ঢাকা ০১:২০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, ৫০০ হাইস্কুলে ক্লাস বন্ধ ঘোষণা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ১২:৫৩:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
  • / 1

শিক্ষার্থীদের টানা বিক্ষোভ, অবরোধ এবং বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের জেরে ফ্রান্সের প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ হাইস্কুলে সোমবার ক্লাস পুরোপুরি অথবা আংশিকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। নিরাপত্তার প্রয়োজনীয় পরিবেশ না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক পাঠদান সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন দেশটির শিক্ষামন্ত্রী এদোয়ার গেফ্রে। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলন এখন ফ্রান্সের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষার্থী আন্দোলনগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

ফ্রান্সে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ হাইস্কুল রয়েছে। এর মধ্যে সোমবার ৪০০ থেকে ৫০০ প্রতিষ্ঠানে ক্লাস পুরোপুরি বা আংশিকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধু ইল দ্য ফ্রান্স অঞ্চলেই ১৬০টির বেশি হাইস্কুল বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ধাপে ধাপে ক্লাস চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

শিক্ষার্থীরা মূলত শিক্ষা খাতে আরও জনবল ও অর্থ বরাদ্দের দাবি জানিয়ে আন্দোলনে নেমেছে। তাদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে শিক্ষক সংকট, অনুপস্থিত শিক্ষকদের বদলি না হওয়া, অতিরিক্ত শিক্ষার্থীপূর্ণ শ্রেণিকক্ষ, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন, দীর্ঘ ও চাপপূর্ণ ক্লাস সূচি এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্ল্যাটফর্ম পারকুরসুপ ঘিরে বৈষম্যের অভিযোগ। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্যারিস অঞ্চলে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে রাজধানীর বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। নঁত, মার্সেইসহ বিভিন্ন বড় শহর ও ছোট এলাকায় শিক্ষার্থীরা কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে।

গত সপ্তাহে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, শুক্রবার শত শত হাইস্কুলে বিক্ষোভ ও কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, আন্দোলন শুরুর পর অন্তত ২৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অগ্নিসংযোগ বা ব্যাপক ভাঙচুরের শিকার হয়েছে। একই সময়ে শিক্ষা বিভাগের অন্তত ৭৮ জন কর্মী আহত হয়েছেন। সরকারের দাবি, এসব সহিংসতার অনেক ঘটনায় স্কুলের বাইরের ব্যক্তিরাও জড়িত ছিল।

বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ধরপাকড়ও হয়েছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনেজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের কয়েক দিনের অভিযানে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। তাদের প্রায় ৮৫ শতাংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক। শুধু শুক্রবারই ১ হাজার ৭৪৭ জনকে আটক করা হয়। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার আটক করা হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৯৫০ জনকে। শুক্রবার ১৫৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে কর্তৃপক্ষ।

তবে পুলিশের কঠোর অবস্থান নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো অভিযোগ করছে, তাদের মূল দাবি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা না করে সরকার নিরাপত্তা ও সহিংসতার বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। শুক্রবার শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা জানিয়েছে, তারা প্রত্যাশিত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের আশ্বাস পায়নি। ফলে মঙ্গলবার আরও বড় কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষা সংগঠন ও শ্রমিক ইউনিয়নও ওই কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

অন্যদিকে ফরাসি সরকার বলছে, শিক্ষার্থীদের উদ্বেগকে অস্বীকার করা হচ্ছে না। শিক্ষামন্ত্রী ইতোমধ্যে অনুপস্থিত শিক্ষকদের দ্রুত বদলি নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন শিক্ষা কার্যক্রমের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুও শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত সমস্যাগুলো নিয়ে কয়েকটি অগ্রাধিকারমূলক কাজ নির্ধারণ করেছেন। চলতি মাসের শেষ নাগাদ কিছু বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। একই সঙ্গে যেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনুকূলে থাকবে, সেখানে দ্রুত ক্লাস পুনরায় চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সরকারের কয়েকজন সদস্য অভিযোগ করেছেন, আন্দোলনে কিছু রাজনৈতিক ও উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। তবে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শিক্ষক ও শিক্ষা খাতে জনবল সংকট, ভবনের দুরবস্থা এবং শিক্ষাব্যবস্থার চাপ নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ থেকেই বর্তমান আন্দোলনের জন্ম হয়েছে। সরকারও আন্দোলনের প্রাথমিক দাবিগুলোর যৌক্তিকতা পুরোপুরি অস্বীকার করেনি।

সোমবার শত শত প্রতিষ্ঠানে ক্লাস বন্ধ থাকলেও সংকটের এখানেই অবসান হচ্ছে না। মঙ্গলবারের নতুন দেশব্যাপী কর্মসূচিকে সামনে রেখে ফরাসি সরকার, শিক্ষা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি না হলে চলমান আন্দোলন আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, ৫০০ হাইস্কুলে ক্লাস বন্ধ ঘোষণা

আপডেট সময় : ১২:৫৩:২৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬

শিক্ষার্থীদের টানা বিক্ষোভ, অবরোধ এবং বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের জেরে ফ্রান্সের প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ হাইস্কুলে সোমবার ক্লাস পুরোপুরি অথবা আংশিকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। নিরাপত্তার প্রয়োজনীয় পরিবেশ না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক পাঠদান সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন দেশটির শিক্ষামন্ত্রী এদোয়ার গেফ্রে। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলন এখন ফ্রান্সের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষার্থী আন্দোলনগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে।

ফ্রান্সে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ হাইস্কুল রয়েছে। এর মধ্যে সোমবার ৪০০ থেকে ৫০০ প্রতিষ্ঠানে ক্লাস পুরোপুরি বা আংশিকভাবে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুধু ইল দ্য ফ্রান্স অঞ্চলেই ১৬০টির বেশি হাইস্কুল বন্ধ রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ধাপে ধাপে ক্লাস চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

শিক্ষার্থীরা মূলত শিক্ষা খাতে আরও জনবল ও অর্থ বরাদ্দের দাবি জানিয়ে আন্দোলনে নেমেছে। তাদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে শিক্ষক সংকট, অনুপস্থিত শিক্ষকদের বদলি না হওয়া, অতিরিক্ত শিক্ষার্থীপূর্ণ শ্রেণিকক্ষ, জরাজীর্ণ স্কুল ভবন, দীর্ঘ ও চাপপূর্ণ ক্লাস সূচি এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির প্ল্যাটফর্ম পারকুরসুপ ঘিরে বৈষম্যের অভিযোগ। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্যারিস অঞ্চলে শুরু হওয়া বিক্ষোভ পরে রাজধানীর বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। নঁত, মার্সেইসহ বিভিন্ন বড় শহর ও ছোট এলাকায় শিক্ষার্থীরা কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে।

গত সপ্তাহে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, শুক্রবার শত শত হাইস্কুলে বিক্ষোভ ও কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, আন্দোলন শুরুর পর অন্তত ২৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অগ্নিসংযোগ বা ব্যাপক ভাঙচুরের শিকার হয়েছে। একই সময়ে শিক্ষা বিভাগের অন্তত ৭৮ জন কর্মী আহত হয়েছেন। সরকারের দাবি, এসব সহিংসতার অনেক ঘটনায় স্কুলের বাইরের ব্যক্তিরাও জড়িত ছিল।

বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ধরপাকড়ও হয়েছে। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনেজের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহের কয়েক দিনের অভিযানে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। তাদের প্রায় ৮৫ শতাংশ অপ্রাপ্তবয়স্ক। শুধু শুক্রবারই ১ হাজার ৭৪৭ জনকে আটক করা হয়। এর আগের দিন বৃহস্পতিবার আটক করা হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৯৫০ জনকে। শুক্রবার ১৫৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে কর্তৃপক্ষ।

তবে পুলিশের কঠোর অবস্থান নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো অভিযোগ করছে, তাদের মূল দাবি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা না করে সরকার নিরাপত্তা ও সহিংসতার বিষয়টিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। শুক্রবার শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা জানিয়েছে, তারা প্রত্যাশিত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের আশ্বাস পায়নি। ফলে মঙ্গলবার আরও বড় কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন শিক্ষা সংগঠন ও শ্রমিক ইউনিয়নও ওই কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।

অন্যদিকে ফরাসি সরকার বলছে, শিক্ষার্থীদের উদ্বেগকে অস্বীকার করা হচ্ছে না। শিক্ষামন্ত্রী ইতোমধ্যে অনুপস্থিত শিক্ষকদের দ্রুত বদলি নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন শিক্ষা কার্যক্রমের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নুও শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত সমস্যাগুলো নিয়ে কয়েকটি অগ্রাধিকারমূলক কাজ নির্ধারণ করেছেন। চলতি মাসের শেষ নাগাদ কিছু বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। একই সঙ্গে যেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনুকূলে থাকবে, সেখানে দ্রুত ক্লাস পুনরায় চালুর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সরকারের কয়েকজন সদস্য অভিযোগ করেছেন, আন্দোলনে কিছু রাজনৈতিক ও উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। তবে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শিক্ষক ও শিক্ষা খাতে জনবল সংকট, ভবনের দুরবস্থা এবং শিক্ষাব্যবস্থার চাপ নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ থেকেই বর্তমান আন্দোলনের জন্ম হয়েছে। সরকারও আন্দোলনের প্রাথমিক দাবিগুলোর যৌক্তিকতা পুরোপুরি অস্বীকার করেনি।

সোমবার শত শত প্রতিষ্ঠানে ক্লাস বন্ধ থাকলেও সংকটের এখানেই অবসান হচ্ছে না। মঙ্গলবারের নতুন দেশব্যাপী কর্মসূচিকে সামনে রেখে ফরাসি সরকার, শিক্ষা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি না হলে চলমান আন্দোলন আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।