ঢাকা ০২:৫৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬, ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হুথিদের কাছে আইআরজিসি কমান্ডার ও ক্ষেপণাস্ত্র সরঞ্জাম পাঠিয়েছে ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০১:৫৩:৫৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬
  • / 5

ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর কাছে চলতি মাসে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার, সামরিক উপদেষ্টা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন–সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম পাঠিয়েছে ইরান। বার্তা সংস্থা রয়টার্স চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এর মাধ্যমে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের ওপর হুথিদের সক্ষমতা আরও বাড়াতে চাইছে তেহরান।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৩ জুলাই তেহরান থেকে ইয়েমেনে যাওয়া একটি মাহান এয়ারের ফ্লাইটে আইআরজিসির সদস্য ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো হয়। বিষয়টি এর আগে প্রকাশ্যে আসেনি।

এ বিষয়ে অবগত চারটি সূত্রের মধ্যে রয়েছেন দুই ইরানি সূত্র, ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাবিষয়ক এক বিশ্লেষক।

দুই ইরানি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ওই ফ্লাইটে জ্যেষ্ঠ কমান্ডারসহ আইআরজিসির ১০ থেকে ২১ জন সদস্য ছিলেন।

বিমানটি প্রথমে হুথি-নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানায় যাওয়ার কথা থাকলেও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারের হামলার কারণে সেটি হুথি-নিয়ন্ত্রিত হোদেইদা বন্দরে অবতরণ করে।

সূত্রগুলোর একটির দাবি, আইআরজিসির কমান্ডাররা হুথিদের সামরিক অভিযানে সহায়তা এবং নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রশিক্ষণ দিতে ইয়েমেনে যান। একই সঙ্গে হুথিদের কার্যক্রমে অর্থায়নের জন্য বিমানটিতে স্বর্ণও পাঠানো হয়। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে দুই ইরানি সূত্রই নাম প্রকাশে রাজি হননি।

রয়টার্স বলছে, এ তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এক দশকের বেশি সময় ধরে সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে তেহরান।

যদিও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তেহরান বরাবরই হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।

অন্যদিকে, হুথিদের গণমাধ্যম কর্মকর্তা আবদেল রহমান আল-আহনোমি, যিনি নিজেকে ওই বিমানের যাত্রী বলে দাবি করেছেন, বলেন, ইরান সামরিক বিশেষজ্ঞ পাঠিয়েছে—এমন অভিযোগ ‘মিথ্যা ও মনগড়া’। তার দাবি, বিমানে থাকা সবাই ছিলেন বেসামরিক যাত্রী।

হুথিরাও অতীতে নিজেদের ইরানের প্রক্সি বাহিনী নয় বলে দাবি করেছে এবং জানিয়েছে, তারা নিজেদের অস্ত্র নিজেরাই তৈরি করে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ওই ফ্লাইট ইয়েমেনে পৌঁছানোর তিন দিন পর তেহরান হুথিদের লোহিত সাগরের তেল পরিবহন পথ বন্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছিল, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালায়।

এরপর সোমবার হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে। তাদের দাবি, ১৩ জুলাই সানা বিমানবন্দরে সৌদি আরবের হামলার জবাব হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার হুথিরা সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার দাবি করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারের তথ্যমন্ত্রী মুয়াম্মার আল-ইরিয়ানি রয়টার্সকে বলেন, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী বিপ্লবী গার্ডের সদস্য ও সামরিক সরঞ্জাম ইয়েমেনে পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, তাদের উদ্দেশ্য হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করা।

হুথি ও ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠী নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুজাহেম আলসালুমও ১৩ জুলাইয়ের ওই ফ্লাইটে আইআরজিসির বিশেষজ্ঞদের আগমনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তার দাবি, বিমানে স্বল্প ও মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ছিল, যেগুলোর ধরন অতীতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের সঙ্গে মিল রয়েছে।

আলসালুম আরও দাবি করেন, গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের সময়ও ইরান সোমালিয়ার মাধ্যমে ইয়েমেনে সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়েছিল। যদিও তেহরান সে অভিযোগও অস্বীকার করেছিল।

চলতি মাসের শুরুতে হুথিরা সানা ও তেহরানের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল শুরুর ঘোষণা দেয়। তাদের ভাষ্য, এর মাধ্যমে ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের আরোপিত অবরোধ ভাঙা সম্ভব হবে।

গত ২০ জুলাই তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ১৩ জুলাইয়ের ফ্লাইটটির উদ্দেশ্য ছিল তেহরানে নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নেওয়া হুথি প্রতিনিধিদল এবং চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরা ইয়েমেনি নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়া।

রয়টার্সের চারটি সূত্রের দাবি, ৩ জুলাই প্রায় ২০০ জনকে নিয়ে বিমানটি তেহরান গিয়েছিল। ১৩ জুলাই ফেরার সময় ওই প্রতিনিধিদলের সদস্যদের পাশাপাশি আইআরজিসির কমান্ডার ও সামরিক উপদেষ্টারাও বিমানে ছিলেন। তবে সানায় অবতরণের আগেই বিমানবন্দরে হামলা হওয়ায় সেটিকে হোদেইদায় অবতরণ করতে হয়।

এদিকে হুথিদের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, বিমানবন্দরে হামলা চালানো সৌদি যুদ্ধবিমানগুলোকে ইয়েমেনের আকাশসীমা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

হুথিদের কাছে আইআরজিসি কমান্ডার ও ক্ষেপণাস্ত্র সরঞ্জাম পাঠিয়েছে ইরান

আপডেট সময় : ০১:৫৩:৫৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬

ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর কাছে চলতি মাসে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কমান্ডার, সামরিক উপদেষ্টা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন–সংশ্লিষ্ট সরঞ্জাম পাঠিয়েছে ইরান। বার্তা সংস্থা রয়টার্স চারটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এর মাধ্যমে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের ওপর হুথিদের সক্ষমতা আরও বাড়াতে চাইছে তেহরান।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১৩ জুলাই তেহরান থেকে ইয়েমেনে যাওয়া একটি মাহান এয়ারের ফ্লাইটে আইআরজিসির সদস্য ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো হয়। বিষয়টি এর আগে প্রকাশ্যে আসেনি।

এ বিষয়ে অবগত চারটি সূত্রের মধ্যে রয়েছেন দুই ইরানি সূত্র, ইয়েমেনের তথ্যমন্ত্রী এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তাবিষয়ক এক বিশ্লেষক।

দুই ইরানি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ওই ফ্লাইটে জ্যেষ্ঠ কমান্ডারসহ আইআরজিসির ১০ থেকে ২১ জন সদস্য ছিলেন।

বিমানটি প্রথমে হুথি-নিয়ন্ত্রিত রাজধানী সানায় যাওয়ার কথা থাকলেও সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারের হামলার কারণে সেটি হুথি-নিয়ন্ত্রিত হোদেইদা বন্দরে অবতরণ করে।

সূত্রগুলোর একটির দাবি, আইআরজিসির কমান্ডাররা হুথিদের সামরিক অভিযানে সহায়তা এবং নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার প্রশিক্ষণ দিতে ইয়েমেনে যান। একই সঙ্গে হুথিদের কার্যক্রমে অর্থায়নের জন্য বিমানটিতে স্বর্ণও পাঠানো হয়। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে দুই ইরানি সূত্রই নাম প্রকাশে রাজি হননি।

রয়টার্স বলছে, এ তথ্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এক দশকের বেশি সময় ধরে সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে তেহরান।

যদিও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তেহরান বরাবরই হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে।

অন্যদিকে, হুথিদের গণমাধ্যম কর্মকর্তা আবদেল রহমান আল-আহনোমি, যিনি নিজেকে ওই বিমানের যাত্রী বলে দাবি করেছেন, বলেন, ইরান সামরিক বিশেষজ্ঞ পাঠিয়েছে—এমন অভিযোগ ‘মিথ্যা ও মনগড়া’। তার দাবি, বিমানে থাকা সবাই ছিলেন বেসামরিক যাত্রী।

হুথিরাও অতীতে নিজেদের ইরানের প্রক্সি বাহিনী নয় বলে দাবি করেছে এবং জানিয়েছে, তারা নিজেদের অস্ত্র নিজেরাই তৈরি করে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ওই ফ্লাইট ইয়েমেনে পৌঁছানোর তিন দিন পর তেহরান হুথিদের লোহিত সাগরের তেল পরিবহন পথ বন্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছিল, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালায়।

এরপর সোমবার হুথিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে। তাদের দাবি, ১৩ জুলাই সানা বিমানবন্দরে সৌদি আরবের হামলার জবাব হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার হুথিরা সৌদি আরবের দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার দাবি করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারের তথ্যমন্ত্রী মুয়াম্মার আল-ইরিয়ানি রয়টার্সকে বলেন, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী বিপ্লবী গার্ডের সদস্য ও সামরিক সরঞ্জাম ইয়েমেনে পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, তাদের উদ্দেশ্য হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ-নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করা।

হুথি ও ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠী নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করা নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুজাহেম আলসালুমও ১৩ জুলাইয়ের ওই ফ্লাইটে আইআরজিসির বিশেষজ্ঞদের আগমনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তার দাবি, বিমানে স্বল্প ও মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ছিল, যেগুলোর ধরন অতীতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্রের সঙ্গে মিল রয়েছে।

আলসালুম আরও দাবি করেন, গত বছর ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের সময়ও ইরান সোমালিয়ার মাধ্যমে ইয়েমেনে সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়েছিল। যদিও তেহরান সে অভিযোগও অস্বীকার করেছিল।

চলতি মাসের শুরুতে হুথিরা সানা ও তেহরানের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল শুরুর ঘোষণা দেয়। তাদের ভাষ্য, এর মাধ্যমে ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের আরোপিত অবরোধ ভাঙা সম্ভব হবে।

গত ২০ জুলাই তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ১৩ জুলাইয়ের ফ্লাইটটির উদ্দেশ্য ছিল তেহরানে নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় অংশ নেওয়া হুথি প্রতিনিধিদল এবং চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরা ইয়েমেনি নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়া।

রয়টার্সের চারটি সূত্রের দাবি, ৩ জুলাই প্রায় ২০০ জনকে নিয়ে বিমানটি তেহরান গিয়েছিল। ১৩ জুলাই ফেরার সময় ওই প্রতিনিধিদলের সদস্যদের পাশাপাশি আইআরজিসির কমান্ডার ও সামরিক উপদেষ্টারাও বিমানে ছিলেন। তবে সানায় অবতরণের আগেই বিমানবন্দরে হামলা হওয়ায় সেটিকে হোদেইদায় অবতরণ করতে হয়।

এদিকে হুথিদের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, বিমানবন্দরে হামলা চালানো সৌদি যুদ্ধবিমানগুলোকে ইয়েমেনের আকাশসীমা ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে।