের বিপরীতে তাদের ৩১৩! পুরোটা সময় লক্ষ্যে তো বটেই, কোনো শট নিতে পারেনি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। স্পেনের গোলকিপার উনাই সিমন দুইবার ক্লিয়ার সুইপ করে তাদের প্রচেষ্টা নষ্ট করে দেন। স্পেন ফাইনাল থার্ডে ৩৫ বার ‍ঢুকেছে, যেখানে আর্জেন্টিনা মাত্র ১৮ বার।

দ্বিতীয়ার্ধে লিওনেল স্কালোনি পরিবর্তন আনেন দলে। প্রথমবার শুরুর একাদশে সুযোগ পাওয়া নিকো গঞ্জালেজকে উঠিয়ে নামান লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে। দ্বিতীয়ার্ধের দ্বিতীয় মিনিটে স্পেন ভালো সুযোগ তৈরি করেছিল। ওয়ারজাবালের পাস ধরে বায়েনা শট নেন। তার দুর্বল শট মাটিতে লাফিয়ে মার্টিনেজের হাতে পড়ে।

বিরতির পর মাঠে নামার পর থেকেই পারদেসের জন্য এই বিশ্বকাপ ফাইনালের শুরুটা যেন একটি দুঃস্বপ্নের মতো হয়েছে! তিনি অযথাই রদ্রিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেন এবং এই ঘটনার জন্য তাকে হলুদ কার্ড দেখানো হয়। এই সিদ্ধান্তের পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা রেফারিকে ঘিরে ধরেন এবং শেষ পর্যন্ত ওলমো মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।

৫৫ মিনিটে ওতামেন্দির শেষ মুহূর্তের ট্যাকল! স্পেন ফাবিয়ানের মাধ্যমে পেছন থেকে পাল্টা আক্রমণ করে। বলটি ওয়ারজাবালের কাছে পৌঁছালে তিনি ফাবিয়ানকে পাস দেন। তিনি শট নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে বলটি পেছনে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ওতামেন্দি এগিয়ে এসে বলটি বিপদমুক্ত করেন!

পরের মিনিটে আক্রমণে গোলের সুযোগ তৈরি করেছিল স্পেন। আর্জেন্টিনার বক্সের ডানপ্রান্ত থেকে ওলমোর ব্যাকপাস গোলপোস্টের সামনে কুকুরেয়ার পায়ে পড়ার আগেই গঞ্জালো মন্তিয়েল ক্লিয়ার করেন। দুই মিনিট পর নাহুয়েল মলিনাকে তার বদলি মাঠে নামান স্কালোনি।

৬২ মিনিটে স্পেন দুটি পরিবর্তন আনে। ফাবিয়ানের জায়গায় পেদ্রি এবং ওয়ারজাবালের পরিবর্তে ফেরান তোরেস মাঠে নামেন। দুই মিনিট পর ওলমোর বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া শট রুখে দেন মার্টিনেজ। তিনি বল ধরে রাখতে না পারলেও মাঠের বাইরে যায়।

আর্জেন্টিনার ডানপ্রান্ত থেকে ইয়ামাল দারুণ একটা সুযোগ তৈরি করে দেন। আলভারেজ ও ম্যাকঅ্যালিস্টারকে পেছনে ফেলে বাইলাইন থেকে বার্সা তারকার বাঁ পায়ের ক্রস। তোরেস নিচু হেড করেন। কিন্তু মার্টিনেজের হাতে পড়ে বল।

৭০ মিনিটে আর্জেন্টিনা দুটি পরিবর্তন আনেন। মিডফিল্ডার রদ্রিগো দে পলকে তুলে নিয়ে ফরোয়ার্ড জিউলিয়ানো সিমিওনেকে নামায় তারা। আর ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর বদলে ডিফেন্সে জায়গা পান ফাকুন্দো মেদিনা। ৭৫ মিনিটে স্পেন দুটি পরিবর্তন আনে। ওলমোর জায়গায় মিকেল মেরিনো ও বায়েনার জায়গায় নিকো উইলিয়ামস আসেন।

দুই মিনিট পর গোল করার মতো জায়গা থেকে পেদ্রির শট মার্টিনেজের কারণে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। কয়েক মুহূর্ত পর ইয়ামালের দারুণ এক প্রচেষ্টা মেদিনা ব্লক করেন। তবে বল পড়ে কুবারসির পায়ে। দূর থেকে তার নেওয়া শট দুর্ভাগ্যজনকভাবে মার্টিনেজের গায়ে লেগে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। ৮০ মিনিটে উইলিয়ামসের ক্রসে ব্যাকপোস্টে আইমেরিক লাপোর্তের দুর্বল হেড তিনি রুখে দেন। ৮৭ মিনিটে তোরেসের একটি শট গোলবারের পাশ দিয়ে যায়।

ইনজুরি সময়ের তৃতীয় মিনিটে উইলিয়ামসের একটি শক্তিশালী শট রুখে দেন আর্জেন্টিনা কিপার। কিছুক্ষণ পর দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন এনজো ফার্নান্দেজ। কুবার্সিকে ফাউল করেন তিনি। শেষ ‍মুহূর্তে পারেদেসের ফাউলের শিকার হন ইয়ামাল। বক্সের সামনে থেকে তার নেওয়া ফ্রি কিক দারুণভাবে রুখে দিয়ে আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে রাখেন মার্টিনেজ।

অতিরিক্ত সময়ে প্রথমবার আর্জেন্টিনার জাল কাঁপায় স্পেন। নিকো উইলিয়ামস গোল করেন। কিন্তু অপ্রত্যাশিতভাবে গোলটি বাতিল হয়ে যায়। ৯৬ মিনিটে স্পেন ভেবেছিল তারা এই বিশ্বকাপ ফাইনালে এগিয়ে গিয়েছে! বল স্পর্শ করার জন্য ইয়ামালের প্রচেষ্টা মেরিনোর কাছে পৌঁছায়। তিনি ওতামেন্দির চ্যালেঞ্জকে প্রতিহত করে শট নেন। কিন্তু মার্টিনেজ তা ব্লক করেন!

উইলিয়ামস আলগা বলটি লুফে নিয়ে জালে জড়ান। কিন্তু রেফারি ওতামেন্দির ওপর মেরিনোর ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল করে দেন! অবশ্যই ভিএআর এটি পরীক্ষা করে দেখে গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। এর কিছুক্ষণ পর দারুণ এক গোলে স্পেনকে এগিয়ে দিলেন তোরেস। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের ২৭ সেকেন্ডে পেদ্রো পোরোর ক্রসে উইলিয়ামসের শট পোস্টে লেগে ফিরে এলে তিনি জালে বল জড়িয়ে দেন। ফাইনালে পঞ্চম বদলি খেলোয়াড় হিসেবে গোল করলেন তোরেস। সবশেষ ২০১৪ সালে জার্মানির গোৎসের গোলে হার দেখেছিল আর্জেন্টিনা।

আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন

আর্জেন্টিনা ও লিওনেল মেসিকে কাঁদিয়ে বিশ্বকাপ শিরোপা জিতে নিলো স্পেন। ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে ২০১০ সালের পর আবারও বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুট পরল লা রোখারা।

এই শিরোপা কেবল একটি জয় নয়, এটি স্প্যানিশ ফুটবলের টিপিক্যাল ‘তিকি-তাকা’ ও আধুনিক গতিশীল ফুটবলের মিশেলের চূড়ান্ত বিজয়। কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের পরিকল্পনায় শুরু থেকেই স্পেন ম্যাচে যে দাপট দেখিয়েছে, তা ছিল ফুটবলীয় দর্শনের এক অনন্য প্রদর্শনী। তাদের ৬৮ শতাংশ বলের দখল এবং পুরো ম্যাচজুড়ে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগে তৈরি করা চাপ বুঝিয়ে দিয়েছে কেন তারা এই শিরোপার যোগ্য দাবিদার।

আর্জেন্টিনা এই ম্যাচে যেন নিজেদের ছায়া হয়ে ছিল। প্রথমার্ধে একটিও শট নিতে না পারা এবং পুরো ম্যাচে মাত্র ৩২ শতাংশ বলের দখল থাকা ছিল বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের জন্য এক করুণ চিত্র। মেসিকে সারাক্ষণ দুই-তিনজন স্প্যানিশ ডিফেন্ডার পাহারায় রেখেছিল, যা তাকে স্বাভাবিক ফুটবল খেলা থেকে বঞ্চিত করেছে।

আর্জেন্টিনাকে লড়াইয়ে টিকিয়ে রেখেছিলেন কেবল গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। ম্যাচের পুরো সময়ে ১০টি দুর্দান্ত সেভ করে তিনি আর্জেন্টিনার হারের ব্যবধান বাড়তে দেননি। কিন্তু ৯০ মিনিটের পর ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া এবং অতিরিক্ত সময়ে ক্লান্ত আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ অবশেষে ভেঙে পড়ে।

অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধেও গোল পায়নি স্পেন। ৯৬ মিনিটে নিকো উইলিয়ামস বল জালে পাঠালেও মিকেল মেরিনোর ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল করেন রেফারি। ভিডিও সহকারী রেফারির পরীক্ষাতেও সিদ্ধান্ত বহাল থাকে।

১০ জনের আর্জেন্টিনার ওপর একের পর এক আক্রমণ চালিয়েছে স্পেন। চাপ সামলাতে ১০২ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেসকে তুলে আরেক ডিফেন্ডার মার্কোস সেনেসিকে নামান লিওনেল স্কালোনি।

১০৬ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় ফেরান তোরেসের গোলটিই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়। নিকো উইলিয়ামসের নিখুঁত ক্রস থেকে তার ঠান্ডা মাথার ফিনিশিং মেটলাইফ স্টেডিয়ামে স্প্যানিশ সমর্থকদের উল্লাসে ভাসায়। তবে ম্যাচে উত্তেজনা ছিল শেষ পর্যন্ত; ১১৩ মিনিটে তোরেসের দ্বিতীয় গোলটি অফসাইডের কারণে বাতিল হওয়ায় আর্জেন্টিনার সামনে সমতায় ফেরার এক ক্ষীণ আশা ছিল, কিন্তু স্পেনের ইস্পাত-দৃঢ় রক্ষণভাগ তা আর হতে দেয়নি।

স্পেন একাদশ: উনাই সিমন, পেদ্রো পোরো, পাউ কুবারসি, আইমেরিক লাপোর্তে, কুকুরেয়া, রদ্রি, ফাবিয়ান রুইস, দানি অলমো, লামিনে ইয়ামাল, আলেক্স বায়েনা ও মিকেল ওইয়ারসাবাল।

আর্জেন্টিনার একাদশ: গোলরক্ষক: এমিলিয়ানো মার্টিনেজ, ডিফেন্ডার: গঞ্জালো মন্টিয়েল, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্টিনেজ, নিকোলাস তাগলিয়াফিকো, মিডফিল্ডার: রদ্রিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজ, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, নিকোলাস গনজালেজ, ফরোয়ার্ড: লিওনেল মেসি (অধিনায়ক), জুলিয়ান আলভারেজ।