ভারতের মিথ্যার মুখোশ খুলে দেয়া কে এই সাবেক পাকিস্তানি কমান্ডো?

- আপডেট সময় : ০৩:০৫:১৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২ অক্টোবর ২০২৬
- / 1
ভারতের সরকার, ভারতীয় সেনাবাহিনী ও দেশটির গণমাধ্যম দাবি করেছিল, ভারত-নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরে এক বন্দুকযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক কমান্ডো হাবিলদার মুহাম্মদ আসিফ নিহত হয়েছেন। কিন্তু সেই আসিফকেই জীবিত অবস্থায় গণমাধ্যমের সামনে হাজির করেছে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)।
মূলত ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে দাবি করা হয়, কাশ্মীরে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক কমান্ডো হাবিলদার মুহাম্মদ আসিফ। ছড়িয়ে পড়ে তার ছবি, সামরিক পরিচয় ও মৃত্যুর খবর। কিন্তু ‘নিহত’ সেই আসিফই জীবিত অবস্থায় পাকিস্তানের গণমাধ্যমের সামনে হাজির হলে ঘটনার মোড় ঘুরে যায়।
সাংবাদিকদের সামনে তিনি বললেন, বাড়িতে বসে নিজের ‘মৃত্যুর খবর’ শুনে রীতিমতো হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। ভারতের করা ওই দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। কে এই মুহাম্মদ আসিফ, যাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এমন চাঞ্চল্য?
সংবাদমাধ্যম জিও নিউজ বলছে, হাবিলদার মুহাম্মদ আসিফ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর স্পেশাল সার্ভিসেস গ্রুপের (এসএসজি) অবসরপ্রাপ্ত কমান্ডো। পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) গণমাধ্যমের সামনে হাবিলদার আসিফকে হাজির করেন।
বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে সামরিক বাহিনীর মুখপাত্রের পাশে বসে আসিফ জানান, তিনি অ্যাটক জেলার পিন্ডিঘেব তেহসিলের বাসিন্দা। তিনি বলেন, ‘গতকাল (বুধবার) সন্ধ্যায় বন্ধুরা আমাকে ফোন করে জানান, ভারতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর ছড়িয়েছে যে কাশ্মীরে এক বন্দুকযুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনী আমাকে হত্যা করেছে। তারা জানতে চেয়েছিল আমি কোথায় আছি। আমি তাদের বলেছি, আলহামদুলিল্লাহ, আমি জীবিত ও সুস্থ আছি এবং বাড়িতেই বসে আছি।’
এরপর অচেনা ভারতীয় নম্বর থেকে তিনি একের পর এক ফোন পেতে শুরু করেন। ফোনকারীরা তার ব্যক্তিগত তথ্য জানতে চাইছিলেন এবং খবরে যে ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক আছে কি না, সেটিও জানতে চাচ্ছিলেন।
আসিফ বলেন, ‘আমি বারবার ওই নম্বরগুলো ব্লক করেছি। এর কিছুক্ষণ পরই টেলিভিশনে খবর দেখতে পাই, সেখানে আমার ছবি ও সামরিক জীবনের ব্যক্তিগত তথ্য দেখিয়ে বলা হচ্ছে, আমি কাশ্মীরে নিহত হয়েছি।’
হাবিলদার আসিফ বলেন, ‘(এসব দেখে) আমি পুরোপুরি হতবাক হয়ে যাই। আমি তখন বাড়িতে বসে আছি, অথচ তারা দাবি করছে, কাশ্মীরে আমাকে হত্যা করা হয়েছে।’
আসিফ জানান, বিষয়টি পরিষ্কার করতে তিনি সঙ্গে সঙ্গে তার সাবেক ইউনিটের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানান। যাতে তাকে নিয়ে কোনো ভুল ধারণা বা মিথ্যা অভিযোগ তৈরি না হয়, সে জন্য তিনি যে নিরাপদে বাড়িতে আছেন, সেটিও তাদের জানান।
তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে (ভারতীয় নাম্বার থেকে আসা) ফোনগুলো ব্লক করার পরামর্শ দেন এবং জানান, আইএসপিআর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করবে এবং সত্যটা সবার সামনে তুলে ধরবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আইএসপিআর আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি জানতে চাইলে আমি নিশ্চিত করি যে আমি জীবিত আছি। তারা আমাকে সবার সামনে এসে প্রকৃত ঘটনা জানাতে বলে।’
নিজের সামরিক জীবনের বিষয়ে আসিফ জানান, ২০০০ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আর্টিলারি কোরে যোগ দেন। ২০০৫ সালে তিনি এসএসজিতে যোগ দেন। তিনি বলেন, ‘আমি ১৮ বছর সম্মান ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। ২০২৩ সালে অবসর নিই। অবসরের পর তিন বছর একটি বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। গত কয়েক মাস ধরে পুরোপুরি অবসর জীবন কাটাচ্ছি এবং বাড়িতে ছোট একটি ব্যবসা পরিচালনা করছি।’
তিনি বলেন, ‘আন্তসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে ভারত আমার এবং আমার দেশের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা, সাজানো ও ভিত্তিহীন। ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত এসব মিথ্যা তথ্যের আমি তীব্র নিন্দা জানাই।’
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সাবেক এই কমান্ডো বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি জীবিত এবং আজ আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমার পরিচয় নিয়ে কোনো সন্দেহের সুযোগ নেই। আমার কাছে সরকারি জাতীয় পরিচয়পত্র (সিএনআইসি) ও সামরিক পরিচয়পত্র রয়েছে।’
আসিফ আরও বলেন, এসএসজিতে দায়িত্ব পালনের সময় তাকে সবসময় সাহসের সঙ্গে সরাসরি লড়াই করার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। আড়ালে থেকে বা প্রতারণার মাধ্যমে লড়াই করার প্রশিক্ষণ তিনি পাননি।
তিনি বলেন, ‘আমি সবসময় আমার মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে প্রস্তুত ছিলাম, আজও আছি। আমার জীবন এই দেশের জন্য। ধন্যবাদ!’
এর আগে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এক অভিযানে ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে মুসা ওরফে আসিফ ফৌজি নামে এক লস্কর-ই-তৈয়বার শীর্ষ কমান্ডারকে হত্যা করেছে ভারতীয় সেনারা। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুধবারের এই হত্যাকাণ্ডকে সশস্ত্র গোষ্ঠীটির জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
ভারত দাবি করেছিল, ২০২২ সাল থেকে বিতর্কিত এই অঞ্চলে বেশ কয়েকটি বড় হামলার জন্য দায়ী চার কমান্ডারের একটি দলের মধ্যে মুসাই ছিলেন সর্বশেষ জীবিত সদস্য। তবে বৃহস্পতিবার টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী ভারতের এই দাবি নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, পুরো ঘটনাটিই সাজানো।
আহমেদ শরিফ চৌধুরীর অভিযোগ, বিদ্রোহীদের সহিংসতার দায় পাকিস্তানের ওপর চাপাতে ভারত মিথ্যা অভিযোগ ও নাটক তৈরি করছে এবং সাজানো অভিযান পরিচালনা করছে। তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক ও বিব্রতকর বিষয়। কোনো আত্মমর্যাদাসম্পন্ন দেশ এমন কাজ করে না।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ভারত কাশ্মীরের মুসলিমদের গ্রেপ্তার করছে, নিপীড়ন করছে। তার ভাষায়, ‘তাদের ধরে নিয়ে যায়, হত্যা করে এবং সেটিকে সাজানো অভিযান হিসেবে উপস্থাপন করে। এরপর ঘটনাটিকে সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে প্রচার করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এবার ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আরও এক ধাপ এগিয়ে গেছে। তারা হয়তো ভেবেছে, এটা যথেষ্ট চমকপ্রদ নয়। তাই পাকিস্তানের একজন সেনাসদস্যকে নিয়ে এসে এমনভাবে উপস্থাপন করেছে, যেন তারা তাকে হত্যা করেছে।’
পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এই ঘটনা নতুন করে সশস্ত্র সংঘাতের জন্ম দিতে পারে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে জেনারেল শরিফ বলেন, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি ‘খুব কঠোর’ পাল্টা জবাবের হুঁশিয়ারি দেন।
তিনি বলেন, ‘তারা যদি কিছু করতে চায়, তাহলে আসো… করে দেখাও’। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘কিন্তু পরিষ্কার করে বলতে চাই, এবার আমরা তাদের এত সহজে ছেড়ে দেব না। এবার তাদের কৌশলগত ভুলের জন্য পাকিস্তান যে মূল্য আদায় করবে, তা হবে অত্যন্ত, অত্যন্ত কঠোর।’
সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড বলছে, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক বরাবরই উত্তেজনাপূর্ণ। এ দুই দেশ এখন পর্যন্ত তিনটি যুদ্ধে জড়িয়েছে, যার মধ্যে দুটি যুদ্ধ হয়েছে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে। বিতর্কিত এই হিমালয় অঞ্চলটি বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে বিভক্ত। তবে ভারত ও পাকিস্তান—উভয় দেশই পুরো কাশ্মীরকে নিজেদের বলে দাবি করে থাকে।
১৯৮৯ সালে ভারতের শাসনের বিরুদ্ধে কাশ্মীরে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয় এবং বর্তমানে অঞ্চলটিতে পাঁচ লাখের বেশি ভারতীয় সেনা মোতায়েন রয়েছে। বেশিরভাগ কাশ্মীরিই বিদ্রোহীদের সেই দাবির প্রতি সমর্থন করেন, যেখানে বলা হচ্ছে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের ভিত্তিতে আয়োজিত ভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করা অথবা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হোক।
ভারতের শাসনের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই সশস্ত্র বিদ্রোহে এখন পর্যন্ত ৭০ হাজার থেকে এক লাখ মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক।























