ঢাকা ০৬:১৬ অপরাহ্ন, রোববার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অভাবে চুল বিক্রি, দুই সন্তান নিয়ে খোলা আকাশের নিচে মা!

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৬:১৬:০৩ অপরাহ্ন, রোববার, ৯ অগাস্ট ২০২৬
  • / 4

দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন এক অসহায় মা। ঘরভাড়ার মাত্র ৫০০ টাকা জোগাড় করতে নিজের মাথার চুল বিক্রি করেছিলেন। তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। বকেয়া ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও হারিয়েছেন বাগেরহাটের রামপালের স্বামীপরিত্যক্তা রেহানা খাতুন। এখন দুই সন্তানকে নিয়ে খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটছে তার।

বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের এই অসহায় নারী দীর্ঘদিন ধরে দুই সন্তানকে নিয়ে অভাব-অনটনের মধ্যে কোনোভাবে দিন পার করছেন। স্থায়ী আশ্রয় না থাকায় কখনো পরিচিতদের বাড়িতে, আবার কখনো ভাড়া করা ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরে থাকতেন তিনি। কিন্তু সামান্য সেই ভাড়াও পরিশোধ করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত ঘর ছাড়তে হয়েছে তাকে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘরভাড়ার ৫০০ টাকা পরিশোধ করতে নিজের মাথার চুল বিক্রি করতে বাধ্য হন রেহানা। তবে চুল বিক্রি করেও বকেয়া পুরোপুরি পরিশোধ করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত ঝুপড়ি ঘরটি ছেড়ে দিতে হয় তাকে।

বর্তমানে রেলব্রিজের পাশে সরকারি জমিতে স্থানীয়দের সহায়তায় বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটি ঘর তৈরির চেষ্টা করছেন রেহানা। কয়েক মাস ধরে সেখানে বাঁশের কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকলেও অর্থের অভাবে ঘরটি আর সম্পূর্ণ করতে পারেননি। ফলে প্রখর রোদ, বৃষ্টি ও ঝড়ের মধ্যেই দুই সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা ফেরদৌসী বেগম বলেন, মাথা গোঁজার জায়গা না থাকায় রেহানা পাশের একটি বাড়িতে অস্থায়ীভাবে থাকতেন। একদিন তিনি দেখতে পান, রেহানার মাথায় কোনো চুল নেই। কারণ জানতে চাইলে কাঁদতে কাঁদতে জানান, ঘরের ৫০০ টাকা ভাড়া দিতে নিজের চুল বিক্রি করেছেন।

সন্তোষপুর গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা আবু তালেব বলেন, রেহানার অবস্থা খুবই করুণ। তার স্বামী দুই সন্তানসহ তাকে অনেক আগে ফেলে চলে গেছেন। তিনি বলেন, আমরা গ্রামবাসী সরকারের কাছে দ্রুত অসহায় এই পরিবারটির জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করাসহ সহযোগিতা করার দাবি জানাই।

স্থানীয় বাসিন্দা মহিদুল ইসলাম বলেন, বাঁশের কাঠামো তৈরি আছে। এখন শুধু টিন ও বেড়ার ব্যবস্থা করতে পারলেই ঘরটি সম্পূর্ণ করা যাবে। এলাকার সচ্ছল মানুষ ও প্রশাসন এগিয়ে এলে অসহায় পরিবারটির জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করা সম্ভব।

রেহানার জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া বিলাসবহুল কোনো ঘর নয়। দুই সন্তানকে নিয়ে বৃষ্টির রাতে যাতে ভিজতে না হয়, রোদে যাতে পুড়তে না হয় এবং রাতে যাতে একটু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন—এমন একটি ছোট্ট টিনের ঘরই তার স্বপ্ন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রেহানা খাতুন বলেন, দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকাতে পারি না। ঘর নেই, খাওয়ার কষ্ট আছে। নিরুপায় হয়ে চুল বিক্রি করেছি। আমি সরকারের কাছে সাহায্য চাই।

রেহানার এই গল্প শুধু একজন অসহায় নারীর গল্প নয়; এটি দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। যে মা সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের সৌন্দর্য বিসর্জন দিতে পারেন, সেই মায়ের কাছেই আজও একটি নিরাপদ আশ্রয় অধরা।

এলাকাবাসীর দাবি, সরকারি আবাসন প্রকল্পের আওতায় দ্রুত রেহানার জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করা হোক। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদেরও তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি সরকারি সফরে এলাকার বাইরে থাকায় রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।

রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তামান্না ফেরদৌসী বলেন, ওই অসহায় নারীকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি সরকারিভাবে ঘর ও আর্থিক সহযোগিতার ব্যবস্থাও করা হবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

অভাবে চুল বিক্রি, দুই সন্তান নিয়ে খোলা আকাশের নিচে মা!

আপডেট সময় : ০৬:১৬:০৩ অপরাহ্ন, রোববার, ৯ অগাস্ট ২০২৬

দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন এক অসহায় মা। ঘরভাড়ার মাত্র ৫০০ টাকা জোগাড় করতে নিজের মাথার চুল বিক্রি করেছিলেন। তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। বকেয়া ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও হারিয়েছেন বাগেরহাটের রামপালের স্বামীপরিত্যক্তা রেহানা খাতুন। এখন দুই সন্তানকে নিয়ে খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটছে তার।

বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের এই অসহায় নারী দীর্ঘদিন ধরে দুই সন্তানকে নিয়ে অভাব-অনটনের মধ্যে কোনোভাবে দিন পার করছেন। স্থায়ী আশ্রয় না থাকায় কখনো পরিচিতদের বাড়িতে, আবার কখনো ভাড়া করা ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরে থাকতেন তিনি। কিন্তু সামান্য সেই ভাড়াও পরিশোধ করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত ঘর ছাড়তে হয়েছে তাকে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘরভাড়ার ৫০০ টাকা পরিশোধ করতে নিজের মাথার চুল বিক্রি করতে বাধ্য হন রেহানা। তবে চুল বিক্রি করেও বকেয়া পুরোপুরি পরিশোধ করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত ঝুপড়ি ঘরটি ছেড়ে দিতে হয় তাকে।

বর্তমানে রেলব্রিজের পাশে সরকারি জমিতে স্থানীয়দের সহায়তায় বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটি ঘর তৈরির চেষ্টা করছেন রেহানা। কয়েক মাস ধরে সেখানে বাঁশের কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকলেও অর্থের অভাবে ঘরটি আর সম্পূর্ণ করতে পারেননি। ফলে প্রখর রোদ, বৃষ্টি ও ঝড়ের মধ্যেই দুই সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দা ফেরদৌসী বেগম বলেন, মাথা গোঁজার জায়গা না থাকায় রেহানা পাশের একটি বাড়িতে অস্থায়ীভাবে থাকতেন। একদিন তিনি দেখতে পান, রেহানার মাথায় কোনো চুল নেই। কারণ জানতে চাইলে কাঁদতে কাঁদতে জানান, ঘরের ৫০০ টাকা ভাড়া দিতে নিজের চুল বিক্রি করেছেন।

সন্তোষপুর গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা আবু তালেব বলেন, রেহানার অবস্থা খুবই করুণ। তার স্বামী দুই সন্তানসহ তাকে অনেক আগে ফেলে চলে গেছেন। তিনি বলেন, আমরা গ্রামবাসী সরকারের কাছে দ্রুত অসহায় এই পরিবারটির জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করাসহ সহযোগিতা করার দাবি জানাই।

স্থানীয় বাসিন্দা মহিদুল ইসলাম বলেন, বাঁশের কাঠামো তৈরি আছে। এখন শুধু টিন ও বেড়ার ব্যবস্থা করতে পারলেই ঘরটি সম্পূর্ণ করা যাবে। এলাকার সচ্ছল মানুষ ও প্রশাসন এগিয়ে এলে অসহায় পরিবারটির জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করা সম্ভব।

রেহানার জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া বিলাসবহুল কোনো ঘর নয়। দুই সন্তানকে নিয়ে বৃষ্টির রাতে যাতে ভিজতে না হয়, রোদে যাতে পুড়তে না হয় এবং রাতে যাতে একটু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন—এমন একটি ছোট্ট টিনের ঘরই তার স্বপ্ন।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রেহানা খাতুন বলেন, দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকাতে পারি না। ঘর নেই, খাওয়ার কষ্ট আছে। নিরুপায় হয়ে চুল বিক্রি করেছি। আমি সরকারের কাছে সাহায্য চাই।

রেহানার এই গল্প শুধু একজন অসহায় নারীর গল্প নয়; এটি দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি। যে মা সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে নিজের সৌন্দর্য বিসর্জন দিতে পারেন, সেই মায়ের কাছেই আজও একটি নিরাপদ আশ্রয় অধরা।

এলাকাবাসীর দাবি, সরকারি আবাসন প্রকল্পের আওতায় দ্রুত রেহানার জন্য একটি ঘরের ব্যবস্থা করা হোক। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদেরও তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি সরকারি সফরে এলাকার বাইরে থাকায় রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।

রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তামান্না ফেরদৌসী বলেন, ওই অসহায় নারীকে খাদ্য সহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি সরকারিভাবে ঘর ও আর্থিক সহযোগিতার ব্যবস্থাও করা হবে।